✍︎ নাগরিক প্রতিবেদন ✍︎
জেলা প্রশাসক (ডিসি) সম্মেলন-২০২৬ শুরু হচ্ছে রোববার (৩ মে)। চলবে আগামী ৬ মে পর্যন্ত।ডিসি সম্মেলনে আট বিভাগীয় কমিশনার এবং ৬৪ জেলার ডিসি অংশ নেবেন।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান রোববার সকাল সাড়ে ১০টায় রাজধানীর আব্দুল গনি রোডে সচিবালয়ের পাশে ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে সম্মেলনের উদ্বোধন করবেন।
ডিসি সম্মেলন উপলক্ষ্যে শনিবার (২ মে) সচিবালয়ে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সম্মেলন কক্ষে মন্ত্রিপরিষদ সচিব মো. নাসিমুল গনি ব্রিফ করেন। সংবাদ সম্মেলনে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের জেলা ও মাঠ প্রশাসন অনুবিভাগের অতিরিক্ত সচিব মো. হুমায়ুন কবির ও যুগ্মসচিব মোহাম্মদ খোরশেদ আলম খান উপস্থিত ছিলেন।
সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, ডিসি সম্মেলন চলাকালে বিভাগীয় কমিশনার ও ডিসিরা রাষ্ট্রপতি, জাতীয় সংসদের স্পিকার, প্রধান বিচারপতির সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ ও নির্দেশনা নেবেন এবং মতবিনিময় করবেন। এছাড়াও প্রধান নির্বাচন কমিশনার ও কমিশনারগণের সঙ্গে এবং দুর্নীতি দমন কমিশনের সাথে কার্য-অধিবেশনে বসবেন।
এবারের সম্মেলনে মোট ৩৪টি কার্য অধিবেশন অনুষ্ঠিত হবে বলে জানিয়েছে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ। ডিসি সম্মেলনে সারা দেশ থেকে ডিসিরা অংশ নেন। মাঠ প্রশাসনের সাথে সরকারের সরাসরি যোগাযোগের মাধ্যম এই ডিসি সম্মেলন। সম্মেলনের মাধ্যমে রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী, প্রধান বিচারপতির সঙ্গে সাক্ষাৎ ও মতবিনিময়ের সুযোগ পান ডিসিরা। সম্মেলনকে সামনে রেখে বিভাগীয় কমিশনার ও ডিসিরা বেশ কিছু প্রস্তাব করেছেন।
পরিধি বাড়লো, কমলো বাজেট
জেলা প্রশাসক (ডিসি) সম্মেলনে এবার পরিধি বাড়ানো হয়েছে, তবে এবার বাজেট গতবারের তুলনায় অর্ধেকেরও কমে নামিয়ে আনা হয়েছে।
শনিবার (২ মে) সচিবালয়ের মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের অডিটোরিয়ামে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গনি এ তথ্য জানান।
তিনি বলেন, দীর্ঘ সময় পর অনুষ্ঠিত এই ডিসি সম্মেলনকে সরকার ‘গণতান্ত্রিক অভিযাত্রার নতুন সূচনা’ হিসেবে দেখছে। স্বৈরশাসনের পর প্রশাসনের বিভিন্ন স্তরে জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা এবং সরকারের নির্বাচনী অঙ্গীকার বাস্তবায়নের অগ্রগতি ত্বরান্বিত করাই এই সম্মেলনের মূল উদ্দেশ্য।
নাসিমুল গনি জানান, নতুনভাবে নিয়োগপ্রাপ্ত জেলা প্রশাসকদের সঙ্গে সরাসরি মতবিনিময়ের মাধ্যমে সরকারের পরিকল্পনা, লক্ষ্য ও বাস্তবায়ন কৌশল স্পষ্টভাবে তুলে ধরতে চায় রাজনৈতিক নেতৃত্ব। ‘কি করতে চাই, কেন করতে চাই, কীভাবে এবং কত দ্রুত করতে চাই—এসব বিষয়ে পরিষ্কার বার্তা দেওয়ার জন্যই সম্মেলনের পরিধি বাড়ানো হয়েছে’ বলে জানান তিনি।
বাজেট প্রসঙ্গে তিনি বলেন, গত বছরের ডিসি সম্মেলনের বাজেট ছিল প্রায় ১ কোটি ৭৩ লাখ টাকা, যেখানে ব্যয় হয়েছিল প্রায় ১ কোটি ২ লাখ টাকা। চলতি বছরের জন্য বাজেট ধরা হয়েছে ৭১ লাখ টাকা, যা প্রায় অর্ধেকে নামিয়ে আনা হয়েছে। যেসব খাতে ব্যয় না করলেও চলে, সেগুলো বাদ দিয়ে ব্যয় সংকোচন করা হয়েছে এবং বাস্তব ব্যয় আরও কমানোর চেষ্টা থাকবে।
এজেন্ডা নির্ধারণ প্রসঙ্গে নাসিমুল গনি বলেন, মাঠ প্রশাসন থেকে আসা বিপুল প্রস্তাবের মধ্যে অনেক বিষয় আগেই অন্তর্ভুক্ত রয়েছে, আবার কিছু প্রস্তাব রাজনৈতিক অগ্রাধিকার অনুযায়ী বিবেচনা করা হয়। সম্মেলন শেষে এসব বিষয় উন্মুক্তভাবে জানানো হবে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
উল্লেখযোগ্য প্রস্তাব
গাজীপুর জেলায় অর্থনৈতিক অঞ্চল স্থাপন করে শিল্প কারখানাসমূহ একটি নির্দিষ্ট অঞ্চলে স্থানান্তরকরণ; ইউনিয়ন উপর-স্বাস্থ্যকেন্দ্রসমূহ পুনর্নির্মাণ/মেরামতকরণ; জনবল ও পর্যাপ্ত ঔষধ সরবরাহকরণ; রংপুর বিভাগে এক হাজার শয্যা বিশিষ্ট সরকারি হাসপাতাল চালু করা; জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে মানসিক স্বাস্থ্যের উন্নয়নে প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা গ্রহণ; হাসপাতাল ও ক্লিনিকের চিকিৎসা, বর্জ্য ও পয়ঃবর্জ্যের বিজ্ঞানসম্মত পরিশোধনাগার নির্মাণ; ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্র এবং ১০ শয্যাবিশিষ্ট মা ও শিশু কল্যাণ কেন্দ্রসমূহে মিডওয়াইফারি, পদসৃজন ও পদায়নের প্রস্তাব এসেছে।
সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়গুলোতে সহকারী শিক্ষক (আইসিটি), সহকারী শিক্ষক (হিন্দু ধর্ম), সহকারী শিক্ষক (গ্রন্থাগার বিজ্ঞান/গ্রন্থাগারিক) পদে শিক্ষক নিয়োগ; বাংলাদেশের সব দরিদ্র প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীর শিক্ষাকে সম্পূর্ণ অবৈতনিক ঘোষণা করা; বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের জন্য সরকারি ডোমেইন ব্যবহার করে ওয়েবসাইট তৈরি।
কওমি মাদ্রাসা স্থাপনের নীতিমালা প্রণয়ন করে মাদ্রাসাসমূহকে নীতিমালার আওতাভুক্ত করার প্রস্তাব করেন ডিসিরা।
সিলেট বিভাগের সব চা-বাগানে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় স্থাপন ও বিদ্যমান নিবন্ধিত বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়সমূহ জাতীয়করণ; সব শিশুর শিখনের প্রতি লক্ষ্য রেখে একীভূত কারিকুলাম/শিক্ষাক্রম, সময়সূচি ও মূল্যায়ন পদ্ধতি প্রণয়ন; দেওয়ানি আদালত ও ল্যান্ড সার্ভে ট্রাইব্যুনালে আপিল মামলা দাখিলে তামাদি মওকুফকরণ; প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার মাধ্যমে জিপি, এডিশনাল, জিপি, এজিপি নিয়োগ; স্থানীয় কৃষ্টি ও সংস্কৃতি রক্ষায় প্রতিটি জেলার শিল্পকলা একাডেমিতে কালচারাল আর্কাইভ স্থাপন; পর্যটন শিল্পকে আরো আধুনিক ও যুগোপযোগী করার জন্য পর্যটন এলাকাগুলোতে সমন্বিত উন্নয়ন কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ; নোয়াখালী জেলায় আন্তর্জাতিক মানের বিমানবন্দর স্থাপন; সব ধরনের অর্থ ছাড় ১৫ এপ্রিলের মধ্যে সমাপ্তকরণ; রাজস্ব আদায় বৃদ্ধির লক্ষ্যে নগদ অর্থ লেনদেনকারী ব্যক্তি/প্রতিষ্ঠানকে (যেমন : চিকিৎসাসেবা প্রদানকারী ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান, আইনজীবী, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, বিআরটিএ অফিস, পাসপোর্ট অফিস, করপোরেট প্রতিষ্ঠান, ডায়াগনস্টিক সেন্টার, বাড়িভাড়া ইত্যাদি) ডিজিটাল লেনদেন (পজ মেশিন/ব্যাংকিং চ্যানেলে) এর আওতায় আনয়নে নির্দেশনা প্রদান/নীতিমালা প্রণয়ন; কৃষিপ্রধান জেলাসমূহে স্থানীয় উদ্যোক্তা/খামারিদের জন্য স্বল্প সুদে বৃহৎ আকারে ঋণ সুবিধা প্রদানের প্রস্তাব এসেছে।
মা ইলিশ রক্ষা অভিযানের সময় ভিজিএফ চাল প্রদানের পাশাপাশি জেলেদের জন্য বিকল্প কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা গ্রহণ; হাওর অঞ্চলে স্থায়ী মৎস্য অভয়াশ্রম স্থাপন; রপ্তানিযোগ্য পণ্যের (সবজি, আম, পান ইত্যাদি) গুণগত মান পরীক্ষা করার জন্য অ্যাক্রেডিটেশন ল্যাব স্থাপন; জেলা পর্যায়ে খাদ্যদ্রব্য পরীক্ষার জন্য সমন্বিত পরীক্ষাগার প্রতিষ্ঠা; দেশীয় বাইসাইকেল শিল্পের বিকাশে স্থানীয় শিল্পকে প্রণোদনা প্রদান; কক্সবাজার জেলায় লবণ প্রসেসিং প্ল্যান্ট স্থাপন; সিলেট-ওসমানী বিমানবন্দর সড়কের লাক্কাতুরা হতে বিমানবন্দর পর্যন্ত এক্সপ্রেসওয়ে নির্মাণ; ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়ক আট লেনে উন্নীতকরণ; টিআর ও কাবিখা কর্মসূচির আওতায় খাদ্য সহায়তার পরিবর্তে নগদ অর্থ বরাদ্দ প্রদান; মডেল মসজিদের ইমাম-মুয়াজ্জিনদের চাকুরি স্থায়ীকরণ ও বেতন-ভাতা বৃদ্ধির প্রস্তাব করা হয়েছে।
রিক্রুটিং এজেন্সিগুলোকে ঢাকা থেকে ডিসেন্ট্রালাইসড করে জেলাভিত্তিক নিযুক্ত করা; পর্যায়ক্রমে জেলা/উপজেলা পর্যায়ে প্রয়োজনীয় বিদেশি ভাষা শিক্ষাকেন্দ্র স্থাপন; বিভাগীয় পর্যায়ে একটি করে আধুনিক সমন্বিত বিজ্ঞান গবেষণাগার স্থাপন; জেলা পর্যায়ে গুজব ও ফ্যাক্ট চেকিং সেন্টার স্থাপন; পার্বত্য অঞ্চলে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ ও শতভাগ বিদ্যুতায়ন; জেলা পরিষদ ও পৌরসভার প্রকল্পের অনলাইন ডাটাবেজ তৈরিকরণ; পর্যায়ক্রমে দেশের প্রতিটি পৌরসভা ও ইউনিয়নে পরিকল্পিত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কেন্দ্র ও ওয়াটারপ্লান্ট নির্মাণ; পার্বত্য এলাকায় ইটভাটা বন্ধ করতে ইটের বিকল্প হিসাবে ব্লক ব্যবহারের জন্য প্রকল্প প্রাক্কলন পরিবর্তন করা; জেলাভিত্তিক সমবায় সমিতির ডেটাবেইস তৈরি; ভূমিসংক্রান্ত সব আইনকে একত্রিত করে একটি সংকলন প্রণয়নের প্রস্তাব এসেছে।
এছাড়াও, ভূমি অপরাধ প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইন, ২০২৩ এর সংশোধন; পর্যায়ক্রমে প্রতিটি উপজেলায় প্রতিবন্ধী সেবা ও সাহায্য কেন্দ্র স্থাপন; পর্যায়ক্রমে প্রতি জেলায় ইনডোর স্টেডিয়াম স্থাপন; জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে ক্লাইমেট রিসাইলেন্স ফান্ড ও ক্লাইমেট রিসাইলেন্স ক্রাইড ফান্ড গঠন; জেলা কারাগার হাসপাতালগুলোতে পর্যাপ্ত ডাক্তার ও জনবল নিয়োগ; দুর্গম এলাকার শিশুদের শিক্ষার অভিগম্যতা নিশ্চিতকরণের লক্ষ্যে বিদ্যালয়সমূহে হোস্টেল স্থাপন এবং হোস্টেলে খাদ্য সহায়তা কর্মসূচি চালু করা; পরিবেশবান্ধব হলো ব্রিকস তৈরিতে স্বল্প সুদে ঋণ প্রদান; সরকারি মাধ্যমে হজযাত্রীর সংখ্যা ২৫ শতাংশে উন্নীতকরণ; ভরাট হয়ে যাওয়া খাসপুকুর খনন, ক্ষতিকর ও অনুপযুক্ত ওয়েবসাইটসমূহ চিহ্নিত করে বন্ধের প্রস্তাব করা হয়েছে।
