✍︎ ক্রীড়া প্রতিবেদক ✍︎
সিলেট টেস্টে পঞ্চম দিনে লাঞ্চের আগেই পাকিস্তানকে ৭৮ রানে হারিয়েছে বাংলাদেশ। এর ফলে, পাকিস্তানকে টানা চার টেস্টে হারালেন নাজমুল হোসেন শান্তরা। ঘরের মাঠে পাকিস্তানকে ‘বাংলাওয়াশ’ করে ভারতকে টপকে গেল তারা।
৪৩৭ রানের জবাবে ব্যাট করতে নেমে চতুর্থ দিন শেষে ৭ উইকেটে ৩১৬ রান করেছিল পাকিস্তান। শেষ দিনে জয়ের জন্য বাংলাদেশের দরকার ছিল মাত্র তিন উইকেট। অন্যদিকে জয়ের জন্য পাকিস্তানের প্রয়োজন ছিল ১২১ রান।
পঞ্চম দিনের শুরুতে ব্যাট করতে নামেন আগের দিনের দুই অপরাজিত ব্যাটার মোহাম্মিদ রিজওয়ান ও সাজিদ খান। দিনের শুরুতেই এই জুটি ভাঙার সুযোগ এসেছিল। নাহিদ রানার করা বলে স্লিপে ক্যাচও তুলে দিয়েছিলেন রিজওয়ান। কিন্তু হাতের ক্যাচ মিস করেন মেহেদী হাসান মিরাজ।
এই সুযোগ মিস করার পর বাংলাদেশিদের ভোগাতে থাকেন রিজওয়ান ও সাজিদ খান। এই দুই ব্যাটারের কল্যাণে জয়ের স্বপ্নও দেখতে থাকে পাকিস্তানিরা। কিন্তু সেই জুটি ভাঙেন তাইজুল ইসলাম। সাজিদ খানকে আউট করার মাধ্যমে নিজের ফাইফার পূর্ণ করেন এই বাঁহাতি স্পিনার। আউট হওয়ার আগে ৩৬ বলে ২৮ রান করেন সাজিদ।
এদিকে সেঞ্চুরির পথেই ছিলেন পাকিস্তানি উইকেটকিপার ব্যাটার রিজওয়ান। কিন্তু তাকে শতক পূর্ণ করতে দেননি শরিফুল ইসলাম। মিরাজের হাতে ক্যাচ তুলে দেওয়ার আগে ৯৪ রান করেন রিজওয়ান। ১৬৬ বলে খেলা তার এই ইনিংসটি ১০টি চারে সাজানো। অন্যদিকে রানের খাতা খোলার আগেই আউট হন খুররাম শেহজাদ। আর শূন্য রানে অপরাজিত থাকেন মোহাম্মদ আব্বাস।
বাংলাদেশের হয়ে সর্বোচ্চ ছয়টি নেন বাঁহাতি স্পিনার তাইজুল ইসলাম। ৩৪.২ ওভার বল করে ১২০ রানের খরচায় ছয়টি উইকেট পেয়েছেন তিনি। এছাড়া দুটি উইকেট নেন নাহিদ রানা। আর একটি করে উইকেটের দেখা পেয়েছেন শরিফুল ইসলাম ও মেহেদী হাসান মিরাজ।
সিলেট টেস্টের শুরুতে ব্যাট করতে নেমে লিটন দাসের সেঞ্চুরি নিজেদের প্রথম ইনিংসে ২৭৮ রান করেছিল বাংলাদেশ। জবাবে ২৩২ রানে থামে পাকিস্তান। ফলে ৪৬ রানে লিড পায় স্বাগতিকরা। দ্বিতীয় ইনিংসে বাংলাদেশ ৩৯০ রান করলে টার্গেট দাঁড়ায় ৪৩৭ রানে। কিন্তু পাকিস্তান অলআউট হয়েছে ৩৫৮ রানেই।
সিলেটে বাংলাদেশ-পাকিস্তান দ্বিতীয় টেস্ট শুরুর আগে ২০২৫-২৭ টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপ চক্রে ভারতের অবস্থান ছিল শ্রীলঙ্কা ও বাংলাদেশের মাঝে। শ্রীলঙ্কা চারে, ভারত পাঁচে ও বাংলাদেশ ছিল ছয় নম্বরে। আজ সিলেটে পাকিস্তানকে হোয়াইটওয়াশ করে ভারতকে ছাড়িয়ে গেল বাংলাদেশ। ৫৮.৩৩ শতাংশ সফলতার হার নিয়ে শান্তর দল এখন পাঁচ নম্বরে। ছয়ে থাকা ভারতের সফলতার হার ৪৮.১৫ শতাংশ। শ্রীলঙ্কা ৬৬.৬৭ শতাংশ সফলতার হার নিয়ে চার নম্বর স্থান ধরে রেখেছে।
বর্তমান টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপ চক্রে বাংলাদেশ চার টেস্ট খেলে জিতেছে দুই ম্যাচ। একটি করে ম্যাচ হেরেছে ও ড্র করেছে। শ্রীলঙ্কার বিপক্ষেই এটা হয়েছিল গত বছর। সেবার লঙ্কানরা ছিল স্বাগতিক। পাকিস্তান এখন পয়েন্ট টেবিলের ৮ নম্বরে অবস্থান করছে। দলটির সফলতার ৮.৩৩ শতাংশ। বর্তমান টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপ চক্রে ৪ ম্যাচ খেলে জিতেছে এক ম্যাচ ও হেরেছে তিন ম্যাচ। গত বছরের অক্টোবরে পাকিস্তান নিজেদের মাঠে দক্ষিণ আফ্রিকার কাছে টেস্ট সিরিজ শেষ করেছিল ১-১ সমতায়। এবার বাংলাদেশে এসে হোয়াইটওয়াশ হয়ে অবস্থা বেগতিক হয়েছে পাকিস্তানের। মূলত মিরপুর টেস্টে স্লো ওভার রেটের কারণে ৮ পয়েন্ট কাটায় পাকিস্তান বেশি কোণঠাসা হয়ে পড়ে। বাংলাদেশের বিপক্ষে প্রথম টেস্টে নির্ধারিত সময়ের চেয়ে ৮ ওভার কম করেছিল পাকিস্তান।
২০২৩-২৫ চক্রের চ্যাম্পিয়ন দক্ষিণ আফ্রিকা ২০২৫-২৭ চক্রে অবস্থান করছে তিন নম্বরে। প্রোটিয়াদের সফলতার হার ৭৫ শতাংশ। পয়েন্ট টেবিলের প্রথম দুইয়ে থাকা অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ডের সফলতার হার ৮৭.৫০ ও ৭৭.৭৮ শতাংশ। যারা শীর্ষ দুইয়ে থাকবে, তারাই খেলবে ফাইনাল। বর্তমান চক্রে অবশ্য সর্বোচ্চ ১০ ম্যাচ খেলেছে ইংল্যান্ড। তবে তাদের অবস্থান ৭ নম্বরে। দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ৯ ম্যাচ খেলা ভারতের অবস্থান ৬ নম্বরে।
বাংলাদেশের উল্টো অবস্থা হয়েছে পাকিস্তানের। দুই ধাপ পিছিয়ে সাত নম্বরে নেমে গেছে পাকিস্তান। তাদের সফলতার হার ৩৩.৩৩ শতাংশ। বাংলাদেশ মূলত অবস্থান করছে ভারত ও পাকিস্তানের মাঝে। পাঁচে থাকা ভারতের সফলতার হার ৪৮.১৫ শতাংশ। ২০২৫-২৭ টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপ চক্রে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ৯ টেস্ট খেলেছে এশিয়ার এই দল।
সবশেষ চক্রে (২০২৩-২৫) ৯ দলের মধ্যে ৯ নম্বরে থেকে শেষ করেছিল পাকিস্তান। বাংলাদেশের অবস্থান ছিল সাত নম্বরে। যেখানে ২০২৪ সালে পাকিস্তানকে তাদের মাঠে টেস্ট সিরিজে ২-০ ব্যবধানে ধবলধোলাই করেছিল বাংলাদেশ। সেবারও অধিনায়ক ছিলেন শান্ত। তাঁর নেতৃত্বে এবার ঘরের মাঠে পাকিস্তানকে বাংলাওয়াশ করল বাংলাদেশ। ২৮ মে ঈদুল আজহার আগেই দেশবাসীকে আজ সিলেট টেস্ট জিতে অগ্রিম ঈদের উপহার দিলেন শান্ত-মুশফিকরা।
টেস্ট ইতিহাসের সেরা র্যাঙ্কিংয়ে বাংলাদেশ
টেস্ট ইতিহাসের সেরা র্যাঙ্কিংয়ে অবস্থান করছে বাংলাদেশ। পাকিস্তানকে হোয়াইটওয়াশের পর টেস্ট র্যাঙ্কিংয়ে দুই ধাপ এগিয়ে বাংলাদেশ এখন অবস্থান করছে সাত নম্বরে। বর্তমানে দলটির রেটিং পয়েন্ট ৭৮। সচরাচর ৯-১০ নম্বরে অবস্থান করা বাংলাদেশ এবার নিজেদের টেস্ট ইতিহাসে সেরা সাত নম্বর র্যাঙ্কিংয়ে পৌঁছেছে। বিপরীতে দুঃসংবাদ পেল পাকিস্তান। দুই ধাপ পিছিয়ে এখন তাদের অবস্থান আট নম্বরে। শান মাসুদ-মোহাম্মদ রিজওয়ানদের দলের রেটিং পয়েন্ট ৭৫।
পাকিস্তানের অবনতিতে সুখবর পেল শ্রীলঙ্কাও। এক ধাপ এগিয়ে ছয় নম্বরে অবস্থান করা লঙ্কানদের রেটিং পয়েন্ট ৮৬। পাকিস্তানের মতো অবনতি হয়েছে ওয়েস্ট ইন্ডিজেরও। এক ধাপ পিছিয়ে ৯ নম্বরে অবস্থান করা ক্যারিবীয়দের রেটিং পয়েন্ট ৬৮। সেরা দশের অপর ছয় দলের অবস্থানের কোনো পরিবর্তন হয়নি। ১৩১ রেটিং পয়েন্ট নিয়ে সবার ওপরে অস্ট্রেলিয়া। দুই, তিন, চার ও পাঁচ নম্বরে থাকা দক্ষিণ আফ্রিকা, ভারত, ইংল্যান্ড ও নিউজিল্যান্ডের রেটিং পয়েন্ট ১১৯, ১০৪, ১০২ ও ১০১। দশ নম্বরে থাকা জিম্বাবুয়ের রেটিং পয়েন্ট ১০।
২০২৫ সালের অক্টোবর থেকেই সুসময় পার করছে বাংলাদেশ। গত সাত মাসে ওয়েস্ট ইন্ডিজ, পাকিস্তান ও নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে হ্যাটট্রিক ওয়ানডে সিরিজ জিতেছে বাংলাদেশ। যদিও ওয়ানডে র্যাঙ্কিংয়ে শান্ত-মেহেদী হাসান মিরাজদের অবস্থানের কোনো পরিবর্তন হয়নি। ৮৪ রেটিং পয়েন্ট নিয়ে ৯ নম্বরেই বাংলাদেশ। ১১৮ রেটিং পয়েন্ট নিয়ে ওয়ানডেতে শীর্ষস্থান ধরে রেখেছে ভারত। দুই ও তিনে থাকা নিউজিল্যান্ড ও অস্ট্রেলিয়ার রেটিং পয়েন্ট ১১৩ ও ১০৯।
৯ নম্বরে থাকায় ২০২৭ ওয়ানডে বিশ্বকাপে বাংলাদেশের সরাসরি খেলার সম্ভাবনা জোরালো হয়েছে। আগামী বছরের ৩১ মার্চ পর্যন্ত র্যাঙ্কিংয়ের সেরা ৯ নম্বরে থাকা দলগুলো সরাসরি খেলবে বিশ্বকাপে। ২০২৭ সালের অক্টোবর-নভেম্বরে দক্ষিণ আফ্রিকা, জিম্বাবুয়ে ও নামিবিয়ায় হবে ওয়ানডে বিশ্বকাপ।
