✍︎ নাগরিক প্রতিবেদক ✍︎
টাঙ্গাইলের কালীহাতীতে যমুনা সেতুর পূর্ব প্রান্তের সংযোগ সড়কে সোমবার ভোরে রডবাহী ট্রাক উল্টে নিহত ১৫ জনের পরিচয় পাওয়া গেছে। বিকেলে স্বজনদের কাছে মরদেহ হস্তান্তর করা হয়েছে।
যমুনা সেতু পূর্ব থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) খন্দকার ফুয়াদ রুহানী মরদেহ হস্তান্তরের বিষয়টি নিশ্চিত করে জানান, নিহতদের স্বজনদের আবেদনের প্রেক্ষিতে ময়নাতদন্ত না করে মরদেহ তাঁদেরকে দেওয়া হয়েছে।
নিহত ১৫ জনের মধ্যে ১০ জনই নওগাঁ জেলার। তাঁরা হচ্ছেন মান্দা উপজেলার রাজেন্দ্রবাটী গ্রামের ইয়াকুব (১৫), সাগর মিয়া (২০), রবিউল ইসলাম (২৫), বাদশা (২৮), তারেক (২০), আব্দুল বারিক (২০), একই উপজেলার পাকুরিয়া গ্রামের গিয়াসউদ্দিন (২২) ও মাইনুল (২৮), হোসেনপুর গ্রামের মঈনুল ইসলাম (৩৮), নিয়ামতপুর উপজেলার রামগা গ্রামের আলমগীর হোসেন (২৪), চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর উপজেলার সুন্দরপুর গ্রামের মামুন (৪০), শিবগঞ্জ উপজেলার চরপাকা গ্রামের নজরুল (৫৫), তানোর উপজেলার বাতাসপুর গ্রামের ইসমাইল হোসেন, নটোরের লারপুর উপজেলার নরেন্দ্রপুর গ্রামের আলম মোল্লা ও কুষ্টিয়ার দৌলতপুর উপজেলার বৈরাগীর চরের হাসান আলী (৩৯)।
এক গ্রামের ১০ যুবকের মৃত্যু
টাঙ্গাইলের কালিহাতীতে ট্রাক উল্টে নিহত ১৫ জনের মধ্যে ১৩ জনেরই বাড়ি নওগাঁ জেলার বিভিন্ন উপজেলায়। যার মধ্যে ১০ জনের পরিচয় নিশ্চিত করেছে প্রশাসন। তাদের অধিকাংশরই বাড়ি জেলার মান্দা উপজেলায়। এর মধ্যে রাজেন্দ্রবাটি গ্রামেরই নিহত হয়েছেন ৭ জন। পরিবারগুলোতে এখন চলছে শোকের মাতম।
রাজেন্দ্রবাটি গ্রামে ঢুকতেই কানে আসে শরিফা বিবির কান্নার শব্দ। চারপাশে কয়েকজন নারী তাকে থামানোর চেষ্টা করছেন। গতকাল রাতে মোবাইলে কথা হয়েছিল ছেলে সাগরের সঙ্গে। পরিবারের খোঁজখবর নেওয়ার পাশাপাশি ছেলে জানতে চেয়েছিল কী আনবে ঈদে। মা শরিফা বলেছিলেন, মিষ্টি আর কমদামি শাড়ি আনতে। তা হয়তো কিনেও নিয়েছিলেন। কিন্তু তা আর আনা হলো না। ছেলে আসার খুশি আর ঈদের আনন্দ যেন মিশে গেল চোখের জলে।
শরিফা জানান, ছেলের সঙ্গে তার বাবা সাকিম চুল কেনাবেচার ব্যবসা করতেন নোয়াখালীতে। ঈদ উদযাপনে সাগর ফিরছিল বাড়িতে। তার বাবার আরও একদিন পরে আসার কথা। কিন্তু তার আগেই সড়ক দুর্ঘটনায় ছেলে মারা গেল। আর সে খবরে জ্ঞান হারিয়ে তার বাবাও এখন হাসপাতালে। এত বড় শোক নিয়ে সামনের দিন কীভাবে চলবেন তাই এখন বড় চিন্তার বিষয়।
অন্যদিকে বিলাপ করছেন ৪৬ বছর বয়সী মোমেনা। তার দুই ছেলে চুল কেনাবেচার ব্যবসা করতেন নোয়াখালীতে। গত রাতেও কথা হয় ছোট ছেলে মোহাম্মদ তারেক ও বড় ছেলে মনসুরের সঙ্গে। ছোট ছেলেকে নিষেধ করেছিলেন খোলা ট্রাকে আসতে। কিন্তু সকালেই জানতে পারেন ট্রাক উল্টে বুকের ধন চলে গেছে ওপারে। আর বড় ছেলে আহত হয়ে ভর্তি আছেন হাসপাতলে।
স্থানীয়রা বলছেন, কেবল এই একটি গ্রাম থেকেই মারা গেছেন ৭ যুবক। এ ছাড়া পাকুড়িয়া ও মুর্শিদপুর গ্রামে বাড়ি আরও ৩ জনের।
প্রতিবেশীরা জানান, নিহতরা সবাই নোয়াখালীতে ফেরি করে চুল ও পরিত্যক্ত জিনিস কেনাবেচার ব্যবসা করতেন। মূলত মান্দা উপজেলার বেশ কয়েকটি গ্রামের নিম্নআয়ের শতাধিক মানুষ প্রতিবছর নোয়াখালীতে যান ঝুট ব্যবসার জন্য। মাঝে মধ্যে বাড়িতে যাতায়াত করেন তারা। ঈদকে সামনে রেখে বাড়ি ফেরার কথা ছিল সবারই। এর মধ্যে ১০ জনের প্রাণ ঝরে গেল সড়কেই।
নওগাঁ জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম জানান, এখন পর্যন্ত নওগাঁ জেলার ১৩ জনের নিহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। যার মধ্যে ১০ জনের পরিচয় নিশ্চিত হওয়া গেছে। সরকারি কবরস্থানের পাশের একটি মাঠে তাদের জানাজা অনুষ্ঠিত হবে বলে জানান তিনি।
