✍︎ চট্টগ্রাম প্রতিনিধি ✍︎
চট্টগ্রামের আগ্রাবাদে একীভূত হওয়ার প্রক্রিয়ায় থাকা পাঁচটি ব্যাংকের শাখায় তালা ঝুলিয়ে বিক্ষোভ করেছেন ক্ষুব্ধ আমানতকারীরা। জমাকৃত অর্থ দ্রুত ফেরত, মুনাফা কর্তন বাতিল এবং স্বাভাবিক লেনদেন চালুর দাবিতে সোমবার সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত এ কর্মসূচি পালন করা হয়।
সকাল ১০টার দিকে আগ্রাবাদ অ্যাকসেস সড়কে জড়ো হয়ে কয়েকশ গ্রাহক বিক্ষোভ মিছিল বের করেন। পরে তাঁরা এক্সিম ব্যাংক, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক ও ইউনিয়ন ব্যাংকের বিভিন্ন শাখায় গিয়ে তালা ঝুলিয়ে দেন। এরপর ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারের সামনে অবস্থান ও মানববন্ধন কর্মসূচি পালন করেন তাঁরা। বিক্ষোভকারীরা ‘আমার টাকা ব্যাংকে, আমি কেন রাস্তায়’, ‘হেয়ার কাট মানি না’, ‘আমানত নিয়ে টালবাহানা চলবে না’—এমন নানা স্লোগান দেন।
ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংকে প্রায় ১ কোটি টাকা জমা আছে অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. জসিম উদ্দিনের। তিনি জানান, টাকা তুলতে না পেরে পরিবার ও ব্যবসা দুই দিকেই চরম সংকটে পড়েছেন।
গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংকের আমানতকারী নাফিছা আফরিন নমু বলেন, ‘হেয়ার কাট (মুনাফা কর্তন) কোনোভাবেই মেনে নেওয়া হবে না। আমাদের জমা টাকা পুরোপুরি ফেরত দিতে হবে।’
আন্দোলনকারীরা জানান, দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন দপ্তরে স্মারকলিপি দিয়েও কোনো কার্যকর সমাধান না পাওয়ায় তাঁরা বাধ্য হয়ে শাখায় তালা দেওয়ার মতো কর্মসূচি নিয়েছেন। তাঁদের দাবি, আমানতের পূর্ণ নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে, উত্তোলনে আরোপিত সীমাবদ্ধতা তুলে নিতে হবে এবং গ্রাহকদের আস্থা ফিরিয়ে আনতে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।
সংশ্লিষ্ট ব্যাংক কর্তৃপক্ষ বলছে, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্দেশনা অনুযায়ী সীমিত পরিসরে লেনদেন চলছে। এক্সিম ব্যাংক আগ্রাবাদ শাখার ব্যবস্থাপক এনায়েত করিম বলেন, ‘গ্রাহকেরা সর্বোচ্চ ২ লাখ টাকা পর্যন্ত তুলতে পারছেন। বড় অঙ্কের অর্থ পরিশোধের জন্য প্রধান কার্যালয়ের অনুমোদন প্রয়োজন। কেন্দ্রীয় নির্দেশনার বাইরে গিয়ে আমাদের কিছু করার সুযোগ নেই।’
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে ঘটনাস্থলে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। ডবলমুরিং থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা জামাল উদ্দিন খান বলেন, ‘ব্যাংকগুলোর সামনে পর্যাপ্ত পুলিশ রয়েছে। কোনো ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনা যাতে না ঘটে, সে জন্য আমরা সতর্ক অবস্থানে আছি।’
অনিয়ম ও অব্যবস্থাপনার শিকার এক্সিম, সোশ্যাল ইসলামী, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী, গ্লোবাল ইসলামী ও ইউনিয়ন ব্যাংকের তারল্যসংকটের কারণে এদেরকে একীভূত করে নতুন কাঠামোয় পরিচালনা করা হচ্ছে। এসব ব্যাংকে প্রায় ৭৫ লাখ আমানতকারীর ১ লাখ ৩১ হাজার কোটি টাকার আমানত রয়েছে। একীভূত প্রক্রিয়ার পরও অর্থ উত্তোলনে জটিলতা দূর না হওয়ায় গ্রাহকেরা ক্ষুব্ধ।
গত রোববার খাতুনগঞ্জ এলাকায় একই দাবিতে চারটি ব্যাংকের শাখায় তালা ঝুলিয়ে বিক্ষোভ করেন আমানতকারীরা।
সরেজমিন দেখা যায়, ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারের দ্বিতীয় তলায় সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংকের শাখার সামনে বিক্ষোভ করছেন আমানতকারীরা। একপর্যায়ে সেখানে তালা দেন তাঁরা। এ সময় কর্মকর্তাদের কেউ কেউ ভেতরে আটকা পড়েন। ব্যাংকের সামনে শতাধিক আমানতকারীকে ‘আমার টাকা ব্যাংকে, আমি কেন রাস্তায়’সহ নানা স্লোগান দিতে দেখা যায়।
সামিনা আক্তার নামের এক আমানতকারী বলেন, ‘ভবিষ্যতের কথা ভেবে ব্যাংকে জমা রেখেছিলাম। এখন প্রয়োজনের সময় সেই টাকা তুলতে পারছি না। সামনে কোরবানির ঈদ, কিন্তু টাকা না পেলে কোরবানি কীভাবে দেব? কোরবানি দিতে পারব না, এটা ভাবতেই কষ্ট লাগছে। আমরা গ্রাহক হিসেবে এত ভোগান্তিতে আছি, অথচ ব্যাংক কর্তৃপক্ষের কোনো দায়বদ্ধতাই যেন নেই।’
ব্যাংকের ফটকে তালা লাগিয়ে দেওয়া হয়েছে। আজ দুপুরেছবি: সৌরভ দাশ
ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী মোহাম্মদ কাশেম বলেন, ‘আমরা কষ্টার্জিত টাকা ব্যাংকে রাখি বিশ্বাস করে। কিন্তু এখন সেই বিশ্বাস ভেঙে গেছে। কর্মকর্তারা এসির নিচে বসে বেতন নেয়, কিন্তু গ্রাহককে সম্মান দিতে পারে না। আমাদের সঙ্গে যে আচরণ করা হচ্ছে, তা একেবারেই অগ্রহণযোগ্য। আমরা আমাদের নিজের টাকাই তুলতে পারছি না। এর চেয়ে বড় দুর্ভোগ আর কী হতে পারে!’
ব্যবসার মুনাফার টাকা ছেলেমেয়েদের জন্য ব্যাংকে রেখেছিলেন জসিম উদ্দিন। তিনি ক্ষোভ ঝেড়ে বলেন, ‘আমরা সাধারণ মানুষ ব্যাংকে টাকা রাখি নিরাপত্তার জন্য। কিন্তু এখন সেই ব্যাংকই আমাদের জন্য ঝুঁকির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ব্যবসায় মন্দা, এখন ছেলেমেয়েদের পড়ার খরচ চালাতে হিমশিম খাচ্ছি।’
এর আগে একীভূত হওয়ার প্রক্রিয়ায় থাকা পাঁচ ব্যাংকের আমানতকারীদের হেয়ার কাট বাতিল ও লেনদেন স্বাভাবিক করার দাবিতে গতকাল সকালেও খাতুনগঞ্জে ইউনিয়ন ব্যাংকের সামনে বিক্ষোভ করেন আমানতকারীরা। পরে ব্যাংকটিসহ আরও তিন ব্যাংকে তালা ঝুলিয়ে দেন তাঁরা।
ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারের সামনে কথা হয় সমগ্র বাংলাদেশ ভুক্তভোগী আমানতকারী অ্যাসোসিয়েশন চট্টগ্রামের সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ আজমের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘আমাদের টাকা আদৌ তারা দেবে কি না, সেই নিশ্চয়তা দিতে হবে। সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক নামে চেক হবে, নাকি নিজ নিজ ব্যাংকের নামে হবে, তার কোনো সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা নেই। আমাদের টাকার নিশ্চয়তা দিতে হবে।’
ব্যাংকে তালা দেওয়ার পর ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারের সামনে মানববন্ধন করেন আমানতকারীরা। সেখানে তাঁরা তাঁদের আমানতের পূর্ণ নিরাপত্তা ও দ্রুত ফেরতের নিশ্চয়তা দেওয়ার দাবি জানান। পাশাপাশি হেয়ার কাট বা মুনাফা কেটে রাখার সিদ্ধান্ত বাতিল, লেনদেন স্বাভাবিক করা এবং গ্রাহকদের হয়রানি বন্ধের আহ্বান জানান তাঁরা।
সংগঠনের সভাপতি আবুল কালাম আজাদ সাংবাদিকদের বলেন, ‘আমাদের জীবনের সঞ্চয় এই ব্যাংকে রেখেছি নিরাপত্তার জন্য। কিন্তু এখন সেই টাকা তুলতে রাস্তায় নামতে হচ্ছে। সামনে কোরবানি, পরিবার আছে, দায়িত্ব আছে। একীভূতকরণের নামে আমাদের টাকা আটকে রাখা হচ্ছে। দ্রুত আমাদের টাকা ফেরত দিতে হবে।’
ব্যাংকে তালা দেওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে ডবলমুরিং থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা জামাল উদ্দিন খান বলেন, ‘ব্যাংকগুলোর সামনে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। কোনো ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনা যাতে না ঘটে, সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।’
প্রসঙ্গত, গত ১৪ জানুয়ারি কেন্দ্রীয় ব্যাংক একীভূত প্রক্রিয়ায় থাকা পাঁচ ব্যাংকের আমানতে ২০২৪ সালের শুরু থেকে ২০২৫ সালের শেষ পর্যন্ত কোনো মুনাফা না দেওয়ার সিদ্ধান্ত জানায়। এতে আমানতকারীদের মধ্যে উদ্বেগ ও সমালোচনা তৈরি হয়। পরে সেই অবস্থান থেকে সরে এসে নতুন সিদ্ধান্তে ২০২৪ ও ২০২৫ সালের জন্য ব্যক্তিগত ও মেয়াদি আমানতে ৪ শতাংশ মুনাফা নির্ধারণ করা হয়।
