সেবা প্রকাশনীর কার্যক্রম সাময়িক স্থগিত

✍︎ নাগরিক প্রতিবেদক ✍︎

সেবা প্রকাশনী তাদের সব ধরনের কার্যক্রম সাময়িকভাবে স্থগিত করেছে। অভ্যন্তরীণ অনিয়ম, কর্মচারীদের দুর্নীতির অভিযোগ ওঠার পর বুধবার এক বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানটি এ সিদ্ধান্তের কথা জানায়।

প্রকাশনীর অন্যতম অংশীদার কাজী শাহনূর হোসেন স্বাক্ষরিত ‘সাময়িক কার্যক্রম স্থগিতের’ নোটিশটি সেবার ফেসবুক পেজ ও গ্রুপে পোস্ট করা হয়। নোটিশটি পোস্ট করেন সেবা প্রকাশনীর উদ্যোক্তা প্রয়াত লেখক কাজী আনোয়ার হোসেনের ছোট ছেলে কাজী মায়মুর হোসেনের স্ত্রী ও প্রকাশনীর উপদেষ্টা মাসুমা মায়মুর।

সেখানে বলা হয়, ‘পাঠক, কর্মচারী ও সংশ্লিষ্ট সকলের অবগতির জন্য জানানো যাচ্ছে যে, সেবা প্রকাশনীতে অভ্যন্তরীণ বিভিন্ন অনিয়ম ও দুর্নীতির বিষয়টি সম্প্রতি আমাদের দৃষ্টিগোচর হয়েছে। এমতাবস্থায় অডিট কার্যক্রম নিরপেক্ষ ও সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করার স্বার্থে সেবা প্রকাশনীর সমস্ত কার্যক্রম সাময়িকভাবে স্থগিত করা হচ্ছে।’

কাজী আনোয়ার হোসেনের হাত ধরে ১৯৬৩ সালের মে মাসে যাত্রা শুরু হয়েছিল সেবা প্রকাশনীর। এরপরই দ্রুত তরুণ পাঠকের আগ্রহের কেন্দ্রে চলে আসে। কাজী আনোয়ার হোসেনের মৃত্যুর পর প্রকাশনীর হাল ধরেছিলেন তাঁর পরিবারের সদস্যরা। দুই ছেলে কাজী শাহনূর হোসেন ও কাজী মায়মুর হোসেন মূলত চালাচ্ছিলেন প্রকাশনী। কিন্তু ধীরে ধীরে সেবার সেই আগ্রহে পাঠকের ভাটা পড়তে শুরু করে।

২০২২ সালের ১৯ জানুয়ারি সেবা প্রকাশনীর প্রতিষ্ঠাতা কাজী আনোয়ার হোসেনের মৃত্যুর পর থেকেই তাঁর প্রতিষ্ঠিত দেশের অন্যতম পাঠকপ্রিয় প্রকাশনা সংস্থাটির কার্যক্রমে স্থবিরতা নেমে আসে।

সাময়িক কার্যক্রম স্থগিত ঘোষণা বিষয়ে মাসুমা মায়মুর ফেসবুকে একটি পোস্টও লেখেন। সেখানে তিনি লিখেছেন, ‘সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেবা প্রকাশনীর কিছু ভুল সিদ্ধান্ত, আর্থিক অবস্থা ও বিক্রির পরিমাণ নিয়ে আমার সন্দেহ তৈরি হয়। গত দুই মাস ধরে আমি ব্যক্তিগতভাবে বিষয়টি অনুসন্ধান করতে শুরু করি। তদন্তের একপর্যায়ে প্রাথমিকভাবে এমন কিছু তথ্য ও প্রমাণ আমার হাতে আসে, যা থেকে প্রতিষ্ঠানের আর্থিক অনিয়মের বিষয়ে গুরুতর সন্দেহের সৃষ্টি হয়েছে। বর্তমানে আমরা একটি স্বতন্ত্র অডিট ফার্মের মাধ্যমে পূর্ণাঙ্গ অডিট কার্যক্রম শুরু করার উদ্যোগ নিয়েছি। অডিট সম্পন্ন হলে প্রকৃত চিত্র স্পষ্টভাবে সামনে আসবে।’

মাসুমা লিখেছেন, ‘আমার কাছে চুরির তথ্য আছে এটা জানার পরে আমি ব্যক্তিগতভাবে নানা ধরনের চাপ ও জটিল পরিস্থিতির সম্মুখীন হই। একই সময়ে আমার স্বামী কাজী মায়মুর হোসেন গুরুতর অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হন। তাঁকে লাইফ সাপোর্টে দিতে হবে এমন সিদ্ধান্তও হাসপাতাল থেকে নেওয়া হয়ে যায়। আল্লাহর অশেষ রহমতে তিনি সেই অবস্থা থেকে ফিরে আসেন এবং দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসার প্রয়োজন আছে বলে জানিয়েছেন ডাক্তার। তিনি এখনো হাসপাতালে ভর্তি।’

‘অত্যন্ত কঠিন পরিস্থিতির মধ্যেও আমি তাঁর চিকিৎসার ব্যবস্থা করার পাশাপাশি সেবা প্রকাশনীর অনিয়মের বিষয়ে আইনগত পদক্ষেপ গ্রহণের সিদ্ধান্ত নিই। আইনগত পদক্ষেপের শুরুতেই আমি অনিয়মের বিষয়ে অডিট ফার্মের সাহায্য নেব বলে সিদ্ধান্ত নিয়েছি। সঠিক ও নিরপেক্ষ অডিট কার্যক্রম পরিচালনার স্বার্থে আমি, উপদেষ্টা মাসুমা মায়মুর, সেবা প্রকাশনীর যাবতীয় কার্যক্রম সাময়িকভাবে স্থগিত ঘোষণা করছি।’

তবে ঘোষণা ও পোস্ট ঘিরে ফেসবুকে মিশ্র প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়। অনেকেই ধারণা করেন যে দুই ভাইয়ের দ্বন্দ্বে হয়তো এই ঘোষণা।

মাসুমা মায়মুর আরেক পোস্টে লেখেন, ‘অনেকেই দেখতে পাচ্ছি আমার বক্তব্যের মূল অর্থ ধরতে ব্যর্থ হয়েছেন। হয়তো আমি বোঝাতেও পারিনি। ভাবছেন মনে হয় ভাইয়ে ভাইয়ে বিরোধ। আসলে তা না। সেবা প্রকাশনীতে দুর্নীতি করেছে কিছু অসাধু কর্মচারী। নিরপেক্ষ অডিটের স্বার্থে সেবা প্রকাশনীর কার্যক্রম সাময়িকভাবে স্থগিত করা হয়েছে মাত্র। দুই ভাইয়ের মাঝে কোনও প্রকার দ্বন্দ্ব নেই, ছিলও না।’

তিনি লিখেছেন, “আমি জানি, বিষয়টি নিয়ে হয়তো নানা ধরনের বিভ্রান্তিকর প্রচারণা ও গুজব ছড়ানোর চেষ্টা হতে পারে। সবাইকে অনুরোধ করব, যাচাই-বাছাই ছাড়া কোনো তথ্য বিশ্বাস না করার জন্য। আমরা আইনগত প্রক্রিয়ার মাধ্যমে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করব এবং সেবা প্রকাশনীর ব্যবস্থাপনাকে নতুনভাবে পুনর্গঠন করে দ্রুত পাঠকদের সামনে ফিরে আসব। ভবিষ্যতে সেবা প্রকাশনীকে ‘সেবা প্রকাশনী প্রাইভেট লিমিটেড’ হিসেবে আরও সুসংগঠিতভাবে পরিচালনার পরিকল্পনাও রয়েছে।”

সেবার লেখকদের উদ্দেশ্যে মাসুমা লিখেছেন, “যেহেতু ব্যবস্থাপনার দুর্বলতার কারণেই এই পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে, তাই এর দায় আমাদেরই। আপনাদের সকলের প্রাপ্য রয়্যালটি যথাযথভাবে পরিশোধ করা হবে।”

কিশোর ও তরুণ পাঠকদের কাছে তুমুল জনপ্রিয় এই প্রকাশনী আদৌ আবার ফিরতে পারবে কি না–তা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করে ঘোষণার পোস্টের নিচে মন্তব্য করেছেন অনেকে।

এ নিয়ে অনেক পাঠক হতাশাও ব্যক্ত করেছেন। অনেকে আবার সেবা প্রকাশনীর জন্য শুভ কামনা জানিয়েছেন।

তবে সেবাকে ‘হারিয়ে যেতে দেবেন না’ অঙ্গীকার করে পাঠকদের উদ্দেশ্যে মাসুমা লিখেছেন, “সেবার পাঠকদের হতাশ হওয়ার কোনো কারণ নেই। আমি বেঁচে থাকতে সেবা প্রকাশনী হারিয়ে যাবে না। আমি হয়তো উপদেষ্টা পদে আর থাকছি না… হতে পারে কোম্পানির এমডি পদটাই হবে আমার। কাজ করতে পারব পূর্ণ স্বাধীনতা নিয়ে।

“কোটি কোটি পাঠকের আবেগ আর কাজী আনোয়ার হোসেন সাহেবের লিগ্যাসি রক্ষায় আমার চেষ্টার বিন্দুমাত্র ঘাটতি থাকবে না বলে আমি আপনাদের প্রতিশ্রতি দিচ্ছি।”

সেবা প্রকাশনী ফের আসবে কি না তা নিয়ে ফেসবুকে সেবার বিশাল পাঠক সমাজের অনেকেই শঙ্কা প্রকাশ করেছেন। তবে মাসুমা দাবি করেছেন, অনিয়ম তদন্তে এই ঘোষণা। সবকিছু ঠিকঠাক হলে আবার পাঠকের কাছে ফিরে আসবে সেবা।

সম্পর্কিত লেখা:

শেয়ার করতে

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *