তনু হত্যা মামলা: ১০ বছর পর সাবেক সেনাসদস্য রিমান্ডে

✍︎ নাগরিক প্রতিবেদক ✍︎

কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া সরকারি কলেজের ইতিহাস বিভাগের ছাত্রী সোহাগী জাহান তনু হত্যা মামলায় ১০ বছর পর সেনাবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত সিনিয়র ওয়ারেন্ট অফিসার হাফিজুর রহমানকে গ্রেফতার করেছে পিবিআই।

মঙ্গলবার রাতে ঢাকার কেরানীগঞ্জের একটি বাসা থেকে তাকে গ্রেফতার করা হয়। বুধবার বিকেলে কুমিল্লার আদালতে তাকে হাজির করা হলে সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট মো. মোমিনুল হক তাকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য তিনদিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন। 

বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা পিবিআই ঢাকা কার্যালয়ের পরিদর্শক তারিকুল ইসলাম। তিনি বলেন, গত ৬ এপ্রিল এ মামলায় তিনজন সন্দেহভাজন- সার্জেন্ট জাহিদ, ওয়ারেন্ট অফিসার হাফিজুর রহমান ও সৈনিক শাহিনুল আলমের ডিএনএ নমুনা ক্রস-ম্যাচ করার জন্য আদালতে আবেদন করা হয়। গ্রেফতারের পর আজ মামলার তদন্তের স্বার্থে হাফিজুর রহমানকে সাতদিনের রিমান্ডের আবেদন করা হয়। আদালত তিনদিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেছেন। 

তনুর ভাই মো. রুবেল বলেন, ‘তদন্ত কর্মকর্তা আজ দুপুরে কল করে আদালতে থাকতে বলেছিলেন। মা-বাবাকে নিয়ে বিকেলে আদালতে এসেছি। আদালতে এসে একজনের গ্রেফতারের বিষয়টি জানতে পারি। এতে আমরা আশাবাদী, এবার হয়তো আমরা ন্যায়বিচার পাব। আশা করি দীর্ঘ ১০ বছর পর বোনের হত্যার রহস্য বের হবে।’ 

কুমিল্লা সেনানিবাসের ভেতরে টিউশনি করাতে গিয়ে আর ফেরেননি তনু

২০১৬ সালের ২০ মার্চ সন্ধ্যায় কুমিল্লা সেনানিবাসের ভেতরে একটি বাসায় টিউশনি করাতে গিয়ে আর বাসায় ফেরেননি তনু। পরে খোঁজাখুঁজি করে সেনানিবাসের পাওয়ার হাউসের অদূরে একটি জঙ্গলে তার লাশ পাওয়া যায়। পরদিন তার বাবা ইয়ার হোসেন অজ্ঞাত আসামির বিরুদ্ধে কুমিল্লা কোতোয়ালি মডেল থানায় হত্যা মামলা করেন। শুরুতে পুলিশ, জেলা পুলিশের গোয়েন্দা শাখা (ডিবি) ও পরে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) মামলাটি তদন্ত করে কোনো রহস্য বের করতে পারেনি।

তবে ২০১৭ সালের মে মাসে সিআইডি তনুর পোশাক থেকে নেওয়া নমুনার ডিএনএ পরীক্ষা করে তিনজন পুরুষের শুক্রাণু পাওয়ার কথা গণমাধ্যমকে জানান।

সর্বশেষ পুলিশ সদর দপ্তরের নির্দেশে ২০২০ সালের ২১ অক্টোবর তনু হত্যা মামলার নথি পিবিআইয়ের ঢাকা সদর দপ্তরে হস্তান্তর করে সিআইডি। প্রায় চার বছর মামলাটি তদন্ত করেন পিবিআই সদর দপ্তরের পুলিশ পরিদর্শক মো. মজিবুর রহমান। ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে মামলাটির ষষ্ঠ তদন্ত কর্মকর্তার দায়িত্ব পেয়েছেন পরিদর্শক মো. তরিকুল ইসলাম। 

দুইবার ময়নাতদন্ত, মৃত্যুর কারণ অজানা

তনু হত্যার একদিন পর ২১ মার্চ তনুর প্রথম ময়নাতদন্ত করেন সিএমএইচের চিকিৎসক ডা. শারমিন সুলতানা। কিন্তু সে ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন নিয়ে আপত্তি ওঠে।

পরে ৩০ মার্চ তনুর মরদেহ কবর থেকে উত্তোলন করে দ্বিতীয় দফায় ময়নাতদন্ত করা হয়। ডা. কমোদা প্রসাদ সাহার নেতৃত্বে ডা. ওমর ফারুক ও ডা. করুণা রানি কর্মকার দ্বিতীয় দফায় তনুর ময়নাতদন্ত করেছিলেন।

তনুর বাবা জানান, তনুকে যখন মৃত অবস্থায় পাওয়া গিয়েছিল তখন তার লম্বা চুল কাঁচি দিয়ে কাটা ছিল। নাক ও মুখে রক্তের দাগ, মাথার পেছনেও আঘাত ছিল।

তনু নিহত হওয়ার একদিন পর ২১ মার্চ কুমিল্লার কোতোয়ালি মডেল থানায় অজ্ঞাতনামা আসামি করে হত্যা ও ধর্ষণের অভিযোগে একটি মামলা করেন তনুর বাবা ইয়ার হোসেন।

প্রথমে মামলার তদন্তকাজ শুরু করেন নাজিরাবাজার পুলিশ ফাঁড়ির উপপরিদর্শক সাইফুল ইসলাম। প্রথমে থানা পুলিশ, পরে জেলা গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) হয়ে মামলাটি সিআইডিতে স্থানান্তরিত হয়।

প্রাথমিক ডিএনএ পরীক্ষায় সিআইডি নিশ্চিত করে, তনুকে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে। তার কাপড়ে পৃথক তিন ব্যক্তির নমুনা পাওয়া যায়। তবে অজ্ঞাত কারণে এখনো পর্যন্ত তা কারও সঙ্গে মেলানো যায়নি। মামলার কোনো কূলকিনারা না করতে পেরে পুলিশ সদর দপ্তরের নির্দেশে ২০২০ সালের ২১ অক্টোবর তনু হত্যা মামলার নথিপত্র পিবিআইকে হস্তান্তর করে সিআইডি।

গত ১০ বছরে মোট ৭ জন তদন্ত কর্মকর্তা এ মামলাটির দায়িত্ব পালন করেছেন।

বর্তমানে মামলাটির তদন্ত কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন পিবিআই সদর দপ্তরের পুলিশ পরিদর্শক মো. মজিবুর রহমান। ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর মাস থেকে তিনি এই মামলার তদন্ত কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন।

তরিকুল ইসলাম বলেন, ‘আমরা ৬ এপ্রিল আদালতে সর্বশেষ অগ্রগতি তুলে ধরেছি। আমাদের কার্যক্রম চলমান রয়েছে। আশা করি তদন্তের মাধ্যমে সবকিছু বেরিয়ে আসবে।’

আন্দোলন দমনচেষ্টা

১০ বছর আগে তনু হত্যাকাণ্ড দেশজুড়ে তীব্র প্রতিবাদের জন্ম দিয়েছিল। শিক্ষার্থী থেকে সর্বস্তরের মানুষ রাস্তায় নেমে তনু হত্যার বিচারের দাবি জানিয়েছিলেন।

তনু হত্যার বিচারের দাবিতে আন্দোলনে অংশ নেওয়ার কারণে ভিক্টোরিয়া কলেজের শিক্ষার্থী, থিয়েটারকর্মী ও সাধারণ মানুষকে বিভিন্ন ধরনের চাপের মুখে পড়তে হয়েছিল বলে অভিযোগ রয়েছে।

একাধিক প্রতিবাদকারী জানান, নিজেদের গোয়েন্দা সংস্থার সদস্য পরিচয়দানকারী ব্যক্তিরা আন্দোলনকারীদের নানাভাবে ভয়ভীতি দেখিয়েছেন।

সাংস্কৃতিক কর্মী খায়রুল আনাম রায়হান বলেন, ‘আন্দোলন দমন করতে এসব সংস্থা নানাভাবে চেষ্টা চালিয়ে ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনাকে ভিন্নখাতে প্রবাহিত করার জন্য নানাভাবে চেষ্টা চালিয়েছিল। যদিও তা শেষমেশ ব্যর্থ হয়।’

এখনো রয়েছে আশা

কুমিল্লা জেলা ও দায়রা জজ আদালতের পাবলিক প্রসিকিউটর কাইমুল হক বলেন, ‘দেরিতে হলেও তিনজন সন্দেহভাজনের নাম প্রকাশ্যে এসেছে। আইনের চোখে সবাই সমান। আমরা সবসময়ই তনুর পরিবারের পাশে থাকব।’

তনুর বাবা ইয়ার হোসেন বলেন, ‘গত দশ বছর ধরে আমি আমার মেয়ের হত্যার বিচার চাইছি। কিন্তু তৎকালীন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা এই হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকায় বিচার পাইনি।’

আনোয়ারা বেগমের অদম্য সংগ্রাম

গত ৬ এপ্রিল শারীরিক অসুস্থতার কারণে আদালতে হাজির হতে পারেননি তনুর মা আনোয়ারা বেগম। এ মুহূর্তে তার একটাই দাবি, তার মেয়ের হত্যার বিচার। 
গত দশ বছরে অসংখ্য বাধা, বিপত্তি, হুমকি ও প্রলোভন, কোনো কিছুই আনোয়ারা বেগমকে টলাতে পারেনি।

আনোয়ারা বেগম বলেন, ‘সার্জেন্ট জাহিদ ও তার স্ত্রীকে রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করলে প্রকৃত অপরাধীদের বের করা সম্ভব। তৎকালীন জিওসির (সেনানিবাসের সর্বোচ্চ কর্মকর্তা) স্ত্রী এবং একজন কমান্ডিং অফিসারের স্ত্রী সরাসরি এই হত্যাকাণ্ডে জড়িত ছিলেন এবং অধীনস্থদের উসকানি দিয়েছিলেন।’

আজ বিকেল ৫টার দিকে তনুর মা-বাবা ও ছোট ভাই রুবেল হোসেন কুমিল্লা আদালতে উপস্থিত হন। দীর্ঘদিন ধরে ন্যায়বিচারের আশায় বিভিন্ন দপ্তরে ঘুরে বেড়ানো পরিবারটির সদস্যদের এদিন আবেগাপ্লুত দেখা যায়।

শেয়ার করতে

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *