নিয়োগ হবে ১ লাখ ৩০ হাজার স্বাস্থ্যকর্মী, ৮০ শতাংশ নারী

✍︎ নাগরিক প্রতিবেদক ✍︎

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছেন, ‘দুঃখজনক হলেও সত্য শহরের মানুষ কিছুটা চিকিৎসাসেবা পেলেও গ্রামের মানুষের আমরা চিকিৎসা সুবিধা দিতে পারিনি। সে জন্য আমরা বলেছিলাম, আমরা একটি ব্যবস্থা গ্রহণ করতে চাই। আমরা যদি মানুষকে সচেতন করতে পারি, সচেতনতার মাধ্যমে অসুস্থ মানুষের সংখ্যা কমিয়ে আনতে পারি, তাহলে অসুস্থতার হার কমে আসবে। তারপরও যারা অসুস্থ হবে, তারা বেটার চিকিৎসা পাবে।’

প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, ‘আমরা দেশে এক লাখ ৩০ হাজার স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগের উদ্যোগ গ্রহণ করেছি। যেখানে ৮০ ভাগ থাকবেন নারী। তাঁদের দায়িত্ব হলো গ্রামে গ্রামে মানুষের ঘরে যাওয়া। শহরেও তাঁরা থাকবেন, মানুষকে সচেতন করবেন। আমরা বেশি জোর দেব গ্রামের মানুষদের। তাঁরা গ্রামে গিয়ে মানুষকে বোঝাবেন কোন খাবার খেলে ডায়াবেটিস হবে, কোন খাবার খেলে হার্টে সমস্যা হবে না, সেসব বিষয়ে সচেতন করবেন, হাইজিন সম্পর্কে মানুষকে সচেতন করবেন। এতে অসুস্থ রোগীর সংখ্যা কমে আসবে।’

শনিবার সকালে সিলেট সিটি করপোরেশন আয়োজিত সুধী সমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী এসব কথা বলেন। সিলেট সিটি করপোরেশন এলাকায় সুরমা নদীর উভয় তীরে সৌন্দর্যবর্ধনসহ বন্যা প্রতিরোধী অবকাঠামো নির্মাণ প্রকল্পের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন উপলক্ষে এই সুধী সমাবেশের আয়োজন করা হয়।

নদীদূষণ প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বুড়িগঙ্গার পানি ইতিমধ্যে বিষাক্ত হয়ে গেছে। অন্যান্য নদীর ক্ষেত্রেও এমন পরিস্থিতি হলে, তা ভয়াবহ সংকট তৈরি করবে। এ জন্য প্লাস্টিক, পলিথিন ও অন্যান্য বর্জ্য নির্দিষ্ট স্থানে ফেলার বিষয়ে সচেতনতা বাড়াতে হবে। বিশেষ করে শিক্ষার্থীদের এ বিষয়ে শিক্ষা দিলে তারা পরিবারেও সচেতনতা ছড়িয়ে দিতে পারবে।

সড়ক যোগাযোগের বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘নির্বাচনের সময় যখন সিলেটে এসেছিলাম, তখন বলেছিলাম—সিলেট থেকে লন্ডন যেতে ৯ ঘণ্টা বা সাড়ে ৯ ঘণ্টা লাগে। ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের অবস্থা এতই খারাপ যে মনে হয় ১০ ঘণ্টার বেশি সময় লেগে যায়। সেদিন বলেছিলাম, আমরা সরকার গঠন করার পরে এই কাজটিতে হাত দেব। সরকার গঠনের পরে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের সাথে বসেছি। তারা জানাল, ১১টি জায়গায় প্রশাসনিক জটিলতাসহ নানা কারণে কাজটি বন্ধ রয়েছে। রাস্তাটির সকল জটিলতা শেষে কাজটি শুরু হতে সময় লাগবে এবং শুরু হলে তো শেষ হবে ইনশা আল্লাহ। কয়েক বছরের মধ্যে আমরা এটা শেষ করতে পারব, আর কাজটি হয়ে গেলে মানুষের যাতায়াতে এত কষ্ট ভোগ করতে হবে না।’

প্রধানমন্ত্রী বলেন, সড়কের পাশাপাশি রেল যোগাযোগ উন্নয়নে সরকার গুরুত্ব দিচ্ছে। ডাবল লাইন স্থাপনসহ রেলব্যবস্থা উন্নত করা হলে খরচ কমবে এবং সময় সাশ্রয় হবে। একই সঙ্গে কৃষিজমি রক্ষার বিষয়টিও বিবেচনায় রাখা হচ্ছে।

তারেক রহমান বলেন, ‘সারা দেশের বন্ধ সব কলকারখানা চালু করা হবে। সে জন্য সংশ্লিষ্ট সব মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে আলোচনা হয়েছে। সিলেটে একটি আইটি পার্ক করা হয়েছে, যেটি সচল নেই। এটি নিয়ে আলোচনা হয়েছে, খুব দ্রুতই এটি চালু করা হবে। যেখানে আমাদের তরুণেরা ফ্রিল্যান্সিং করতে পারে, আইটির কাজ করতে পারে। যারা কাজ করতে পারছে আর যারা পারছে না, তাদের এখানে সুযোগ করে দেওয়া হবে। আমরা আইটি সেক্টরে এই কাজ করছি। বিভিন্ন জায়গায় আমরা ভোকেশনাল ইনস্টিটিউটগুলো আপডেট করতে, মডারেট করতে, যাতে মানুষ যারা আছে, যাদের শিক্ষাগত যোগ্যতা অনুযায়ী তারা কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করতে পারে।’

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘দেখেন আড়াই মাস বয়সী শিশু কিন্তু হাঁটতে পারে না, তাকে হাঁটার জন্য আরও কিছুদিন অপেক্ষা করতে হয়। বর্তমান সরকারের বয়স আড়াই মাসের মতো। তবে এর ভেতরে দেশের মানুষকে আমরা যত কমিটমেন্ট দিয়েছিলাম, সেই কমিটমেন্টগুলো বাস্তবায়নের কাজ শুরু করেছি।’

এর আগে নগরীর ক্বিন ব্রিজ এলাকায় বিভাগীয় নগরী সিলেটকে বন্যামুক্ত রাখতে সুরমা নদীর সঙ্গে সংযুক্ত ছড়া-নালায় স্লুইসগেট ও নদীর দুই তীরের ১৫ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে প্রতিরক্ষা বাঁধ নির্মাণ—এ প্রকল্পের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপনের উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।

শনিবার সকাল ৯টা ৫২ মিনিটে ইউএস-বাংলার বিএস-৫৩১ ফ্লাইটে সিলেটে এসে পৌঁছান তিনি। তাঁর সঙ্গে রয়েছেন সহধর্মিণী ও সিলেটের কন্যা ডা. জুবাইদা রহমান। প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব গ্রহণের পর এটিই তারেক রহমানের প্রথম পুণ্যভূমি সিলেট সফর। পরে হজরত শাহজালাল (র.)-এর মাজার জিয়ারত করেন তিনি।

বিমানবন্দরে প্রধানমন্ত্রীকে স্বাগত জানান বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আবদুল মুক্তাদির, শ্রম ও প্রবাসী কল্যাণমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী, সিলেট সিটি করপোরেশনের প্রশাসক ও জেলা বিএনপির সভাপতি কাইয়ুম চৌধুরী, সিলেট-৬ আসনের সংসদ সদস্য এমরান আহমদ চৌধুরী, বিভাগীয় কমিশনার মশিউর রহমান এবং জেলা প্রশাসক সারওয়ার আলমসহ স্থানীয় বিএনপি নেতা ও প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা।

প্রধানমন্ত্রী সিলেটের উন্নয়ন প্রসঙ্গে বলেন, শুধু সিলেট নয়, সারাদেশের উন্নয়ন নিয়ে সরকারের পরিকল্পনা রয়েছে। সিলেট-ঢাকা রেললাইন ডাবল করার চিন্তা চলছে। সড়কপথের কাজ যাতে দ্রুত শেষ হয় তার ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। 

সিটি করপোরেশন এলাকায় সুরমা নদীর উভয়পাড়ে সৌন্দর্যবর্ধনসহ বন্যা প্রতিরোধ অবকাঠামো নির্মাণ প্রকল্পের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন উপলক্ষে এ সুধী সমাবেশে অনুষ্ঠিত হয়। এর আগে, সাড়ে চার হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে প্রকল্পের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। ওই সময় তিনি সুরমার তীরে দাঁড়িয়ে নদীর অবস্থাও পর্যবেক্ষণ করেন।

বক্তব্যে তারেক রহমান কৃষি, পানির ব্যবহার ও কলকারখানা নির্মাণ প্রসঙ্গে বলেন, দিন দিন মাটির নিচ থেকে পানি উত্তোলনের ফলে সমস্যার সৃষ্টি হচ্ছে। সেজন্য পানি ধারণ করে রাখতে এবং কৃষিকাজে সহায়তার জন্য খাল খনন কর্মসূচি শুরু করা হয়েছে। 

তিনি বলেন, সরকারের প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী, দেশের সব বন্ধ কলকারখানা চালু করা হচ্ছে। সিলেটে বিদেশ প্রবণতা কমাতে এখানে কলকারখানা করা হবে। আইটি সেক্টরকে গুরুত্ব দেওয়া হবে। 

নগর ভবন প্রাঙ্গণে অনুষ্ঠিত সমাবেশে সভাপতিত্ব করেন সিটি করপোরেশনের প্রশাসক আব্দুল কাইয়ুম চৌধুরী। সিসিক কর্মকর্তা সুচন্দা রায়ের পরিচালনায় বক্তব্য দেন বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আবদুল মুক্তাদির, শ্রম ও প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী, প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির, হুইপ জিকে গৌছ। সিটি করপোরেশনের সমস্যা ও সম্ভাবনা বিষয়ে তুলে ধরেন প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা রেজাই রাফিন সরকার। সমাবেশে প্রধানমন্ত্রীর স্ত্রী ডা. জুবাইদা রহামান উপস্থিত ছিলেন। এছাড়াও সিলেটের বিভিন্ন আসনের এমপি, রাজনৈতিক দলের নেতারাসহ বিভিন্ন পেশার লোকজন উপস্থিত ছিলেন। 

সুধী সমাবেশে শেষে বেলা সাড়ে ১২টার দিকে প্রধানমন্ত্রী সদর উপজেলার বাসিয়া নদী পুনঃখনন কর্মসূচি উদ্বোধনের উদ্দেশ্যে রওনা দেন। এ ছাড়া বিকেল ৩টায় সিলেট স্টেডিয়ামে ‘নতুন কুঁড়ি স্পোর্টস-২০২৬’ এর উদ্বোধন এবকং বিকেল ৫টায় শিল্পকলা একাডেমিতে দলীয় জনসভায় বক্তব্য রাখবেন প্রধানমন্ত্রী। 

এর আগে, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সকাল ১০টার দিকে ইউএসবাংলার একটি ফ্লাইটে ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণ করে। বৃষ্টির মধ্যে তিনি ওসমানী বিমানবন্দর থেকে সরাসরি রওনা দেন হজরত শাহজালাল (র.) মাজারে। সকাল সাড়ে ১০টার দিকে তিনি মাজার জিয়ারত ও মোনাজাত করেন। 

শেয়ার করতে

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *