লিমন ও বৃষ্টি হত্যাকাণ্ড: হিশামকে আটক রাখার নির্দেশ

✍︎ নাগরিক নিউজ ডেস্ক ✍︎

যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব সাউথ ফ্লোরিডার দুই শিক্ষার্থীকে হত্যার অভিযোগে মূল অভিযুক্ত হিশাম আবু গারবিয়েহকে জামিনবিহীনভাবে আটক রাখার আদেশ দিয়েছেন আদালত।

গতকাল মঙ্গলবার ফ্লোরিডার টেম্পা এলাকার একটি আদালতে সংক্ষিপ্ত শুনানির সময় হিলসবোরো কাউন্টির বিচারক লোগান মারফি ২৬ বছর বয়সী হিশামকে কোনো সাক্ষী বা নিহতদের আত্মীয়দের সঙ্গে যোগাযোগ করতে না দেওয়ারও নির্দেশ দেন।

দুই বাংলাদেশি পিএইচডি শিক্ষার্থী জামিল লিমন ও নাহিদা বৃষ্টিকে হত্যার ঘটনায় সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের একটি সোয়াট টিম হিশামকে গ্রেপ্তার করে। আদালতের নথি অনুযায়ী, আবু গারবিয়েহের বিরুদ্ধে অস্ত্রসহ প্রথম-ডিগ্রি হত্যার দুটি অভিযোগসহ অন্যান্য অভিযোগও রয়েছে। দোষী সাব্যস্ত হলে আবু গারবিয়েহের মৃত্যুদণ্ড হতে পারে। যদিও প্রসিকিউটররা এখনও জানাননি, তারা মৃত্যুদণ্ড চাইবেন কিনা।

গতকাল সকালের শুনানির সময় আবু গারবিয়েহ আদালতে উপস্থিত ছিলেন না। সরকারি আইনজীবী জেনিফার স্প্র্যাডলি গত সোমবার বলেন, তাঁর দপ্তর এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করবে না।

এক আত্মীয় জানিয়েছেন, বাংলাদেশের ২৭ বছর বয়সী ডক্টরাল শিক্ষার্থী জামিল লিমন ও নাহিদা বৃষ্টি গত ১৬ এপ্রিল নিখোঁজ হওয়ার আগে বিয়ের কথা ভাবছিলেন। লিমনকে শেষবার ক্যাম্পাসের বাইরের একটি ভবনে দেখা গিয়েছিল, যেখানে তিনি আবু গারবিয়েহ এবং আরেকজন রুমমেটের সঙ্গে একটি অ্যাপার্টমেন্টে থাকতেন।

গোয়েন্দারা সেলফোনের অবস্থান ও লাইসেন্স প্লেট রিডারের ডেটা ব্যবহার করে আবু গারবিয়েহর গাড়ি ও লিমনের ফোন ট্র্যাক করে সেই সেতু পর্যন্ত পৌঁছান, যেখানে গত শুক্রবার সকালে লিমনের মৃতদেহ পাওয়া যায়। প্রসিকিউটরদের দাখিল করা একটি প্রতিবেদন অনুসারে, লিমনের শরীরে অসংখ্য ছুরির আঘাতের চিহ্ন ছিল এবং তাঁকে বাঁধা অবস্থায় দেখা যায়।

ডেপুটিরা বৃষ্টির সন্ধান চালিয়ে যাচ্ছিলেন। গত রোববার শেরিফের কার্যালয় থেকে জানানো হয়, সেতুর কাছে জলাশয়ে একটি মৃতদেহ পাওয়া গেছে। শেরিফের কার্যালয় জানায়, গতকাল পর্যন্ত মৃতদেহটি শনাক্ত করা যায়নি।

‘বাবা-মাকে এত জোরে কখনও কাঁদতে শুনিনি’
নিহত পিএইচডি শিক্ষার্থী লিমনের ছোট ভাই জোয়ায়ের আহমেদ ফ্লোরিডার স্থানীয় গণমাধ্যম টেম্পা বে টোয়েন্টিফোরকে বলেন, ‘এটা আমার জন্য ছিল দীর্ঘ ও অন্ধকার রাত। আমি কখনও আমার মা-বাবাকে এত জোর শব্দে কাঁদতে শুনিনি। তারা শিশুর মতো কাঁদছিলেন।’ মূল অভিযুক্ত হিশাম সম্পর্কে লিমনের উদ্ধৃতি দিয়ে জোবায়ের বলেন, ‘কিছুদিন আগে আমার ভাই ওই বাসায় উঠেছিলেন। তিনি প্রায়ই বলতেন– লোকটি কেমন যেন, কারও সঙ্গে মিলমিশ নেই; কিছুটা সাইকোপ্যাথ টাইপ। আমার ভাই এটা বুঝতে পারছিলেন না।’

দুই শিক্ষার্থী নিখোঁজ হওয়ার সময় তাঁদের ও সন্দেহভাজন আসামির কর্মকাণ্ডের বিবরণও তুলে ধরা হয়েছে।

এপ্রিল ১৬: লিমন-বৃষ্টির সঙ্গে শেষ যোগাযোগ

গত শনিবার হিলসবরো কাউন্টি আদালতে আবেদনটি করেছিলেন সরকারি আইনজীবীরা। এতে বলা হয়েছে, ১৬ এপ্রিলেও বন্ধুবান্ধবদের সঙ্গে যোগাযোগ ছিল লিমন ও বৃষ্টির। দুই শিক্ষার্থী নিজেদের মধ্যেও অল্প সময়ের জন্য ফোনালাপ করেছিলেন। তবে এর পরে তাঁদের আর খোঁজ পাওয়া যায়নি।

আদালতে করা আবেদনে বলা হয়েছে, সিসিটিভি ফুটেজে ১৬ এপ্রিল দিনের মাঝামাঝি সময়ে বৃষ্টিকে ইউনিভার্সিটি অব সাউথ ফ্লোরিডার (ইউএসএফ) ক্যাম্পাসে হাঁটাচলা করতে দেখা যায়। সেদিন সন্ধ্যায় তাঁর চশমা নেওয়ার জন্য এক বন্ধুর সঙ্গে দেখা করার কথা ছিল। তবে বৃষ্টি যাননি। এমনকি ওই বন্ধু তাঁকে ফোন করলেও তিনি তা ধরেননি।

লিমনের মুঠোফোনের অবস্থান অনুযায়ী, সেদিন সন্ধ্যা ৭টা ৪৩ মিনিটের দিকে ফ্লোরিডার ক্লিয়ারওয়াটার এলাকায় গিয়েছিলেন তিনি। এর আগে তাঁর আবাসস্থল ও ক্যাম্পাসের কাছাকাছি তাঁর মুঠোফোনের অবস্থান দেখা যায়। লিমনের বসবাসের স্থান থেকে ক্লিয়ারওয়াটারের দূরত্ব মোটামুটি ৩২ মাইল।

আইনজীবীরা বলেছেন, লিমনের মুঠোফোনের অবস্থান ক্লিয়ারওয়াটারে দেখানোর ১০ মিনিটের মধ্যে ওই এলাকায় যেতে দেখা যায় আবুঘরবেহের সাদা রঙের হুন্দাই জেনেসিস জি-৮০ মডেলের গাড়িটিকে। মুঠোফোন ও গাড়ি চলাচলের তথ্য অনুযায়ী, সে রাতে আবুঘরবেহ ও লিমনের মুঠোফোনের অবস্থানের মধ্যে মিল ছিল।

লিমন ও আবুঘরবেহের অন্য একজন রুমমেট দেখতে পান আবুঘরবেহ একটি চাকাওয়ালা ট্রলি ব্যবহার করে তাঁর ঘর থেকে কিছু কার্ডবোর্ডের বাক্স অ্যাপার্টমেন্ট কমপ্লেক্সের ময়লা ফেলার স্থানের দিকে নিয়ে যাচ্ছেন।

রাত সাড়ে ১০টার দিকে সিভিএস নামে ওষুধ ও খুচরা পণ্য বিক্রেতা প্রতিষ্ঠানে আবুঘরবেহের মুঠোফোন থেকে আবর্জনা রাখার ব্যাগ, ঘর পরিষ্কার করার লাইজল, দুর্গন্ধনাশক ফেব্রিজ ও অন্য কিছু পণ্যের অর্ডার করা হয়। প্রায় আধা ঘণ্টা পর তাঁদের অ্যাপার্টমেন্টের দরজায় পণ্যগুলো পৌঁছে দেয় সরবরাহ সেবা প্রতিষ্ঠান ডোরড্যাশ।

আদালতে করা আবেদন অনুযায়ী, লিমন ও আবুঘরবেহের অন্য একজন রুমমেট দেখতে পান, আবুঘরবেহ একটি চাকাওয়ালা ট্রলি ব্যবহার করে তাঁর ঘর থেকে কিছু কার্ডবোর্ডের বাক্স অ্যাপার্টমেন্ট কমপ্লেক্সের ময়লা ফেলার স্থানের দিকে নিয়ে যাচ্ছেন।

এপ্রিল ১৭: দুই শিক্ষার্থী নিখোঁজের খবর

মামলার গ্রেফতারি পরোয়ানার হলফনামায় বলা হয়েছে, হিশাম আবুঘরবেহ চ্যাটজিপিটির কাছে একটি বিষয় জানতে চেয়েছিলেন, তা হলো ‘হিলসবরো রিভার স্টেট পার্কে কি গাড়িতে তল্লাশি করা হয়?’ ১৭ এপ্রিল রাত ১টা থেকে সাড়ে ৪টার মধ্যে দুইবার হাওয়ার্ড ফ্রাঙ্কল্যান্ড সেতুতে গিয়েছিলেন তিনি।

এরই মধ্যে লিমন ও বৃষ্টির নিখোঁজের খবর আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো হয়। এর পরদিন বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে বৃষ্টির কাজের জায়গায় তল্লাশি করে পুলিশ। সেখান থেকে তাঁর খাবারের বাক্স, একটি ম্যাকবুক, আইপ্যাডসহ বিভিন্ন ব্যক্তিগত জিনিসপত্র উদ্ধার করা হয়।

এপ্রিল ২২: সন্দেহভাজনের মাকে জিজ্ঞাসাবাদ

আদালতে করা আবেদন অনুযায়ী, হিশাম আবুঘরবেহের মায়ের সঙ্গে কথা বলেন তদন্তকারীরা। তিনি জানান, তাঁর সঙ্গে সবশেষ ১৮ এপ্রিল আবুঘরবেহের দেখা হয়েছিল। মায়ের ভাষ্য অনুযায়ী, তাঁর ছেলে রাগ নিয়ন্ত্রণ করতে পারতেন না। এ ছাড়া অতীতে পরিবারের সঙ্গেও সহিংস আচরণ করেছিলেন তিনি।

২০২৩ সালে শারীরিক আঘাত বা লাঞ্ছনার অভিযোগে দুইবার গ্রেফতার হয়েছিলেন আবুঘরবেহ। পরে অভিযোগগুলো তুলে নেওয়া হয়েছিল। তবে ওই ঘটনাগুলোর একটির পর তাঁর ভাই একটি নিষেধাজ্ঞার জন্য আবেদন করেছিলেন। ওই আবেদনের পর আবুঘরবেহকে তাঁর ভাইয়ের কাছে বা তাঁর বাড়িতে যাওয়ার ওপর নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছিল। গত বছরের মে মাসে সেই নিষেধাজ্ঞা শেষ হয়।

২৩ এপ্রিল: তল্লাশি অভিযান

হিলসবরো কাউন্টি শেরিফের অফিস নিখোঁজ দুই শিক্ষার্থীর অবস্থাকে ‘বিপন্ন’ হিসেবে উল্লেখ করে। তদন্তকারীরা একটি ময়লা ফেলার স্থানে তল্লাশি চালান। সেখানে তাঁরা রক্তমাখা একটি কালো রঙের ফ্লোর ম্যাট, বৃষ্টির মুঠোফোনের কভার এবং লিমনের মানিব্যাগ, চশমা ও রক্তমাখা পোশাক খুঁজে পান।

হলফনামায় বলা হয়েছে, লিমন ও বৃষ্টিকে শেষ কবে দেখেছিলেন, সে বিষয়ে অসংলগ্ন তথ্য দেন আবুঘরবেহ। প্রথমে তিনি গোয়েন্দাদের বলেন, ওই দুজন কখনোই তাঁর গাড়িতে ওঠেননি। তিনি নিজেও ক্লিয়ারওয়াটার এলাকায় যাননি। কিন্তু যখন আবুঘরবেহের গাড়ি ক্লিয়ারওয়াটারে থাকার প্রমাণ দেখানো হয়, তখন তিনি দাবি করেন যে তিনি সেখানে মাছ ধরার জায়গা খুঁজতে গিয়েছিলেন। পরে তিনি আবারও কথা বদলে গোয়েন্দাদের বলেন, লিমন তাঁর বান্ধবীসহ ক্লিয়ারওয়াটারে পৌঁছে দেওয়ার জন্য অনুরোধ করেছিলেন।

হাওয়ার্ড ফ্রাঙ্কল্যান্ড সেতুতে তল্লাশি চালিয়ে কালো রঙের একটি আবর্জনার ব্যাগ খুঁজে পান গোয়েন্দারা। আবুঘরবেহের ফোনের তথ্য অনুযায়ী, ১৭ এপ্রিল ওই জায়গাতে থেমেছিলেন তিনি।

আদালতে করা আবেদন অনুযায়ী, এই জিজ্ঞাসাবাদের সময় আবুঘরবেহের বাঁ হাতের কনিষ্ঠ আঙুলে ব্যান্ডেজ জড়ানো ছিল। তিনি দাবি করেন যে পেঁয়াজ কাটার সময় এই ক্ষত হয়েছে। তবে নথিপত্র অনুযায়ী, গোয়েন্দারা আবুঘরবেহের বাঁ হাতের ওপরের অংশে একটি টাটকা ক্ষত এবং দুই পায়ে আরও কিছু কাটার দাগ লক্ষ করেন। আইনজীবীরা বলেছেন, ২৩ এপ্রিল আবুঘরবেহ আবারও চ্যাটজিপিটির কাছে জানতে চান, ‘নিখোঁজ বিপন্ন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ বলতে কী বোঝায়?’

এপ্রিল ২৪: খোঁজ পাওয়া গেল লিমনের মরদেহের

আদালতে করা আবেদন অনুযায়ী, হাওয়ার্ড ফ্রাঙ্কল্যান্ড সেতুতে তল্লাশি চালিয়ে কালো রঙের একটি আবর্জনার ব্যাগ খুঁজে পান গোয়েন্দারা। আবুঘরবেহের ফোনের তথ্য অনুযায়ী, ১৭ এপ্রিল ওই জায়গাতে থেমেছিলেন তিনি।

সরকারি কৌঁসুলিরা বলছেন, আবর্জনার ওই ব্যাগ আবুঘরবেহের বিছানার নিচে পাওয়া ব্যাগগুলোর মতো। আদালতে করা আবেদনে তাঁরা আরও বলেছেন, সেতুতে পাওয়া ব্যাগের ভেতর থেকে একজন পুরুষের দেহাবশেষ উদ্ধার করা হয়। সেগুলো লিমনের বলে শনাক্ত করা হয়।

আদালতে করা আবেদনে লিমনের মৃত্যুকে হত্যাকাণ্ড হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, লিমনের শরীরে ধারালো অস্ত্রের একাধিক আঘাত পাওয়া গেছে। এ ছাড়া চিকিৎসা-সংক্রান্ত পর্যবেক্ষকের প্রতিবেদন অনুযায়ী, তাঁর শরীরে অনেক আঘাতের মধ্যে একটি হলো কোমরের নিচের দিকে একটি গভীর ছুরিকাঘাত। সেটি তাঁর যকৃৎ ফুটো করে দিয়েছিল। ওই দিন সকালেই ফ্লোরিডার লুটজ এলাকার একটি বাড়ি থেকে আবুঘরবেহকে গ্রেপ্তার করা হয়।

২৫ এপ্রিল: আদালতে তোলা হয় আসামিকে

এদিন সকালে আবুঘরবেহকে প্রথমবারের মতো আদালতে তোলা হয়। হিলসবরো কাউন্টি শেরিফের কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, হত্যার অভিযোগ ছাড়া তাঁর বিরুদ্ধে আরও কয়েকটি অভিযোগ আনা হয়েছে। সেগুলো হলো—বেআইনিভাবে মৃতদেহ সরানো, গোপন করার উদ্দেশ্যে মৃত্যুর খবর না জানানো, তথ্যপ্রমাণ নষ্ট করা, অবৈধভাবে আটকে রাখা এবং শারীরিক লাঞ্ছনা।

শেয়ার করতে

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *