✍︎ নাগরিক প্রতিবেদন ✍︎
সারা দেশে হামে শিশু মৃত্যুর দায়ে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস ও তার স্বাস্থ্য উপদেষ্টা নূরজাহান বেগমের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করে বিচারের দাবি জানিয়েছেন ভুক্তভোগী পরিবারের সদস্যরা।
‘হিউম্যানিটারিয়ান ইউনিটি উইথ মোরালিটি’ (এইচইউএম)-এর ব্যানারে আয়োজিত এক মানববন্ধন থেকে এ দাবি জানানো হয়।
রোববার (৩ মে) বিকেলে রাজধানীর মিরপুর-১০ নম্বরে গ্রামীণ ব্যাংকের সামনে এ মানববন্ধন অনুষ্ঠিত হয়। এতে সভাপতিত্ব করেন সংগঠনটির যুগ্ম আহ্বায়ক শাকিল আহমেদ।
মানববন্ধনে সংগঠনটির আহ্বায়ক হাসান আহমেদ বলেন, গত দুই মাস ধরে দেশে হামের প্রকোপ বেড়ে যাওয়ায় শিশু মৃত্যুর ঘটনা ঘটছে। একসময় দেশে প্রায় বিলুপ্তপ্রায় এই রোগ ইউনূসের শাসন আমলে অব্যবস্থাপনা ও টিকার অর্থ লুটপাটের কারণে আবারও ছড়িয়ে পড়েছে বলে তিনি দাবি করেন।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্যমতে, দেশে গত ২৪ ঘণ্টায় হাম ও হামের উপসর্গ নিয়ে আরও ১০ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। গত ১৫ মার্চ থেকে এখন পর্যন্ত হাম ও উপসর্গে শিশুমৃত্যুর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ২৯৪ জনে। এখন পর্যন্ত ৪০ হাজার ৪৯১ জনের হামের উপসর্গ শনাক্ত হয়েছে। যার ৮০ শতাংশই শিশু।
মানববন্ধনে হাসান আহমেদ বলেন, বাংলাদেশ দীর্ঘদিন উচ্চ টিকাদান হার নিয়ে গর্ব করত। কিন্তু ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর টিকা সংগ্রহ ব্যবস্থায় বিপর্যয় নেমে আসে। ফলে দেশজুড়ে টিকার সংকট তৈরি হয় এবং টিকাদানের হার দ্রুত কমে যায়। একই সঙ্গে শিশুর অপুষ্টি ও দুর্বল স্বাস্থ্যব্যবস্থা মৃত্যুর হার বাড়িয়ে দিয়েছে। দায়টা কার? অবশ্যই তৎকালীন প্রধান উপদেষ্টা ইউনূস ও তার স্বাস্থ্য উপদেষ্টার।
বাংলাদেশে সাধারণত শিশুদের ৯ ও ১৫ মাস বয়সে হাম-রুবেলা (এমআর) টিকার দুটি ডোজ দেওয়া হয়। এ ছাড়া প্রতি চার বছর অন্তর জাতীয় ক্যাম্পেইনের মাধ্যমে বাদ পড়া শিশুদের টিকা দেওয়া হয়, যাতে ৯৫ শতাংশ কভারেজ নিশ্চিত হয়, যা প্রাদুর্ভাব ঠেকাতে প্রয়োজনীয় বলে ধরা হয়। বছরের পর বছর ইউনিসেফ এই টিকা সরবরাহ করত এবং অধিকাংশ অর্থায়ন দিত গ্যাভি, দ্য ভ্যাকসিন অ্যালায়েন্স। বাংলাদেশ সরকারও এতে অর্থ দিত। কিন্তু ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর সেই ব্যবস্থায় ছেদ পড়ে। ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে ইউনূস সরকার ইউনিসেফের মাধ্যমে টিকা সংগ্রহ বন্ধ করে উন্মুক্ত দরপত্র পদ্ধতি চালু করে। এই ব্যবস্থায় সরকার বিভিন্ন সরবরাহকারীর কাছ থেকে প্রস্তাব নিয়ে যাচাই-বাছাই শেষে ক্রয়াদেশ দেয়।
এই প্রসঙ্গ টেনে এইচইউএমের আহ্বায়ক বলেন, ইউনিসেফ শুরু থেকেই এই সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করেছে। সংস্থাটির বাংলাদেশ প্রতিনিধি রানা ফ্লাওয়ার্স বলেছেন, তিনি ঈশ্বরের দোহাই দিয়ে বলেছিলেন এমনটি না করতে। এতে টিকাদান কর্মসূচি ব্যাহত হয়ে প্রাদুর্ভাব দেখা দিতে পারে। অন্তর্বর্তী সরকারের স্বাস্থ্য উপদেষ্টা নূরজাহান বেগমকে তিনি ব্যক্তিগতভাবে সিদ্ধান্তটি না নিতে অনুরোধ করেছিলেন। কিন্তু সে সময়ের উপদেষ্টা কথা শোনেননি। দরপত্রের প্রক্রিয়া আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় আটকে যায়। ফলে টিকা সরবরাহ বন্ধ হয়ে দেশজুড়ে মজুত ফুরিয়ে যায় এবং নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচি ব্যাহত হয়। ২০২৪ সালে হওয়ার কথা থাকলেও রাজনৈতিক অস্থিরতায় পিছিয়ে যাওয়া সম্পূরক এমআর টিকাদান অভিযান ২০২৫ সালে পুরোপুরি বাতিল করা হয়।
তিনি জানান, চলতি বছরের মার্চের শেষ দিকে পাওয়া সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে যোগ্য শিশুদের মাত্র ৫৯ শতাংশ হামের টিকা পেয়েছে। পরে এই তথ্য সরকারি ওয়েবসাইট থেকে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। এই সরকারকে ধন্যবাদ, তারা ড. ইউনূস নেতৃত্বাধীন উপদেষ্টা পরিষদের অথর্বতা ও অব্যবস্থাপনাকে সামাল দেওয়ার প্রাণপণ চেষ্টা করছে। ইউনিসেফের মাধ্যমে টিকা সংগ্রহ শুরু হয়েছে এবং ডব্লিউএইচও ও গ্যাভির সহায়তায় নতুন সরবরাহ নিশ্চিত করা হয়েছে।
গত ১২ এপ্রিল সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী বিপ্লব কুমার দাস অন্তর্বর্তী সরকারের বিরুদ্ধে দুর্নীতি ও টিকা সংগ্রহে ব্যর্থতার অভিযোগ এনে দুর্নীতি দমন কমিশনে অভিযোগ দায়ের করেছেন উল্লেখ করে হাসান আহমেদ বলেন, ইউনিসেফ প্রতিনিধি রানা ফ্লাওয়ার্স বলেছেন, এত বড় বিপর্যয়ের পর টিকা সংগ্রহ পদ্ধতি পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত তদন্ত হওয়া উচিত। আমরা তার সঙ্গে একমত জানিয়ে তিন দফা দাবি করছি।
মানববন্ধন থেকে ইউনূসের বিরুদ্ধে বিভিন্ন স্লোগান দিতে দেখা যায়, এর মধ্যে রয়েছে ‘হামে শিশু মরল কেন; ইউনূস তুই জবাব দে’, ‘হামের টিকা টাকা গেলে কই; ইউনূস তুই জবাব দেন’ ইত্যাদি।
মানববন্ধন চলাকালে এক পথচারী ব্যানারের সামনে এসে হামে শিশু মারা যাওয়ার জন্য ড. ইউনূসকে দায়ী করে ক্ষোভ প্রকাশ করেন। তাকে বলতে শোনা যায়, ‘এই যে এত শিশু মারা গেলে মায়ের কোল খালি হল এই জন্য ইউনূসের বিচার করতে হবে। এই যে ৩০-৪০ হাজার শিশু হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে তারা সুস্থ হলেও বিকলাঙ্গ হয়ে থাকবে, এই দায়ী ইউনূসকে নিতে হবে।’
মানববন্ধনে আরও বক্তব্য রাখেন নাট্যকর্মী এহসানুল আজিজ বাবু, এস এম কামরুজ্জামান সাগর, ব্যবসায়ী মেজবাহ আহমেদ প্রমুখ।
