যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশি শিক্ষার্থী খুন: রোমহর্ষক তথ্য

✍︎ নাগরিক নিউজ ডেস্ক ✍︎

যুক্তরাষ্ট্রে দুই বাংলাদেশি শিক্ষার্থীকে হত্যায় অভিযুক্ত হিশাম আবুগারবিয়াকে (২৬) জামিন না দেওয়ার অনুরোধ করেছেন রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী। আদালতে এ সংক্রান্ত আবেদনের নথিতে আইনজীবী উল্লেখ করেছেন, লাশ গুম করতে একটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) প্ল্যাটফর্মে উত্তর খুঁজেছিলেন হিশাম। 

আদালতের নথি অনুযায়ী, চ্যাটজিপিটিকে হিশাম জিজ্ঞেস করেছিলেন- ‘একজন মানুষকে কালো ময়লার ব্যাগে ভরে ডাস্টবিনে ফেলে দিলে কী হয়?’ চ্যাটজিপিটি জবাব দেয়, ‘এটি বিপজ্জনক শোনাচ্ছে।’ এর পরিপ্রেক্ষিতে হিশাম আরেকটি বার্তায় জিজ্ঞেস করেন- ‘তারা কীভাবে জানতে পারবে?’

এআই প্ল্যাটফর্মে এমন বার্তা আদানপ্রদানের ঝুঁকির বিষয়ে চ্যাটজিপিটির মূল প্রতিষ্ঠান ওপেনএআইয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করেছে এনবিসি নিউজ। তবে তাৎক্ষণিক সাড়া পাওয়া যায়নি। আদালতের নথিতে আইনজীবী উল্লেখ করেছেন, দুই বাংলাদেশি শিক্ষার্থী জামিল লিমন ও নাহিদা বৃষ্টি নিখোঁজের তিনদিন আগে (১৩ এপ্রিল) হিশাম এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজেছিলেন।

যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডা অঙ্গরাজ্যে দক্ষিণ ফ্লোরিডা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ইউএসএফ) দুই বাংলাদেশি পিএইচডি শিক্ষার্থীকে নৃশংসভাবে হত্যার ঘটনায় চাঞ্চল্যকর সব তথ্য প্রকাশ করেছেন মার্কিন প্রসিকিউটররা। টাম্পা বের একটি ব্রিজ থেকে উদ্ধার হওয়া জামিল লিমন (২৭) এবং তাঁর নিখোঁজ বন্ধু নাহিদা বৃষ্টির (২৭) অন্তর্ধান রহস্যে এখন মূল অভিযুক্ত লিমনেরই রুমমেট হিশাম আবুঘারবিয়া (২৬)।

রোববার (২৬ এপ্রিল) হিলসবোরো কাউন্টি আদালতে প্রসিকিউটরদের দাখিল করা একটি প্রি-ট্রায়াল ডিটেনশন মোশন থেকে জানা গেছে, খুনের ধরন এতটাই বীভৎস ছিল যে অভিযুক্তকে জামিন দিলে তা সমাজের জন্য চরম বিপদের কারণ হতে পারে।

তদন্তকারীদের তথ্যমতে, গত ১৬ এপ্রিল থেকে নিখোঁজ হওয়ার পর হাওয়ার্ড ফ্রাঙ্কল্যান্ড ব্রিজের ওপর লিমনের ক্ষতবিক্ষত মৃতদেহ উদ্ধার করা হয়। ময়নাতদন্তের রিপোর্টে লিমনের শরীরে একাধিক ধারালো অস্ত্রের আঘাতের চিহ্ন পাওয়া গেছে। এর মধ্যে তাঁর পিঠের নিচের দিকে একটি গভীর ক্ষত পাওয়া গেছে যা তাঁর লিভার ভেদ করে গিয়েছিল। প্রসিকিউটররা আদালতকে জানিয়েছেন, লিমনের বন্ধু নাহিদা বৃষ্টির পরিণতিও একই রকম হয়েছে এবং তাঁকেও একইভাবে ব্রিজের আশপাশে কোথাও ফেলে দেওয়া হয়েছে বলে তাঁদের ধারণা।

নাহিদা বৃষ্টির পরিবারকে ইতিমধ্যে তদন্তকারীরা জানিয়েছেন, বৃষ্টির বেঁচে থাকার সম্ভাবনা ক্ষীণ। এর পেছনে বড় কারণ হিসেবে তাঁরা লিমন ও হিশামের শেয়ার করা অ্যাপার্টমেন্টে ‘বিপুল পরিমাণ রক্ত’ দেখেছেন। বৃষ্টির ভাই সিএনএন-এর সহযোগী সংবাদমাধ্যম ডব্লিউটিএসপি-কে জানিয়েছেন, অ্যাপার্টমেন্টে পাওয়া রক্তের পরিমাণ দেখে গোয়েন্দারা নিশ্চিত যে সেখানে বড় ধরনের কোনো সহিংসতা ঘটেছে।

