মে মাসে নারী ও শিশু নির্যাতন ৩২৬টি

✍︎ নাগরিক প্রতিবেদক ✍︎

মানবাধিকার সংস্কৃতি ফাউন্ডেশন (এমএসএফ) প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এপ্রিল মাসে নারী ও শিশু নির্যাতনের মোট ঘটনা ছিল ৩১২টি, যা মে মাসে বেড়ে ৩২৬টিতে পৌঁছেছে। অর্থাৎ মাত্র এক মাসের ব্যবধানে সহিংসতার চিত্র আরও ভয়াবহ রূপ নিয়েছে।

সবচেয়ে বেশি উদ্বেগ তৈরি করেছে ধর্ষণের ঘটনা। প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, এপ্রিল মাসে ধর্ষণের ঘটনা ছিল ৫৪টি, যা মে মাসে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৭৮টিতে। অর্থাৎ এক মাসেই প্রায় ৪৪ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে এই অপরাধ। একই সময়ে সংঘবদ্ধ ধর্ষণের ঘটনা ১৪ থেকে বেড়ে ১৬টিতে এবং ধর্ষণের পর হত্যার ঘটনা ২ থেকে বেড়ে ৬টিতে পৌঁছেছে। যৌন হয়রানির ঘটনাও ১৭ থেকে বেড়ে ১৮টি হয়েছে।

প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, নারী ও শিশুদের বিরুদ্ধে যৌন সহিংসতার এই ধারাবাহিক বৃদ্ধি দেশের সামাজিক নিরাপত্তা, বিচারহীনতার সংস্কৃতি এবং আইন প্রয়োগকারী সংস্থার কার্যকারিতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলছে। এমএসএফের মতে, এসব পরিসংখ্যান সমাজে নারী ও শিশুদের ক্রমবর্ধমান অনিরাপদ অবস্থারই প্রতিফলন।

এদিকে মে মাসে নতুন উদ্বেগ হিসেবে সামনে এসেছে অনলাইন জুয়া ও মাদকসংক্রান্ত অপরাধের বিস্তার। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অনলাইন জুয়াকে কেন্দ্র করে একজনের মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে এবং এ-সংক্রান্ত অভিযোগে পাঁচজনকে গ্রেফতার করা হয়েছে।

একই সময়ে মাদকসংশ্লিষ্ট ঘটনায় চারজন নিহত, ১৯ জন আহত এবং ১৫ জন আটক হয়েছেন। পাশাপাশি পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষের দুটি ঘটনা এবং মাদক ব্যবসার সঙ্গে পুলিশের সম্পৃক্ততার তিনটি অভিযোগও প্রতিবেদনে স্থান পেয়েছে।

এমএসএফের নির্বাহী সারসংক্ষেপে বলা হয়েছে, নারী ও শিশু নির্যাতনের ধরন দিন দিন আরও জটিল ও বহুমাত্রিক হয়ে উঠছে। যদিও কিছু ক্ষেত্রে প্রকাশ্য সহিংসতার ঘটনা কমেছে, তবে যৌন সহিংসতা, ডিজিটাল অপরাধ, অনলাইন জুয়ার বিস্তার এবং সামাজিক অবক্ষয়ের বিভিন্ন সূচক আশঙ্কাজনক হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় শুধু আইন প্রয়োগ নয়, বরং সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধি, দ্রুত বিচার নিশ্চিত করা এবং নারী ও শিশুদের জন্য নিরাপদ পরিবেশ গড়ে তোলার কার্যকর উদ্যোগ এখন সময়ের দাবি।

মানবাধিকার সংগঠনটি বলেছে, এপ্রিল থেকে মে মাসের মধ্যে মানবাধিকার পরিস্থিতির কিছু ক্ষেত্রে উন্নতির লক্ষণ দেখা গেছে, বিশেষ করে রাজনৈতিক সহিংসতার ক্ষেত্রে।

মে মাসে রাজনৈতিক সহিংসতায় অন্তত তিনজন নিহত ও ১৯৩ জন আহত হয়েছেন। এপ্রিল মাসে নিহতের সংখ্যা ছিল তিনজন এবং আহত হন ৩০৩ জন।

এমএসএফের তথ্য অনুযায়ী, মে মাসে কারাগারে সাতজনের মৃত্যু হয়েছে। আগের মাসে এ সংখ্যা ছিল ছয় এবং মার্চ মাসে ছিল ১১।

মানবাধিকার সংগঠনটি জানিয়েছে, মে মাসে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনীর (বিএসএফ) হাতে চার বাংলাদেশি নিহত হয়েছেন। এর মধ্যে তিনজন গুলিতে ও একজন নির্যাতনের ফলে মারা যান।

এ ছাড়া, ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তবর্তী এলাকা থেকে এক জেলে ও এক অজ্ঞাত নারীর মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। একইসঙ্গে সীমান্তসংলগ্ন এলাকায় দুর্বৃত্তদের ছুরিকাঘাতে এক যুবক নিহত হয়েছেন। ফলে সীমান্ত-সংশ্লিষ্ট ঘটনায় মোট মৃত্যুর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে সাতজনে।

অন্যদিকে, মিয়ানমার সীমান্তে পৃথক দুটি স্থলমাইন বিস্ফোরণে ঘটনাস্থলেই তিন বাংলাদেশি নিহত হয়েছেন।

মব সহিংসতায় নিহত ৩২

দেশে মব সহিংসতা উদ্বেগজনকভাবে বেড়েই চলেছে। মে মাসে মব সহিংসতায় ৩২ জন নিহত হয়েছেন। এই সংখ্যা গত ছয় মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ।

এমএসএফের হিসাব অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে ১০ জন মব সহিংসতায় নিহত হন। একই ধরনের ঘটনায় চলতি বছরের জানুয়ারিতে ২১ জন, ফেব্রুয়ারিতে ১৮, মার্চে ১৯ ও এপ্রিলে ২১ জন প্রাণ হারান।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মব সহিংসতার সংখ্যা নির্দেশ করে যে, আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার প্রবণতা বাড়ছে। সামাজিক বিরোধগুলো ক্রমেই সহিংসতায় রূপ নিচ্ছে। বিশেষভাবে উদ্বেগজনক হলো, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরাও মবের আক্রমণের শিকার হচ্ছেন, যা রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্বের দুর্বলতা নির্দেশ করে।

সংগঠনের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি অ্যাডভোকেট সুলতানা কামাল স্বাক্ষরিত মে মাসের প্রতিবেদনে এমএসএফ বলেছে, মে মাসে কিছু ক্ষেত্রে উন্নতি ঘটলেও বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সূচকে উদ্বেগজনক অবনতি লক্ষ করা গেছে। বিশেষ করে, মব ভায়োলেন্স ও সীমান্ত এলাকায় সহিংসতা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে, যা আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির ওপর চাপ ও বিচারবহির্ভূত প্রবণতার ইঙ্গিত বহন করে।

শেয়ার করতে

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *