ফের বন্ধ আদানির একটি ইউনিট, বাড়ছে লোডশেডিং

✍︎ নাগরিক প্রতিবেদক ✍︎

ভারতের ঝাড়খন্ড রাজ্যে নির্মিত আদানির কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রটি ১ হাজার ৬০০ মেগাওয়াট ক্ষমতার। পিডিবি সূত্র বলছে, কিছুদিন ধরে গড়ে দেড় হাজার মেগাওয়াটের মতো বিদ্যুৎ সরবরাহ করছে আদানির কেন্দ্রটি। একটি ইউনিট বন্ধের পর উৎপাদন কমে ৭৫০ থেকে ৭৭০ মেগাওয়াটে নেমে এসেছে।

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ শুরুর পর জ্বালানিসংকট দেখা দেয় বিশ্বজুড়ে। কয়লা, গ্যাস ও জ্বালানি তেলের অভাবে দেশে চাহিদামতো বিদ্যুৎ উৎপাদন করা যাচ্ছে না।

বুধবার দিনে বিদ্যুতের সর্বোচ্চ চাহিদা ওঠে ১৫ হাজার ৬৯০ মেগাওয়াটে। উৎপাদন ও চাহিদার ফারাকের কারণে এই সময় লোডশেডিং দিতে হয় প্রায় আড়াই হাজার মেগাওয়াট। দুপুরের পর থেকে গরম বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে লোডশেডিং বাড়তে শুরু করে। রাতে সর্বোচ্চ চাহিদার সময় এটি আরও বাড়তে পারে।

পিডিবি সূত্র বলছে, কিছুদিন ধরে গড়ে দেড় হাজার মেগাওয়াটের মতো বিদ্যুৎ সরবরাহ করছে আদানির কেন্দ্রটি। একটি ইউনিট বন্ধের পর উৎপাদন কমে ৭৫০ থেকে ৭৭০ মেগাওয়াটে নেমে এসেছে। ওই ইউনিট চালু করতে ৩–৪ দিন সময় লাগতে পারে।

পিডিবির সদস্য জহুরুল ইসলাম বলেন, পরিস্থিতি মোকাবিলায় ফার্নেস তেলচালিত কেন্দ্র থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়ানো হচ্ছে। ডিজেলচালিত কেন্দ্রও চালানোর চিন্তা করা হচ্ছে।

পাওয়ার গ্রিড পিএলসি বাংলাদেশের (পিজিসিবি) তথ্য অনুযায়ী, দেশে মোট বিদ্যুৎকেন্দ্র ১৩৬টি। এর মধ্যে গ্যাসস্বল্পতায় ১৩টি, জ্বালানি তেল না থাকায় ৯টি ও রক্ষণাবেক্ষণ কাজের জন্য ৮টি বিদ্যুৎকেন্দ্র উৎপাদন তালিকার বাইরে আছে। বাকি বিদ্যুৎকেন্দ্রের মধ্যে ১৭টি সৌর, যা থেকে রাতে বিদ্যুৎ পাওয়া যায় না। ডিজেলচালিত ৫টি কেন্দ্রও বন্ধ রাখা হয় খরচ বেশি হওয়ায়। গ্যাস থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা এখন ১২ হাজার ২০০ মেগাওয়াট। গ্যাস–সংকটের কারণে সেখান থেকে ৫ হাজার ২০০ মেগাওয়াটের বেশি উৎপাদন করা যাচ্ছে না।

গরমের শুরুতে এখন বিদ্যুতের চাহিদা ১৬ হাজার মেগাওয়াট ছাড়ালেও সব মিলিয়ে উৎপাদন করা যাচ্ছে ১৩ হাজার থেকে ১৪ হাজার মেগাওয়াট। ফলে ঘাটতি মেটাতে নিয়মিত লোডশেডিং করতে হচ্ছে।

পাওয়ার গ্রিড পিএলসি বাংলাদেশের (পিজিসিবি) তথ্যে দেখা যায়, এদিন দুই ইউনিট থেকে সর্বোচ্চ ১ হাজার ৫০০ মেগাওয়াট (১৪৯৯) করে বিদ্যুৎ দিচ্ছিল আদানি। বেলা ২টায় তা একলাফে ৭৫০ মেগাওয়াটে নেমে আসে।

এদিকে গরমের কারণে বিদ্যুতের চাহিদা ১৬ হাজার ৫০০ মেগাওয়াট উঠলেও উৎপাদন সেই হারে বাড়ানো যাচ্ছে না। ফলে ঘণ্টাপ্রতি লোডশেডিং ২ হাজার থেকে আড়াই হাজার মেগাওয়াট ছাড়িয়ে যাচ্ছে।

বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (পিডিবি) সদস্য (উৎপাদন) মো. জহুরুল ইসলাম বলেন, আদানি জানিয়েছে, তাদের বিদ্যুৎকেন্দ্রের একটি ইউনিটের বিয়ারিং থেকে সতর্কসংকেত পাওয়া যাচ্ছিল। বড় ধরনের দুর্ঘটনা এড়াতে তাৎক্ষণিকভাবে ওই ইউনিটে উৎপাদন বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। এটি মেরামত করতে তিন-চার দিন লেগে যেতে পারে।

ভারতের ঝাড়খন্ড রাজ্যে নির্মিত ওই বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে ১ হাজার ৬০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ আমদানি করে বাংলাদেশ। যা বাংলাদেশের চাঁপাইনবাবগঞ্জের রহনপুর হয়ে আসে। বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রথম ইউনিট থেকে ৭৫০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সরবরাহ শুরু হয় ২০২৩ সালের মার্চে। দ্বিতীয় ইউনিট থেকে উৎপাদন শুরু হয় ওই বছর জুনে।

সর্বোচ্চ বিদ্যুৎ চাহিদার মৌসুমে জ্বালানির অভাবে প্রয়োজনমতো তা উৎপাদন করা যাচ্ছে না। ঘাটতি মেটাতে নিয়মিত লোডশেডিং করতে হচ্ছে। এর মধ্যে বকেয়া বিল দ্রুত পরিশোধের তাগাদা দিয়ে সরকারকে চিঠি দিয়েছে ভারতীয় কোম্পানি আদানি। বকেয়া শোধ না হলে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যাহত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে বলে চিঠিতে জানানো হয়েছে।

বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু বরাবর পাঠানো চিঠিতে তারিখ লেখা আছে ১৭ এপ্রিল। তবে চিঠিটি ১৯ এপ্রিল মন্ত্রণালয়ে পৌঁছেছে বলে জানিয়েছে দায়িত্বশীল একটি সূত্র।

চিঠিতে সতর্ক করে বলা হয়, বকেয়া বিল পরিশোধে দেরির কারণে প্রকল্পের অর্থপ্রবাহে ঘাটতি তৈরি হয়েছে। জ্বালানি কিনে উৎপাদন ধরে রাখা কঠিন হচ্ছে। তাই সময়মতো বিল পরিশোধ না করলে আংশিক বা পুরোপুরি বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধের ঝুঁকি থেকে যায়।

আদানির চুক্তির বিরুদ্ধে দেশের উচ্চ আদালতে একটি রিট মামলা চলমান। আদালতের চূড়ান্ত আদেশের পর করণীয় নির্ধারণ করবে পিডিবি।

রিট আবেদনের পর আদালতের আদেশে আদানির চুক্তি পর্যালোচনা করে প্রতিবেদন জমা দেয় বিগত অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত চুক্তি পর্যালোচনা কমিটি।

কমিটির প্রতিবেদনে বলা হয়, আদানির সঙ্গে পিডিবির বিদ্যুৎ ক্রয় চুক্তি ও চুক্তির প্রক্রিয়ায় দুর্নীতি-অনিয়মের তথ্য পাওয়া গেছে। এ নিয়ে বিদ্যুৎ বিভাগের নিয়োগ করা আন্তর্জাতিক আইনজীবীরা বর্তমানে কাজ করছেন।

আদানির পাঠানো সর্বশেষ চিঠিতে বলা হয়, কোম্পানির মোট পাওনা ৬৮ কোটি ৮০ লাখ মার্কিন ডলার। এর মধ্যে ৩৯ কোটি ৩০ লাখ ডলার (প্রতি ডলারে ১২২ টাকা দরে ৪ হাজার ৭৯৫ কোটি টাকা) নিয়ে কোনো বিরোধ নেই, যা ৪ থেকে ৫ মাসের বিলের সমান। এরপরও বাংলাদেশের জ্বালানি চাহিদার ওপর ভিত্তি করে নিরবচ্ছিন্নভাবে বিদ্যুৎ সরবরাহ করছে আদানির বিদ্যুৎকেন্দ্র। তাই দ্রুত পুরো বকেয়া শোধ করার পাশাপাশি ভবিষ্যতে নিয়মিত বিল দিতে অনুরোধ করা হয়েছে চিঠিতে।

পিডিবি ও আদানি সূত্র বলছে, বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময় বকেয়া প্রায় ৭০ কোটি ডলারে পৌঁছায়। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় আদানির দিক থেকে কয়েক দফা তাগাদা দিলে বকেয়া পরিশোধের উদ্যোগ নেওয়া হয়। গত বছরের জুন থেকে নভেম্বর পর্যন্ত সময়ে নিয়মিতভাবে বিল পরিশোধ করেছে পিডিবি। একই সঙ্গে কিছু কিছু করে পুরোনো বকেয়াও শোধ করা হয়। এতে মোট বকেয়া কমতে থাকে। তবে গত ডিসেম্বর থেকে আবার বিল পরিশোধ কমিয়ে দেয় পিডিবি। এতে বকেয়া আবার বাড়তে থাকে।

শেয়ার করতে

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *