যুদ্ধ বন্ধে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র সমঝোতার দ্বারপ্রান্তে 

✍︎ নাগরিক নিউজ ডেস্ক ✍︎

যুদ্ধ বন্ধে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র সমঝোতার দ্বারপ্রান্তে আছে বলে প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে একাধিক মার্কিন গণমাধ্যম। হোয়াইট হাউসের কর্মকর্তারাও সম্ভাব্য সমঝোতার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। এর মধ্যেই ইরানকে ঘিরে নতুন হুমকি দিয়েছেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।

বুধবার ট্রাম্পের এমন হুমকির কারণে মধ্যপ্রাচ্য সংকটে নাটকীয় পরিবর্তনের ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। নিজের সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে তিনি লিখেছেন, ‘ধরে নিচ্ছি ইতোমধ্যে সম্মত হওয়া শর্তগুলো ইরান মেনে নেবে। কিন্তু এটি পুরোটাই অনুমান। যদি তারা শর্ত মেনে নেয়, তাহলে এপিক ফিউরি অভিযানের ইতি ঘটবে।’

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ইরানে যে সামরিক অভিযান শুরু করে সেটির নাম ‘এপিক ফিউরি’। ট্রুথ সোশ্যালে ট্রাম্প লিখেছেন, ‘যদি তারা চুক্তিতে রাজি না হয়, তবে আবারও বোমা হামলা শুরু হবে। এবারের হামলার মাত্রা ও তীব্রতা আগের চেয়ে অনেক বেশি ভয়াবহ হবে।’

এর আগে মার্কিন গণমাধ্যম অ্যাক্সিওস তাদের এক প্রতিবেদনে জানায়, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান যুদ্ধ বন্ধে এক পৃষ্ঠার সমঝোতা স্মারকে স্বাক্ষরে দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে গেছে। এর কিছুক্ষণ পর নিউইয়র্ক পোস্টকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প বলেন, পাকিস্তানে ইরানের সঙ্গে সরাসরি আলোচনায় বসার কথা ভাবাটাও এখন ‘অনেক দূরের বিষয়’। 

যুদ্ধ শেষ করার বিষয়ে ট্রাম্পের প্রকৃত অবস্থান আসলে কী, তা বোঝা এখন কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে। ৭৯ বছর বয়সী এই রিপাবলিকান নেতা বারবার দাবি করেছেন, বড় ধরনের সংঘাত চালিয়ে যাওয়ার জন্য তাঁর কাছে পর্যাপ্ত সময় আছে। অথচ সম্প্রতি নিজেই কংগ্রেসকে জানিয়েছেন, যুদ্ধ ইতোমধ্যে শেষ হয়ে গেছে

সমঝোতার বিষয়টি সামনে আসার আগে মঙ্গলবার ট্রাম্প নিজেও হরমুজ প্রণালিতে ‘প্রজেক্ট ফ্রিডম’ নামে সামরিক অভিযান স্থগিতের ঘোষণা দেন। ট্রুথ সোশ্যালে লিখেন, মধ্যস্থতাকারী দেশ পাকিস্তান ও অন্যান্য রাষ্ট্রের অনুরোধে তিনি আপাতত এই অভিযান স্থগিত করছেন। একইসঙ্গে উল্লেখ করেন, তেহরানের সঙ্গে একটি একটি পূর্ণাঙ্গ ও চূড়ান্ত চুক্তির ব্যাপারে ‘ব্যাপক’ অগ্রগতি হয়েছে।

চুক্তির অগ্রগতির বিষয়ে এমন কথা বলার ২৪ ঘণ্টার মধ্যে বুধবার তিনি ইরানে বোমা হামলার হুমকি দিলেন।

ইরান কী বলছে
দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি বুধবার বেইজিংয়ে চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ই-র সঙ্গে বৈঠক করেছেন। যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর তেহরানের ঘনিষ্ঠ এই মিত্র দেশে আরাঘচির এটিই প্রথম সফর।

ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে প্রচারিত এক সাক্ষাৎকারে আরাঘচি জানান, তাঁরা দুই পক্ষ মিলে যুদ্ধ বন্ধের লক্ষ্যে বর্তমানে চলমান আলোচনাগুলো পর্যালোচনা করেছেন। পরে এক্সে দেওয়া পোস্টে আরাঘচি আরও জানান, ইরান আশা করে বেইজিং যুদ্ধ-পরবর্তী নতুন আঞ্চলিক কাঠামো তৈরিতে সমর্থন দেবে। এই কাঠামোর আওতায় উন্নয়ন ও নিরাপত্তার মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখা হবে।

