✍︎ নাগরিক প্রতিবেদক ✍︎
বাংলাদেশে চলমান হামের প্রাদুর্ভাব নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে পরিস্থিতিকে জাতীয়ভাবে ‘উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ’ বলে মূল্যায়ন করেছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও)।
দেশের ৬৪ জেলার মধ্যে ৫৮টিতে সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়া, টিকার ঘাটতি এবং মৃত্যুর ক্রমবর্ধমান হারের ওপর ভিত্তি করে সংস্থাটি গতকাল বৃহস্পতিবার (২৩ এপ্রিল) একটি বিস্তারিত প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, বর্তমান সংক্রমণ পরিস্থিতি দেশের আগের অর্জনকে বড় ধরনের ধাক্কা দিয়েছে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জানুয়ারি মাস থেকে দেশে হামে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা অস্বাভাবিকভাবে বাড়তে শুরু করেছে। গত ১৫ মার্চ থেকে ১৪ এপ্রিল পর্যন্ত এক মাসে সংক্রমণের পরিসংখ্যান হলো—
সন্দেহভাজন রোগী: ১৯,১৬১ জন।
পরীক্ষাগারে নিশ্চিত রোগী: ২,৯৭৩ জন।
মৃত্যু: এ সময় হামের উপসর্গ নিয়ে ১৬৬ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে ল্যাবরেটরিতে নিশ্চিত হওয়া ৩০ জন রোগীর ক্ষেত্রে মৃত্যুহার (CFR) ১.১ শতাংশ।
হাসপাতালে ভর্তি: ১২,৩১৮ জন বর্তমানে চিকিৎসাধীন রয়েছে।
হটস্পট ঢাকা
প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেশের আট বিভাগে সংক্রমণ শনাক্ত হলেও ঢাকা বিভাগ সবচেয়ে বেশি বিপর্যস্ত। ১৫ মার্চ থেকে প্রাপ্ত তথ্যে দেখা যায়: ঢাকা বিভাগে ৮ হাজার ২৬৩ জন সন্দেহভাজন রোগী। সবচেয়ে বেশি ঝুঁকি দেখা গেছে ডেমরা, যাত্রাবাড়ী, কামরাঙ্গীরচর, কড়াইল, মিরপুর এবং তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল ও বস্তি এলাকায়। অন্যান্য বিভাগের মধ্যে রাজশাহী (৩,৭৪৭ জন), চট্টগ্রাম (২,৫১৪ জন) এবং খুলনা বিভাগে (১,৫৬৮ জন) সংক্রমণ তীব্র হচ্ছে।
দেশের প্রায় ৯১ শতাংশ জেলা এখন হামের কবলে, যা ইঙ্গিত দেয় যে সংক্রমণ জাতীয়ভাবে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছে।
আক্রান্তদের অধিকাংশই শিশু
হামের বর্তমান প্রাদুর্ভাবে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুরা। আক্রান্ত শিশুদের ৭৯ শতাংশের বয়স ৫ বছরের নিচে। এর মধ্যে ৬৬ শতাংশের বয়স ২ বছরের কম এবং ৩৩ শতাংশের বয়স ৯ মাসের নিচে।
সরকারি পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, মৃত শিশুদের প্রায় সবাই টিকা না পাওয়া অথবা আংশিক টিকা পাওয়া (এক ডোজ)। ৯১ শতাংশ রোগী ১ থেকে ১৪ বছর বয়সী, যা এই বয়সী শিশুদের মধ্যে বড় ধরনের রোগ প্রতিরোধ ঘাটতির প্রমাণ।
কেন এই পরিস্থিতি
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলছে, ২০২৪-২৫ সালে দেশে এমআর (হাম-রুবেলা) টিকার জাতীয় পর্যায়ের ঘাটতি এই পরিস্থিতির প্রধান কারণ। ২০০০ সালে যেখানে টিকার কভারেজ ছিল ৮৯ শতাংশ, সেখানে ২০২৪-২৫ সালে তা আশঙ্কাজনকভাবে কমেছে। ২০২০ সালের পর থেকে দেশব্যাপী কোনো নিয়মিত সম্পূরক হাম-রুবেলা টিকাদান কর্মসূচি (এসআইএ) পালিত না হওয়া এই ঝুঁকির পথ তৈরি করেছে।
এ ছাড়া অপুষ্টিতে ভোগা এবং ভিটামিন এ-এর ঘাটতি থাকা শিশুদের মধ্যে নিউমোনিয়া, ডায়রিয়া, অন্ধত্ব ও মস্তিষ্কে প্রদাহের (এনসেফালাইটিস) মতো জটিলতা মৃত্যুর ঝুঁকি বাড়িয়ে দিচ্ছে।
