✍︎ নাগরিক প্রতিবেদক ✍︎
ঈদুল আজহাকে কেন্দ্র করে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্তে মানুষের ব্যাপক যাতায়াত ও ভ্রমণের কারণে ঈদের পর হামের সংক্রমণ তীব্র আকার নিতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা।
হাম ও হামের উপসর্গ নিয়ে দেশে আরও ১৭ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে ১৬ শিশুর মৃত্যু হয়েছে হামের উপসর্গ নিয়ে, আর একটি শিশুর মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করেছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হামের জীবাণু শরীরে প্রবেশের পর র্যাশ বা গুটি ওঠার অন্তত চার দিন আগ থেকেই আক্রান্ত ব্যক্তি অজান্তে রোগটি ছড়াতে শুরু করে। ফলে ঈদযাত্রার ভিড় ও গণপরিবহনে এই সংক্রমণ দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার উচ্চ ঝুঁকি রয়েছে। এ পরিস্থিতিতে শিশুদের নিয়ে অপ্রয়োজনীয় ভিড় এড়িয়ে চলা এবং মৃদু উপসর্গ দেখা দিলেও ভ্রমণ না করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. এম মুশতাক হোসেন বলেন, ঈদের সময় মানুষ শিশুদের নিয়ে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে যাবে। এতে সংক্রমণ বাড়ার ঝুঁকি রয়েছে। ঈদের পরের এক সপ্তাহে সংক্রমণ আরও বাড়তে পারে। আর আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা বাড়লে মৃত্যুও বাড়বে। বিশেষ করে অপুষ্ট শিশুরা বেশি বিপদে পড়বে। তিনি অভিভাবকদের সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়ে বলেন, যেসব শিশু অপুষ্টিতে ভুগছে বা কিছুটা অসুস্থ, তাদের নিয়ে এ ঈদে ভ্রমণ না করাই ভালো। এতে ওই শিশুর নিজের যেমন স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি হবে, তেমনি তার সংস্পর্শে আসা সুস্থ শিশুরাও ঝুঁকিতে পড়বে।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. এম এইচ চৌধুরী লেলিন বলেন, ঈদের সময় এক এলাকা থেকে অন্য এলাকায় মানুষের ব্যাপক চলাচল হয়। যাদের শরীরে হামের ভাইরাস রয়েছে, তারা অজান্তেই অন্যদের মধ্যে সংক্রমণ ছড়িয়ে দিতে পারে। কারণ হামের র্যাশ ওঠার চার দিন আগ থেকেই রোগটি সংক্রমণ ছড়াতে শুরু করে। তিনি বলেন, পরিবারের কারও জ্বর, সর্দি বা নাক দিয়ে পানি পড়ার মতো উপসর্গ থাকলে তাকে নিয়ে ভ্রমণ না করাই ভালো।
বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটের হাম ওয়ার্ড আইসিইউ ইউনিটের রেজিস্ট্রার ডা. মো. সাইফুল ইসলাম বলেন, অনেক ক্ষেত্রে শরীরে হামের জীবাণু প্রবেশের পর শুরুতে শুধু হালকা জ্বর দেখা দেয়, কিন্তু তখনো তীব্র উপসর্গ প্রকাশ পায় না। এই সময় থেকেই আক্রান্ত শিশু বা ব্যক্তি অন্যদের মধ্যে সংক্রমণ ছড়াতে পারে। ফলে ঈদযাত্রা ও বড় ধরনের জনসমাগমে এটি দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
চট্টগ্রামের শিশু বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. মো. মুসলিম উদ্দিন সবুজ বলেন, গ্রামে গিয়ে শিশুরা স্বাভাবিকভাবেই অন্য শিশুদের সঙ্গে মেলামেশা করবে। সেখানে কে আক্রান্ত আর কার শরীরে হামের উপসর্গ আছে, তা অনেক সময় বোঝা যায় না। এতে সুস্থ শিশুরা যেমন আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকিতে থাকবে, তেমনি হাম থেকে সদ্য সুস্থ হওয়া শিশুও আবার আক্রান্ত হতে পারে।
চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের শিশু ওয়ার্ডের বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক ডা. মোহাম্মদ মুসা বলেন, হাম অত্যন্ত সংক্রামক রোগ। আক্রান্ত ব্যক্তির হাঁচি-কাশির মাধ্যমে ভাইরাস বাতাসে ছড়িয়ে পড়ে এবং প্রায় দুই ঘণ্টা পর্যন্ত বাতাসে সক্রিয় থাকতে পারে। ওই বাতাসে শ্বাস নিলে কিংবা জীবাণুযুক্ত কোনো পৃষ্ঠ স্পর্শ করে চোখ-মুখে হাত দিলে সংক্রমণ হতে পারে। ঈদে পরিবারগুলো শিশুদের নিয়ে এক এলাকা থেকে অন্য এলাকায় যাচ্ছে। এতে আক্রান্ত বা উপসর্গ থাকা শিশুদের সংস্পর্শে এসে সুস্থ শিশুরাও সহজেই আক্রান্ত হতে পারে।
চট্টগ্রামের সিভিল সার্জন ডা. জাহাঙ্গীর আলম বলেন, হাম অত্যন্ত ছোঁয়াচে হওয়ায় জরুরি প্রয়োজন ছাড়া শিশুদের নিয়ে এক স্থান থেকে অন্য স্থানে না যাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। ঈদে বিভিন্ন এলাকার মানুষের একত্র হওয়ার কারণে সংক্রমণের ঝুঁকি আরও বাড়বে। তাই শিশুদের বিষয়ে মা-বাবাকে বাড়তি সতর্ক থাকতে হবে।
টিকা বিশেষজ্ঞ তাজুল ইসলাম এ বারীর মতে, টিকার কার্যকারিতা শিশুর বয়স, পুষ্টি ও মায়ের কাছ থেকে পাওয়া অ্যান্টিবডির ওপর নির্ভর করে। শিশুর বয়স যত কম, টিকার কার্যকারিতা তত কম। এবারের বিশেষ কর্মসূচিতে ছয় মাস বয়স থেকে টিকা দেওয়া হয়েছে। ছয় মাস বয়সে টিকা দিলে সর্বোচ্চ ৫০ শতাংশ কার্যকারিতা পাওয়া যায়। নয় মাস বয়সে দিলে তা প্রায় ৮৫ শতাংশ এবং ১৫ মাস বয়সে প্রায় ৯০ শতাংশ কার্যকর হয়।
তবে শুধু ঈদযাত্রাকেই সংক্রমণ বৃদ্ধির একমাত্র কারণ হিসেবে দেখছেন না জনস্বাস্থ্যবিদ অধ্যাপক ডা. বে-নজির আহমেদ। তিনি বলেন, হাম ছড়িয়ে পড়ার বড় কারণ হলো পর্যাপ্ত ‘হার্ড ইমিউনিটি’ না থাকা। দেশের সব এলাকায় এখনো ৯৫ শতাংশ টিকাদান নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি। ফলে যেসব এলাকায় টিকার হার কম, সেখানে সংক্রমণের ঝুঁকি অনেক বেশি। তিনি আরও বলেন, বর্তমানে প্রচণ্ড গরমে শিশুরা সহজেই দুর্বল হয়ে পড়ছে। এর মধ্যে হাম হলে পরিস্থিতি প্রাণঘাতী হতে পারে। তাই ছোট শিশুদের নিয়ে অপ্রয়োজনীয় ভ্রমণ এড়িয়ে চলাই এ মুহূর্তে সবচেয়ে নিরাপদ।
দেশে সোমবার সকাল আটটা পর্যন্ত আগের ২৪ ঘণ্টায় হাম ও হামের উপসর্গ নিয়ে দেশে আরও ১৭ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে ১৬ শিশুর মৃত্যু হয়েছে হামের উপসর্গ নিয়ে, আর একটি শিশুর মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করেছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। এ নিয়ে গত ৭১ দিনে দেশে হাম ও হামের উপসর্গে মৃতের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৫৪৫ জনে। এর মধ্যে হামের উপসর্গ নিয়ে ৪৫৮ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। আর হামে ৮৭ শিশুর মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত হওয়া গেছে।
সোমবার স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সর্বশেষ প্রতিবেদন থেকে এসব তথ্য জানা গেছে। এই হিসাব ২৪ মে সকাল ৮টা থেকে ২৫ মে সকাল ৮টা পর্যন্ত সময়ের। গত ২৪ ঘণ্টায় হাম ও হামের উপসর্গ নিয়ে মারা যাওয়া ১৭ শিশুর মধ্যে ৭ জনই ঢাকা বিভাগের। এ ছাড়া সিলেট বিভাগে ৩ জন, রাজশাহী, চট্টগ্রাম ও বরিশাল বিভাগে ২ জন করে এবং ময়মনসিংহ বিভাগে ১ শিশুর হামে মৃত্যু হয়েছে।
শেষ ২৪ ঘণ্টায় হাম রোগী শনাক্ত হয়েছে ১ হাজার ১২৭ জন। একই সময়ে হামের উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে ১ হাজার ২৭ শিশু। তাদের মধ্যে ৪২৭ শিশুই ঢাকা বিভাগের। এরপর রয়েছে চট্টগ্রাম (২০৮), বরিশাল (১২৮) ও খুলনা (৯৫) বিভাগ। গত ২৪ ঘণ্টায় ১ হাজার ৪০৫ জন হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র পেয়েছে। গত ১৫ মার্চ দেশে প্রথম হাম রোগী শনাক্ত হয়। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সর্বশেষ প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, গত ৭১ দিনে মোট হাম রোগীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৬৪ হাজার ৯৪০ জনে। হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে ৫১ হাজার ৫৮৫ জন। মোট নিশ্চিত হাম রোগী শনাক্ত হয়েছে ৮ হাজার ৭১৯ জন। এ ছাড়া ৭১ দিনে হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র পেয়েছে ৪৭ হাজার ৬১৯ জন।
ঢাকা শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটে বর্তমানে হাম ও এর উপসর্গ নিয়ে ৮১ শিশু চিকিৎসাধীন রয়েছে। এর মধ্যে গত ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে ভর্তি হয়েছে ১৮ জন এবং এই সময়ে একজনের মৃত্যু হয়েছে। চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে এখন পর্যন্ত এ হাসপাতালে মোট ৮৩২ জন শিশু ভর্তি হয়ে চিকিৎসা নিয়েছে এবং ৩৩ শিশুর মৃত্যু হয়েছে।
মহাখালী সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালে বর্তমানে ৭২ জন রোগী ভর্তি রয়েছে। গত ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে আটজন শিশু ভর্তি হয়েছে। একজন মারা গেছে এবং নয়জন ছাড়পত্র পেয়েছে। এখন পর্যন্ত হাসপাতালটিতে ৪৮ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে ৩৯ জন হাম সন্দেহে এবং নয়জন নিশ্চিতভাবে হামে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছে।
মহাখালীর ডিএনসিসি কোভিড হাসপাতালে বর্তমানে ৪৫৬ জন রোগী ভর্তি আছে। গত ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে ৯২ জন ভর্তি হয়েছে এবং ১২৪ জন ছাড়পত্র নিয়ে বাড়ি ফিরেছে। এই সময়ের মধ্যে একজন শিশুর মৃত্যু হয়েছে। গত ১৫ মার্চ থেকে এখন পর্যন্ত হাসপাতালটিতে হামে আক্রান্ত হয়ে ৬ হাজার ৪৫ জন ভর্তি হয়েছে, যার মধ্যে ৩৫টি শিশুর মৃত্যু হয়েছে।