আলোচনা শেষে চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানায়, ওয়াং ই অবিলম্বে শত্রুতা বন্ধের আহ্বান জানিয়েছেন। সেই সঙ্গে তিনি উভয়পক্ষকে যত দ্রুত সম্ভব হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়ার অনুরোধ করেন।

আরাঘচির এই সফরের আগে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও বেইজিংয়ের প্রতি আহ্বান জানিয়েছিলেন, তারা যেন হরমুজের অবরোধ তুলে নিতে তেহরানের ওপর চাপ দেয়।

ইরান পেতে পারে ২ হাজার কোটি ডলার

মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধ বন্ধের ইঙ্গিত মিলছে। এখন চূড়ান্ত সমঝোতার দর–কষাকষিতে রয়েছে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র। এই আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে ইরানের ইউরেনিয়াম। সমঝোতার অংশ হিসেবে ইরান তার সমৃদ্ধ করা ইউরেনিয়ামের মজুত ত্যাগ করবে। তার বিনিময়ে ইরানের জব্দ করা দুই হাজার কোটি ডলার ফেরত দেবে যুক্তরাষ্ট্র। এমন চুক্তিই হচ্ছে বলে দুই মার্কিন কর্মকর্তা ও আলোচনার বিষয়ে অবগত আরও দুটি সূত্র জানিয়েছে।

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি শুরু হওয়া এই যুদ্ধে বিরতি চলছে এপ্রিলের শুরু থেকে। তারপর নানা টানাপোড়েনের মধ্যে চলতি সপ্তাহে আলোচনায় বেশ অগ্রগতি হয়; যদিও কিছু বিষয়ে বড় ধরনের মতপার্থক্য এখনো রয়ে গেছে। এখন চুক্তি হলে যুদ্ধের অবসান ঘটবে।

প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প গত বৃহস্পতিবার বলেছিলেন, চূড়ান্ত আলোচনার জন্য চলতি সপ্তাহের শেষ দিকে মার্কিন ও ইরানি প্রতিনিধিরা দ্বিতীয় দফার বৈঠকে বসতে পারেন।

একটি সূত্র জানিয়েছে, আগামী রোববার পাকিস্তানের ইসলামাবাদে হতে পারে এই বৈঠক। মিসর ও তুরস্কের সমর্থনে পাকিস্তান এই আলোচনার মধ্যস্থতা করছে। গত ১১ এপ্রিল প্রথম দফার আলোচনাটি ইসলামাবাদেই হয়েছিল। এরপর পাকিস্তানের উদ্যোগ থাকলেও দ্বিতীয় দফা আলোচনা আর হয়নি।

ট্রাম্প প্রশাসনের প্রধান লক্ষ্য হলো ইরানের সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুত নিয়ন্ত্রণ করা। ওয়াশিংটন চায়, মাটির নিচে থাকা প্রায় দুই হাজার কেজি সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম ইরান যেন ব্যবহার করতে না পারে। বিশেষ করে ৬০ শতাংশ পর্যন্ত সমৃদ্ধ করা ৪৫০ কেজি ইউরেনিয়াম নিয়ে তাদের উদ্বেগ বেশি। অন্যদিকে ইরানের এখন অর্থের খুব প্রয়োজন।

ইউরেনিয়ামের মজুত এবং ইরানের জব্দ করা অর্থের পরিমাণ নিয়েই এখন দুই পক্ষের দর–কষাকষি চলছে। ইরান ওই অর্থ কোন কোন খাতে খরচ করতে পারবে, তা নিয়েও চলছে আলোচনা।

এক্সিওসে এই প্রতিবেদন প্রকাশের পর ট্রাম্প ‘ট্রুথ সোশ্যালে’ লিখেছেন, ‘কোনো অর্থ লেনদেন হবে না।’ অবশ্য তিনি সরাসরি ইরানের অর্থছাড়ের বিষয়টি উল্লেখ করেননি।

সূত্র জানায়, আলোচনার শুরুর দিকে খাদ্য ও ওষুধ কেনার জন্য ৬০০ কোটি ডলার ছাড় দিতে রাজি ছিল যুক্তরাষ্ট্র। তবে ইরান ২ হাজার ৭০০ কোটি ডলার দাবি করে। এখন দুই হাজার কোটি ডলার নিয়ে আলোচনা চলছে।

এক মার্কিন কর্মকর্তা বলেছেন, এটি যুক্তরাষ্ট্রের প্রস্তাব। তবে আরেক কর্মকর্তা বলেন, ইউরেনিয়ামের বদলে ডলার ফেরত দেওয়ার বিষয়টি ‘অনেকগুলো আলোচনার একটি’ মাত্র।

আরেকজন কর্মকর্তা বলেন, ‘ইরান দুই হাজার কোটি ডলারের বেশি অর্থ চায়। তারা নিষেধাজ্ঞা ছাড়াই মুক্তবাজারের দরে বাজারে তেল বিক্রি করতে চায়। তবে তারা একই সঙ্গে পারমাণবিক অস্ত্র কর্মসূচি এবং হামাসের মতো সন্ত্রাসীদের অর্থায়নও চালিয়ে যেতে চায়। আমরা যা কিছু দেওয়ার প্রস্তাব দিচ্ছি, সেগুলো পাওয়ার বিনিময়েও তারা এই কর্মকাণ্ড পুরোপুরি ছাড়তে রাজি নয়।’

ওয়াশিংটন চাইছিল, ইরান তাদের সব পারমাণবিক উপাদান যুক্তরাষ্ট্রে পাঠিয়ে দিক। তবে ইরান তাতে রাজি নয়। তারা শুধু নিজ দেশের ভেতরেই সেগুলোর মান কমিয়ে ফেলতে রাজি হয়েছে।

এখন একটি আপস-প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা চলছে। এর আওতায় উচ্চমাত্রার সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের কিছু অংশ তৃতীয় কোনো দেশে পাঠানো হতে পারে। আর বাকি অংশ আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের উপস্থিতিতে মান কমিয়ে ফেলা হবে ইরানে রেখেই।

খসড়া সমঝোতা স্মারকে (এমওইউ) তেহরানের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কর্মসূচি স্থগিত রাখার বিষয়টি রয়েছে। প্রথম দফা আলোচনায় ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি ২০ বছরের জন্য স্থগিত রাখার দাবি জানিয়েছিল যুক্তরাষ্ট্র। তখন ইরান পাঁচ বছরের প্রস্তাব দেয়। মধ্যস্থতাকারীরা এখন এই ব্যবধান কমানোর চেষ্টা করছেন।

এই সমঝোতায় চিকিৎসা সরঞ্জাম তৈরির জন্য ইরান পারমাণবিক গবেষণা চুল্লি ব্যবহারের সুযোগ পাবে। তবে তাদের সব পারমাণবিক স্থাপনা মাটির ওপরে থাকতে হবে। মাটির নিচে থাকা বর্তমান স্থাপনাগুলো অকেজো করে রাখা হবে।

আরেক মার্কিন কর্মকর্তা বলেন, ইরান নমনীয় হয়েছে, তবে তা যথেষ্ট নয়। তারা আর কতটুকু এগোয়, তা দেখার বিষয়।

হোয়াইট হাউসের মুখপাত্র আনা কেলি চলমান আলোচনাকে ‘ফলপ্রসূ’ বলছেন। তবে তিনি সংবাদমাধ্যমে বিস্তারিত জানাতে অস্বীকৃতি জানান। তিনি বলেন, অজ্ঞাতনামা সূত্রগুলো দাবি করছে তারা সংবেদনশীল কূটনৈতিক আলোচনার বিষয়ে জানে। অথচ তারা কী নিয়ে কথা বলছে, সেটি নিয়ে তাদের কোনো ধারণা নেই।

তবে রিপাবলিকান সিনেটর লিন্ডসে গ্রাহাম ফক্স নিউজকে বলেন, ট্রাম্প সরাসরি ইরানিদের সঙ্গে কথা বলেছেন। সম্প্রতি এক ফোনালাপে দুই পক্ষের মধ্যে বেশ দর–কষাকষিও হয়।

বৃহস্পতিবার ট্রাম্প সাংবাদিকদের বলেছিলেন, ইরান পারমাণবিক অস্ত্র না বানানোর প্রতিশ্রুতি দিতে রাজি হয়েছে। তারা জানিয়েছে, সব সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম বা ‘নিউক্লিয়ার ডাস্ট’ যুক্তরাষ্ট্রকে দিয়ে দেবে। তিনি আরও বলেছিলেন, ‘আমরা চুক্তির খুব কাছাকাছি আছি। চুক্তি না হলে আবার যুদ্ধ শুরু হবে।’

আগামী শুক্রবার তুরস্কে একটি কূটনৈতিক সম্মেলনের ফাঁকে পাকিস্তান, মিসর ও তুরস্কের মধ্যস্থতাকারীরা সৌদি কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠকে বসবেন। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে একটি চুক্তি স্বাক্ষরে মধ্যস্থতার কাজটি এগিয়ে নেওয়া হবে এ বৈঠকের প্রধান লক্ষ্য।

শেয়ার করতে

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *