জঙ্গল সলিমপুরে যৌথবাহিনীর সাঁড়াশি অভিযান, আটক ১৫

✍︎ চট্টগ্রাম প্রতিনিধি ✍︎

চট্টগ্রামের জঙ্গল সলিমপুরের আলী নগরে যৌথ বাহিনীর ক্যাম্পে হামলাকারীদের ধরতে অভিযান শেষ হয়েছে। জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ১৫ জনকে আটক করা হয়েছে।

বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন চট্টগ্রাম পুলিশ সুপার মাসুদ আলম এই তথ্য নিশ্চিত করেছেন।

পুলিশ জানায়, রোববার রাত ১টার দিকে জঙ্গল সলিমপুরের আলী নগর যৌথ বাহিনীর ক্যাম্পে হামলা চালায় কয়েকশ সন্ত্রাসী। তারা নির্মানাধীন ক্যাম্প গুঁড়িয়ে দেয়। উপস্থিত লোকজনকে মারধর করে। হামলার নেতৃত্বে ছিল সন্ত্রাসী বাহিনী। আত্মরক্ষার্থে ১০৫ রাউন্ড গুলি ছোঁড়ে যৌথ বাহিনী। এ ঘটনায় কেউ হতাহত হয়নি। জিজ্ঞাসাবাদের জন্য বেশকয়েকজনকে আটক করা হয়েছে।

গেল ৯ মার্চ এলাকার সন্ত্রাসীদের ধরতে দিনভর অভিযান চালিয়ে পুরো এলাকা নিজেদের নিয়ন্ত্রনে নিয়েছিল দাবি করে যৌথ বাহিনী।

র‍্যাব-৭ চট্টগ্রামের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল হাফিজুর রহমান সংবাদমাধ্যমকে বলেন, সন্ত্রাসী ইয়াসিন গ্রুপ রাতের অন্ধকারে পুলিশ ও র‍্যাবের যৌথ ক্যাম্পে অতর্কিত হামলা চালায়। আত্মরক্ষার্থে এবং ক্যাম্পের সুরক্ষায় আমরা তাৎক্ষণিকভাবে প্রতিরোধ গড়ে তুলি। পরিস্থিতি মোকাবিলায় নন-লিথাল (অপ্রাণঘাতী) অস্ত্রের পাশাপাশি পাল্টা গুলি চালানো হয়।’

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কর্মকর্তাদের তথ্যমতে, ভোর ৪টা পর্যন্ত উভয় পক্ষের মধ্যে দফায় দফায় গুলিবিনিময় চলে। একপর্যায়ে প্রতিরোধের মুখে সন্ত্রাসীরা পিছু হটতে বাধ্য হয়।

হামলার খবর পেয়ে আজ ভোরেই ঘটনাস্থলে ছুটে যান পুলিশের ডিআইজি, র‍্যাব-৭ অধিনায়ক এবং জেলা পুলিশ সুপারসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা। অপ্রীতিকর পরিস্থিতি এড়াতে ওই এলাকায় বিপুল পরিমাণ অতিরিক্ত পুলিশ ও র‍্যাব সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে।

রাতে আলীনগরে নির্মাণাধীন র‍্যাবের একটি ক্যাম্প বুলডোজার দিয়ে গুঁড়িয়ে দিয়েছে সন্ত্রাসীরা। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা যাতে আলীনগরে প্রবেশ করতে না পারে সেজন্য সড়ক কেটে দেওয়া হয়।

চট্টগ্রামের পুলিশ সুপার মাসুদ আলম বলেন, সন্দেহভাজন বেশ কয়েকজনকে আটক করা হয়েছে। সবকিছু যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে। যারা হামলায় জড়িত কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না।

গতকাল রোববার দিবাগত রাত দুইটার দিকে এসব ঘটনা ঘটেছে চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের জঙ্গল সলিমপুরের আলীনগর এলাকায়। র‍্যাব জানিয়েছে, রাস্তা কেটে দেওয়াসহ নানা প্রতিবন্ধকতার মধ্যেও রাতে ঘটনাস্থলে পৌঁছে অভিযান চালান আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা। অভিযানে বেশ কয়েকজন সন্ত্রাসীকে আটক করা হয়েছে। র‍্যাবের দাবি, সন্ত্রাসী ইয়াসিন বাহিনীর সদস্যরা এ হামলার সঙ্গে জড়িত।

কামাল হোসেন নামে র‍্যাবের এক কর্মকর্তা নিজের ফেসবুক আইডিতে অভিযানের বেশ কয়েকটি ভিডিও আপলোড করেন। এর মধ্যে আজ সোমবার ভোরে আপলোড করা দুটি ভিডিওতে জঙ্গল সলিমপুরের রাস্তা কেটে দেওয়ার দৃশ্য দেখা যায়। ভিডিওতে র‍্যাব কর্মকর্তা কামাল হোসেনকে বলতে শোনা যায়, ‘আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী যাতে প্রবেশ করতে না পারে, সে জন্য এখানে সন্ত্রাসীরা বিভিন্ন স্থানে কালভার্ট এবং রাস্তা কেটে দিয়েছে। যাতে আমাদের গাড়িগুলো ভেতরে প্রবেশ করতে না পারে। ওরা মনে করেছে যে ওদের কৌশলের কাছে আমরা পরাজিত হয়ে যাব। কিন্তু আমরা যে ওদের থেকে আরও বেশি কৌশলী, সেটা ওরা বুঝতে পারেনি।’

র‍্যাব কর্মকর্তারা জানান, রাস্তা কেটে ফেলায় ঘটনাস্থলে পৌঁছাতে কিছুটা সময় লেগেছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের। যেখানে রাস্তা কেটে ফেলা হয়েছে, সেখানে গাড়ি রেখে ঘটনাস্থলে পৌঁছান তাঁরা।

চট্টগ্রাম নগরের বায়েজিদ-ফৌজদারহাট সংযোগ সড়ক ধরে এগোলে এশিয়ান ইউনিভার্সিটি ফর উইমেনের বিপরীত দিকে একটি সড়ক ঢুকে গেছে পাহাড়ের ভেতরে। সে পথেই শুরু জঙ্গল সলিমপুর। ছিন্নমূল ও আলীনগর-মূলত এ দুটি অংশে বিভক্ত এলাকাটি। জেলা প্রশাসনের তথ্যমতে, এখানে ৩ হাজার ১০০ একর খাসজমি রয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে এলাকাটি নিয়ন্ত্রণ করে আসছে বিভিন্ন ভূমিদস্যু ও সন্ত্রাসী গোষ্ঠী।

গত ৯ মার্চ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী জঙ্গল সলিমপুরের নিয়ন্ত্রণ নেয়। সেনাবাহিনী, র‌্যাব, পুলিশ ও বিজিবির প্রায় ৩ হাজার ২০০ সদস্যের যৌথ অভিযানে এলাকাটির নিয়ন্ত্রণ নেওয়া সম্ভব হয়। এর আগে বিভিন্ন সময় চেষ্টা করেও এলাকাটির নিয়ন্ত্রণ নিতে পারেনি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। বরং অভিযানে গিয়ে হামলার শিকার হয়েছেন পুলিশ ও প্রশাসনের কর্মকর্তারা।

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর যৌথ অভিযানের পর এলাকাটিতে পুলিশ ও র‍্যাবের জন্য দুটি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র স্থাপনের ঘোষণা দেয় সরকার। এরই অংশ হিসেবে র‍্যাব আলীনগরে একটি ক্যাম্প তৈরির কাজ শুরু করে। গতকাল রাতে সেই ক্যাম্পটি গুঁড়িয়ে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে।

গত ৯ মার্চ পরিচালিত যৌথ অভিযানে ২২ জনকে গ্রেফতার করা হলেও ইয়াসিন বাহিনীর প্রধান মো. ইয়াসিন, রোকন বাহিনীর প্রধান রোকন উদ্দিন; মশিউর রহমান, নুরুল হক ভান্ডারি, গাজী সাদেক, গোলাম গফুরসহ কয়েকজন সন্ত্রাসী এখনো পলাতক। এলাকাবাসী জানান, অভিযানের আগে জঙ্গল সলিমপুরের ছিন্নমূল এলাকা রোকনের দখলে আর আলীনগর এলাকা ইয়াসিনের দখলে ছিল।

শেয়ার করতে

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *