✍︎ ক্রীড়া প্রতিবেদক ✍︎
গায়ানা জাতীয় দলের প্রধান কোচের পদ ছেড়ে বাংলাদেশ ফুটবল দলের দায়িত্ব নিয়েছেন ডুলি। শুক্রবার (২২ মে) বাংলাদেশের নতুন কোচ হিসেবে তার নাম ঘোষণা করেছে বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশন (বাফুফে)।
জন্ম ওয়েস্ট জার্মানির বেকহোফেনে, ১২ মে, ১৯৬১ সালে। মা ছিলেন জার্মান এবং বাবা মার্কিন সেনা। তাদের ঘরে বেড়ে উঠা থমাস ডুলি ফুটবল ক্যারিয়ারের সমাপ্তি ঘটিয়ে হন কোচ। সাবেক ডিফেন্ডার এবং রক্ষণাত্মক এই মিডফিল্ডার যুক্তরাষ্ট্র জাতীয় দলের দীর্ঘদিনের সদস্য ও অধিনায়ক ছিলেন।
ক্লাব ক্যারিয়ার
ডুলি অপেশাদার দল এফকে পিরমাসেন্সের হয়ে ফরোয়ার্ড হিসেবে খেলতেন। ১৯৮৪ সালে তৃতীয় বিভাগের ক্লাব এফসি হোমবুর্গের হয়ে পেশাদার ক্যারিয়ার শুরু করেন। তিনি হোমবুর্গে মিডফিল্ডে চলে যান এবং দলটিকে জার্মান লিগগুলোতে ধীরে ধীরে উপরের দিকে উঠতে সাহায্য করেন। অবশেষে তারা বুন্দেসলিগায় পৌঁছায়।
ডুলি ১৯৮৮ সালে এফসি কাইজারস্লাউটার্নে যোগ দেন। ক্লাবটির হয়ে ১৯৯০ সালে জার্মান কাপ এবং ১৯৯১ সালে বুন্দেসলিগা শিরোপা জিতেন। ১৯৯১ সালের জার্মান কাপ শিরোপাও জয় করেন। ১৯৯৪ তিনি বায়ার লেভারকুসেনে যোগ দেন। এর এক বছর পর শালকে ০৪-এ যোগ দেন, যেখানে জিতেন ১৯৯৭ উয়েফা কাপ।
১৯৯৭ মৌসুম শেষে ডুলি মেজর লিগ সকারে (এমএলএস) যোগ দেন কলম্বাস ক্রুয়ের জার্সিতে। তিনি কলম্বাসে তিন মৌসুম কাটান এবং ১৯৯৭ ও ১৯৯৮ উভয় সালেই এমএলএস বেস্ট ইলেভেনে নির্বাচিত হন। ২০০১ সালে ফুটবল থেকে অবসর নেওয়ার আগে ডুলি মেট্রোস্টার্সের হয়ে এক বছর খেলেন। ৪৩৩ ম্যাচে তার গোল ৬৪টি।
আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ার
১৯৯৪ ফিফা বিশ্বকাপ আয়োজনের আগে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তাদের দল গঠনে বিশেষ নজর দেয়। গুরুত্ব দিচ্ছিল মার্কিন বংশোদ্ভুত বিদেশি খেলোয়াড়দের। তখনই ডুলিকে খুঁজে পায় তারা। তিনি ১৯৯২ সালের ৩০ মে আয়ারল্যান্ডের বিপক্ষে তার প্রথম আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলেন।
তখন থেকেই যুক্তরাষ্ট্রের নিয়মিত খেলোয়াড় হয়ে ওঠেন। ১৯৯৩ সালে মার্কিন সকার বর্ষসেরা ক্রীড়াবিদ নির্বাচিত হন এবং ১৯৯৪ বিশ্বকাপের প্রতিটি মিনিট খেলেন, যার মধ্যে কলম্বিয়ার বিপক্ষে ২-১ ব্যবধানে জয়ের ম্যাচও ছিল। ডুলিকে ১৯৯৮ বিশ্বকাপের জন্য অধিনায়ক করা হয় এবং তিনি দলের হয়ে প্রতিটি ম্যাচে প্রথম একাদশে ছিলেন।
১৯৯৯ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি, চিলির বিপক্ষে একটি প্রীতি ম্যাচে যুক্তরাষ্ট্র ডুলিকে বিদায় জানায়। তিনি ৮১টি ম্যাচ খেলে এবং ৭টি গোল করে তার আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ার শেষ করেন।
কোচিং ক্যারিয়ার
ইউরোপ থেকে এশিয়া, জাতীয় দল থেকে ক্লাব ফুটবল- বিভিন্ন দেশ ও সংস্কৃতির ফুটবলে কাজ করার অভিজ্ঞতা রয়েছে ডুলির। খেলোয়াড়ি জীবন শেষ করার পর ২০০২ সালে জার্মান ক্লাব সারব্রুকেনের দায়িত্ব নিয়ে কোচিং শুরু করেন। সেই সময় ইউরোপের কোনো ক্লাবের প্রধান কোচ হওয়া প্রথম আমেরিকান ছিলেন তিনি।
২০১১ সালে যুক্ত হন যুক্তরাষ্ট্রের কোচিং স্টাফে, ইয়ুর্গেন ক্লিন্সম্যানের সহকারী হিসেবে। আন্তর্জাতিক ফুটবলে ডুলির সবচেয়ে আলোচিত অধ্যায় শুরু হয় ফিলিপাইনে। ২০১৪ সালে দায়িত্ব নেওয়ার পর দ্রুতই দলটিকে আরও সংগঠিত ও প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ করে তোলেন তিনি। মালয়েশিয়ার বিপক্ষে ড্র দিয়ে শুরু হলেও পরে নেপালকে হারিয়ে আসে প্রথম জয়।
ফিলিপাইনের ফুটবলে ডুলির সবচেয়ে বড় অবদান ছিল খেলোয়াড়দের মধ্যে কৌশলগত বোঝাপড়া তৈরি করা। সাবেক টিম ম্যানেজার ড্যান পালামিও তার প্রশংসা করেছিলেন এই বলে যে, ডুলির অধীনে প্রতিটি খেলোয়াড় নিজেদের ভূমিকা ভালোভাবে বুঝতে শুরু করে।
যদিও সব সময় পথ মসৃণ ছিল না। ২০১৪ এএফসি চ্যালেঞ্জ কাপের ফাইনালে ফিলিস্তিনের কাছে হেরে এশিয়ান কাপে ওঠা হয়নি তাদের। পরে কিছু সিনিয়র খেলোয়াড়ের সঙ্গে মতবিরোধও তৈরি হয়। তবু ডুলির অধীনে দলটি এগিয়ে যেতে থাকে।
বিশ্বকাপ বাছাইয়ে বাহরাইনকে হারানো এবং উত্তর কোরিয়ার বিপক্ষে চমকপ্রদ জয় তার কোচিং দক্ষতার বড় উদাহরণ হয়ে আছে। সবচেয়ে বড় সাফল্য আসে ২০১৮ সালে, যখন তাজিকিস্তানকে হারিয়ে ফিলিপাইনকে ইতিহাসে প্রথমবারের মতো এএফসি এশিয়ান কাপে তোলেন তিনি।
ফিলিপাইনের পর ডুলি কাজ করেছেন ভিয়েতনামের ক্লাব ভিয়েটেলে স্পোর্টিং ডিরেক্টর হিসেবে। তার সময়েই ক্লাবটি ২০২০ সালের ভি. লিগ ওয়ান শিরোপা জেতে। ২০২১ জানুয়ারিতে মালয়েশিয়ার শ্রী পাহাংয়ের কোচ হন, যদিও সেখানে সময়টা খুব দীর্ঘ হয়নি তার।
২০২২ সালে আবারও ফিলিপাইনের দায়িত্বে ফিরে আসেন ডুলি। এরপর ২০২৫ সালে দায়িত্ব নেন গায়ানা ফুটবল দলের। বিদেশভিত্তিক খেলোয়াড়দের অন্তর্ভুক্তির পরিকল্পনা ও স্থানীয় লিগ নিয়ে মন্তব্যের কারণে কিছু বিতর্ক তৈরি হলেও দলটি তার অধীনে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ জয় পায়।
অবশেষে ২০২৬ সালে ডুলির নতুন ঠিকানা বাংলাদেশ। দক্ষিণ এশিয়ার ফুটবলে নতুন চ্যালেঞ্জ নিতে এসেছেন অভিজ্ঞ এই কোচ। এখন দেখার বিষয়, নানা দেশে কাজ করার অভিজ্ঞতা দিয়ে তিনি কতটা বদলে দিতে পারেন বাংলাদেশের ফুটবলের চিত্র।
কোচ হিসেবে ডুলির ক্যারিয়ার
| দল | দেশ | শুরু | শেষ | ম্যাচ | জয়/ড্র/হার | জয় (%) |
| সারব্রুকেন | জার্মানি | ১৮ জানুয়ারি, ২০২০ | ৩০ জুন, ২০২২ | ১৫ | ৪/২/৯ | ২৬.৬৭ |
| ফিলিপাইন | ফিলিপাইন | ৩ ফেব্রুয়ারি, ২০১৪ | ৩১ মার্চ, ২০১৮ | ৪২ | ১৮/১১/১৩ | ৪২.৮৬ |
| শ্রী পাহাং | মালয়েশিয়া | ৩ জানুয়ারি, ২০২১ | ১৪ মার্চ, ২০২১ | ৩ | ০/১/২ | ০.০০ |
| ফিলিপাইন | ফিলিপাইন | ২৫ মে, ২০২২ | ১৫ জুন, ২০২২ | ৩ | ১/১/১ | ৩৩.৩৩ |
| ভিয়েটেল | ভিয়েতনাম | ১৮ ডিসেম্বর, ২০২৩ | ৭ জানুয়ারি, ২০২৪ | ২ | ০/০/২ | ০.০০ |
| গায়ানা | গায়ানা | ৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৫ | ১২ মে, ২০২৬ | ৪ | ৪/০/০ | ১০০.০০ |
| বাংলাদেশ | বাংলাদেশ | ২২ মে, ২০২৬ |