এদিকে বাংলাদেশের দীর্ঘ স্থলসীমান্ত থাকায় এবং ঢাকা, চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারের মতো আন্তর্জাতিক ট্রানজিট পয়েন্টগুলো সচল থাকায় এই সংক্রমণ প্রতিবেশী দেশগুলোতে ছড়িয়ে পড়ার ‘উচ্চ ঝুঁকি’ দেখছে ডব্লিউএইচও। বিশেষ করে ভারত ও মিয়ানমারের সঙ্গে মানুষের নিরন্তর যাতায়াত সংক্রমণকে আরও ত্বরান্বিত করতে পারে। মিয়ানমারে টিকা না পাওয়া শিশুর সংখ্যা বেশি হওয়ায় এবং ভারতে সম্প্রতি হামের প্রাদুর্ভাব বাড়ায় সীমান্ত এলাকার ঝুঁকি ‘আঞ্চলিক পর্যায়ে উচ্চ’ হিসেবে মূল্যায়ন করা হয়েছে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সুপারিশ
পরিস্থিতি মোকাবিলায় সংস্থাটি বেশ কিছু জরুরি পরামর্শ দিয়েছে:
- সব এলাকায় অন্তত ৯৫ শতাংশ টিকার কভারেজ নিশ্চিত করা।
- বিদেশ থেকে আসা বা যাতায়াতকারীদের ওপর সীমান্ত নজরদারি জোরদার করা।
- আক্রান্ত শিশুদের চিকিৎসায় অবিলম্বে ভিটামিন এ ক্যাপসুল সরবরাহ নিশ্চিত করা।
- হাসপাতালে হাম রোগীদের জন্য আলাদা কক্ষ বা আইসোলেশন নিশ্চিত করে সংক্রমণ ঠেকানো।
- স্বাস্থ্যকর্মী, পরিবহন ও পর্যটন খাতের কর্মীদের জরুরি ভিত্তিতে টিকা দেওয়া।
- যাদের টিকা নেওয়ার প্রমাণ নেই, তাদের দ্রুত টিকার আওতায় আনা।
- প্রয়োজনীয় সিরিঞ্জ, কিট ও সরঞ্জামের পর্যাপ্ত মজুত রাখা।
- সন্দেহভাজন রোগীর সংস্পর্শে আসা ব্যক্তিদের ৭২ ঘণ্টার মধ্যে টিকা দেওয়া।
- সাপ্তাহিক পরিস্থিতি প্রতিবেদন তৈরি করে তথ্যভিত্তিক সিদ্ধান্ত নেওয়া।
- জাতীয় ও স্থানীয় পর্যায়ের মধ্যে কার্যকর সমন্বয় নিশ্চিত করা।
জাতীয় টিকাদান কারিগরি উপদেষ্টা কমিটি (এনআইটিএজি) গত ৩০ মার্চ দেশব্যাপী টিকাদান কর্মসূচি অনুমোদন করেছে। ৫ এপ্রিল থেকে ১৮ জেলায় এবং ২০ এপ্রিল থেকে দেশব্যাপী ৬ থেকে ৫৯ মাস বয়সী শিশুদের জন্য এই কর্মসূচি শুরু হয়েছে।
হাম একটি অত্যন্ত সংক্রামক ভাইরাসজনিত রোগ, যা বাতাসের মাধ্যমে ছড়ায়। উপসর্গ দেখা দিলেই (জ্বর, কাশি, চোখ লাল হওয়া, শরীরে ফুসকুড়ি) দেরি না করে দ্রুত হাসপাতালে নেওয়ার এবং শিশুকে টিকার পূর্ণ ডোজ নিশ্চিত করার পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।
হাম ও হামের উপসর্গে আরও ৭ জনের মৃত্যু
সারাদেশে গত ২৪ ঘণ্টায় হামে তিনজন ও উপসর্গে আরও চারজনের মৃত্যু হয়েছে। শুক্রবার স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কন্ট্রোলরুম থেকে পাঠানো সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়।
এতে বলা হয়, গত ২৪ ঘণ্টায় হামে আরও তিনজনের মৃত্যু হয়েছে এবং ১৫ মার্চ থেকে ২৪ এপ্রিল পর্যন্ত নিশ্চিত হামে ৪২ জনের মৃত্যু হয়েছে। হামের উপসর্গে চারজনের মৃত্যু হয়েছে এবং ১৫ মার্চ থেকে ২৪ এপ্রিল পর্যন্ত সন্দেহজনক হামে ১৯৮ জনের মৃত্যু হয়েছে।
গত ২৪ ঘণ্টায় সন্দেহজনক হামরোগীর সংখ্যা এক হাজার ২১৫ জন এবং গত ১৫ মার্চ থেকে ২৪ এপ্রিল পর্যন্ত সন্দেহজনক হামরোগীর সংখ্যা ২৯ হাজার ৫৪৯ জন। নিশ্চিত হামরোগী ১৭২ জন, গত ১৫ মার্চ থেকে ২৪ এপ্রিল পর্যন্ত হামরোগী চার হাজার ২৩১ জন।
১৫ মার্চ থেকে ২৪ এপ্রিল পর্যন্ত সন্দেহজনক হাম রোগে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ১৯ হাজার ৭০৫ জন। একই সময়ে সুস্থ হয়ে হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র পেয়েছেন ১৬ হাজার ৫২৭ জন।