উল্লেখ্য, রোববার রাতে হাওয়ার্ড ফ্রাঙ্কল্যান্ড ব্রিজের দক্ষিণ দিকের জলাশয় থেকে কিছু মানুষের দেহাংশ উদ্ধার করা হয়েছে, তবে ডিএনএ পরীক্ষার আগে তা বৃষ্টির কি না তা নিশ্চিত করা যাচ্ছে না।

তদন্তের শুরুতে হিশাম আবুঘারবিয়া গোয়েন্দাদের জানিয়েছিলেন, তিনি ওই দিন লিমন বা বৃষ্টি কাউকে দেখেননি। এমনকি তিনি দাবি করেছিলেন, তাঁর গাড়িতে তাঁরা কখনোই ওঠেননি এবং তিনি ক্লিয়ারওয়াটার বিচ এলাকাতেও যাননি।

তবে প্রসিকিউটররা আদালতে হিশামের মিথ্যা জবানবন্দি খণ্ডন করতে নিচের প্রমাণগুলো উপস্থাপন করেন:

১. মোবাইল ও গাড়ির লোকেশন: লিমনের ফোনের শেষ লোকেশন এবং হিশামের গাড়ির লোকেশন একই সময়ে ক্লিয়ারওয়াটার বিচে পাওয়া গেছে। যখন তাঁকে এই প্রমাণের মুখোমুখি করা হয়, তখন হিশাম তাঁর বয়ান বদলে বলেন যে, তিনি লিমন ও তাঁর বান্ধবীকে সেখানে নামিয়ে দিতে গিয়েছিলেন।

২. আঙুলে ব্যান্ডেজ ও অদ্ভুত অজুহাত: জেরা করার সময় গোয়েন্দারা হিশামের বাম হাতের কনিষ্ঠ আঙুলে ব্যান্ডেজ দেখতে পান। হিশাম দাবি করেন পেঁয়াজ কাটতে গিয়ে তিনি ব্যথা পেয়েছেন। তবে প্রসিকিউটরদের ধারণা, ধস্তাধস্তির সময় এই চোট লেগে থাকতে পারে।

. আলামত মোছার সরঞ্জাম: লিমন ও হিশামের অ্যাপার্টমেন্ট থেকে একটি সিভিএস ফার্মেসির রসিদ পাওয়া গেছে। ১৬ এপ্রিলের সেই রসিদে দেখা যায়, হিশাম প্রচুর পরিমাণে ট্র্যাশ ব্যাগ, লাইসল ওয়াইপস এবং ফেব্রেজ কিনেছিলেন—যা মূলত খুনের আলামত ও রক্তের গন্ধ মোছার জন্য ব্যবহৃত হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

হিশাম আবুঘারবিয়ার বিরুদ্ধে বর্তমানে জোড়া খুনের (পরিকল্পিত হত্যা) পাশাপাশি মৃতদেহ লুকিয়ে ফেলা, আলামত নষ্ট করা, ভুয়া বন্দিত্ব এবং শারীরিক আঘাতের একাধিক অভিযোগ আনা হয়েছে। গত শুক্রবার একটি সাধারণ ঘরোয়া বিবাদের সূত্র ধরে পুলিশ তাঁর বাড়িতে গেলে এই ভয়াবহ সত্য প্রকাশ্যে আসে।

হিলসবোরো কাউন্টি শেরিফ চ্যাড ক্রনিস্টার এক আবেগঘন বিবৃতিতে বলেন, ‘এই ঘটনাটি আমাদের পুরো কমিউনিটিকে নাড়িয়ে দিয়েছে। আমরা আশা করেছিলাম হয়তো তাদের সুস্থভাবে ফিরে পাব, কিন্তু এমন পরিণতি অত্যন্ত মর্মান্তিক।’

আগামী মঙ্গলবার (২৮ এপ্রিল) হিশামের প্রি-ট্রায়াল ডিটেনশন (বিচার শুরুর আগে আটকাদেশ) শুনানি অনুষ্ঠিত হবে। সেখানে প্রসিকিউটররা তাঁকে বিচার শেষ না হওয়া পর্যন্ত বিনা জামিনে কারাগারে রাখার পক্ষে যুক্তি দেবেন।

শেয়ার করতে

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *