এপ্রিল মাসে রেমিট্যান্স এল ৩৮১৪৯ কোটি টাকা

✍︎ নাগরিক প্রতিবেদন ✍︎

এপ্রিল মাসে প্রবাসীরা দেশে পাঠিয়েছেন প্রায় ৩.১৩ বিলিয়ন (৩১২ কোটি ৭০ লাখ) মার্কিন ডলারের প্রবাসী আয়। প্রতি ডলার ১২২ টাকা ধরে যার পরিমাণ ৩৮ হাজার ১৪৯ কোটি ৪০ লাখ টাকা।

রোববার (৩ মে) বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান এ তথ্য জানান।

বাংলাদেশ ব্যাংক জানিয়েছে, এর আগে দেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ প্রবাসী আয় এসেছিল চলতি বছরের মার্চে। ওই সময় প্রবাসীরা দেশে পাঠিয়েছিলেন ৩৭৫ কোটি ৫০ লাখ ডলার।

খাত সংশ্লিষ্টদের মতে, ঈদুল আজহাকে সামনে রেখে কোরবানির পশু কেনা এবং পরিবারের বাড়তি খরচ মেটাতে প্রবাসী বাংলাদেশিরা তুলনামূলক বেশি অর্থ দেশে পাঠাচ্ছেন। এর ফলে সাম্প্রতিক সময়ে রেমিট্যান্স প্রবাহে একটি চাঙাভাব লক্ষ্য করা যাচ্ছে। এই বাড়তি প্রবাহ দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে ইতিবাচক প্রভাব ফেলছে বলেও মনে করছেন তারা।

কেন্দ্রীয় ব্যাং‌কের সবশেষ তথ্য বলছে, গেল এপ্রিলে ৩১২ কো‌টি ৭০ লাখ মার্কিন ডলারের রেমিট্যান্স এসেছে। বাংলাদেশি মুদ্রায় বর্তমান বিনিময় হার হিসাবে (প্রতি ডলার ১২২ টাকা ৭০ পয়সা ধরে) এই অঙ্ক ৩৮ হাজার ৩৬৮ কোটি টাকার বে‌শি।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, গেল মার্চ মাসে প্রবাসীরা পাঠিয়েছিলেন ৩৭৫ কোটি ৫০ লাখ মার্কিন ডলার। এটিই দেশের ইতিহাসে একক মাসে সর্বোচ্চ রেমিট্যান্স। তার আগে ফেব্রুয়ারি মাসে প্রবাসী বাংলাদেশিরা পাঠিয়েছিলেন ৩০২ কোটি বা ৩ দশমিক ০২ বিলিয়ন ডলার।

চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জুলাই থেকে ৩০ এপ্রিল পর্যন্ত দেশে দুই হাজার ৯৩৩ কোটি মার্কিন ডলার রেমিট্যান্স এসেছে; যা আগের অর্থবছরের তুলনায় ১৯ দশমিক ৫ শতাংশ বেশি। আগের অর্থবছরের একই সময়ে রেমিট্যান্স এসেছিল দুই হাজার ৪৫৪ কোটি মার্কিন ডলার।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, দেশের ইতিহাসে একক কোনো মাসে সর্বোচ্চ রেমিট্যান্স এসেছিল গত বছরের (২০২৫ সালের) মার্চে। ওই মাসটিতে প্রবাসীরা দেশে পাঠিয়েছিলেন ৩২৯ কোটি ৫৬ লাখ ৩০ হাজার (৩.২৯ বিলিয়ন) মার্কিন ডলার। দ্বিতীয় সর্বোচ্চ রেমিট্যান্স এসেছিল গত বছরের শেষ মাস ডিসেম্বরে। ওই মাসে রেমিট্যান্স আসে ৩২২ কোটি ৬৬ লাখ ডলার (প্রায় ৩.২৩ বিলিয়ন)। আর তৃতীয় সর্বোচ্চ রেমিট্যান্স আসে গত জানুয়ারিতে, যার পরিমাণ ছিল ৩১৭ কোটি বা ৩.১৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলার।

২০২২ সালের পর থেকে ডলার সংকট, আমদানি ব্যয় ও অর্থনৈতিক চাপে রিজার্ভ ধারাবাহিকভাবে হ্রাস পেতে থাকে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, একটি দেশের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য ন্যূনতম তিন মাসের আমদানি ব্যয় সমপরিমাণ রিজার্ভ থাকা প্রয়োজন। বাংলাদেশ বর্তমানে সেই সীমার কাছাকাছি অবস্থানে রয়েছে, যা সামগ্রিকভাবে অর্থনীতির জন্য সতর্ক সংকেত হলেও সাম্প্রতিক উত্থান স্বস্তিদায়ক।

বৈশ্বিক মন্দা মোকাবিলার জন্য সহায়ক হিসেবে ২০২২ সালে আইএমএফের কাছে ঋণ সহায়তা চায় বাংলাদেশ। ২০২৩ সালের ৩১ জানুয়ারি আইএমএফ কঠিন শর্ত আরোপ করে ৪৭০ কোটি ডলারের ঋণ প্রস্তাব অনুমোদন করে। ওই বছরের ফেব্রুয়ারির প্রথম দিনেই ঋণের প্রথম কিস্তি ছাড় করে দাতা সংস্থা আইএমএফ।

বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময় ব্যবহারযোগ্য রিজার্ভ ১৪ বিলিয়নের ডলারের নিচে নামে। সে সময় বৈদেশিক ঋণ ও বিভিন্ন বাণিজ্যিক ব্যাংকের কাছ থেকে ডলার কেনার মাধ্যমে রিজার্ভ বাড়ানো হয়। আগস্টে অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর নতুন গভর্নর এসে বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ থেকে ডলার বিক্রি বন্ধ রেখেছে। আবার বিভিন্ন উৎস থেকে ডলার যোগানের চেষ্টা করছে। তবে আগের দায় পরিশোধ করতে গিয়ে রিজার্ভ ২০ বিলিয়ন ডলারে কাছে ওঠানামা করছে।

উল্লেখ্য, ১৯৮১-৮২ অর্থবছর থেকে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের রিজার্ভের পরিমাণ ছিল ১২ কোটি ১০ লাখ ডলার।

পাঁচ বছর পর ১৯৮৬-৮৭ অর্থবছর শেষে সেই রিজার্ভ বেড়ে হয় ৭১ কোটি ৫০ লাখ ডলার। ১৯৯১-৯২ অর্থবছর শেষে রিজার্ভ ১০০ কোটি (১ বিলিয়ন) ডলার অতিক্রম করে ১ দশমিক ৬০ বিলিয়ন ডলারে ওঠে। পরের ১৯৯২-৯৩ অর্থবছর শেষে রিজার্ভ ২ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে ২ দশমিক ২১ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়ায়।

৩ বিলিয়ন ডলার অতিক্রম করে ১৯৯৪-৯৫ অর্থবছর শেষে। ১৯৯৫-৯৬ অর্থবছর শেষে তা কমে ২ দশমিক শূন্য ৩ বিলিয়ন ডলারে নেমে আসে। ১৯৯৬-৯৭ অর্থবছরে তা আরও কমে ১ দশমিক ৭১ বিলিয়ন ডলারে নেমে আসে।

এরপর ১৯৯৭-৯৮ থেকে ১৯৯৯-২০০০ অর্থবছর পর্যন্ত রিজার্ভ দেড় থেকে দুই বিলিয়ন ডলারের মধ্যে ওঠানামা করে।

২০০০-০১ অর্থবছরে রিজার্ভ কমে ১ বিলিয়ন ডলারের কাছাকাছি নেমে আসে। ওই অর্থবছর শেষে রিজার্ভ ১ দশমিক ৩ বিলিয়ন ডলার থাকলেও অর্থবছরের মাঝামাঝি সময়ে তা ১ দশমিক ১ বিলিয়ন ডলারে নেমে গিয়েছিল। তখনই আকুর বিল পুরোটা পরিশোধ না করে অর্ধেক করা হয়েছিল।

২০০১-০২ অর্থবছর শেষে রিজার্ভ বেড়ে হয় ১ দশমিক ৫৮ বিলিয়ন ডলার।

২০০৫-০৬ অর্থবছর শেষে রিজার্ভ ৫ বিলিয়ন ডলার অতিক্রম করে। ২০০৯-১০ অর্থবছরে ১০ বিলিয়ন ডলার ছাড়ায়। ২০১২-১৩ অর্থবছরে তা ১৫ বিলিয়ন ডলার অতিক্রম করে।

২০১৪ সালের ১০ এপ্রিল রিজার্ভ ২০ বিলিয়ন ডলার অতিক্রম করে। পরের বছর ২০১৫ সালের ২৫ জানুয়ারি রিজার্ভ ২৫ বিলিয়ন ডলার ছাড়ায়। ২০১৬ সালের জুনে রিজার্ভ ৩০ বিলিয়ন ডলার অতিক্রম করে।

দেশে করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাব দেখা দেওয়ার পর ২০২০ সালের মার্চ শেষে রিজার্ভের পরিমাণ ছিল ৩২ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলার। মহামারির এই সময়েই রিজার্ভ বেড়েছে সাড়ে ১২ বিলিয়ন ডলার।

২০২০ সালের ৩ জুন বাংলাদেশের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো রিজার্ভ ৩৪ বিলিয়ন ডলার ছাড়ায়। তিন সপ্তাহের ব্যবধানে ২৪ জুন সেই রিজার্ভ আরও বেড়ে ৩৫ বিলিয়ন ডলার হয়।

২০২০ সালের ৩০ জুন রিজার্ভ ৩৬ বিলিয়ন ডলার ছাড়ায়। এক মাস পর ২৮ জুলাই রিজার্ভ ৩৭ বিলিয়ন ডলারের ঘরও অতিক্রম করে। তিন সপ্তাহ পর গত ১৭ আগস্ট রিজার্ভ ৩৮ বিলিয়ন ডলার ছাড়ায়।

২০২০ সালের মাত্র দেড় মাসে ৩৪ বিলিয়ন ডলার থেকে রিজার্ভ ৪ বিলিয়ন ডলার বেড়ে ৩৮ বিলিয়ন ডলারে ওঠে।

২০২০ সালের ১ সেপ্টেম্বর রিজার্ভ ছাড়ায় ৩৯ বিলিয়ন ডলার। ৮ অক্টোবর ছাড়ায় ৪০ বিলিয়ন ডলার। ২৯ অক্টোবর অতিক্রম করে ৪১ বিলিয়ন ডলার। ৪২ বিলিয়ন ডলার ছাড়ায় ১৫ ডিসেম্বর।

২০২০ সালের ৩০ ডিসেম্বর ৪৩ বিলিয়ন ডলারের মাইলফলক অতিক্রম করে রিজার্ভ।

২০২১ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশের বিদেশি মুদ্রার রিজার্ভ ৪৪ বিলিয়ন ডলার ছাড়ায়।

২০২১ সালের ২৮ এপ্রিল অতীতের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে রিজার্ভ ৪৫ বিলিয়ন ডলার অতিক্রম করে। একই বছরের ৪ মে আকুর ১ দশমিক ৭৪ বিলিয়ন ডলার আমদানি বিল পরিশোধের পর রিজার্ভ ৪৪ বিলিয়ন ডলারের নিচে নেমে আসে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংক মনে করছে, রপ্তানি আয় এবং রেমিট্যান্স প্রবাহ ইতিবাচক থাকায় রিজার্ভে স্থিতিশীলতা বজায় রাখা সম্ভব হয়েছে।

শেয়ার করতে

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *