✍︎ নাগরিক প্রতিবেদক ✍︎
লালমনিরহাট, পঞ্চগড় ও নওগাঁ সীমান্ত দিয়ে নারী, পুরুষ ও শিশুসহ মোট ৬০ জনকে বাংলাদেশে পুশ ইন করেছে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিএসএফ)। তবে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) বাধার মুখে তাঁরা প্রবেশ করতে পারেননি। ফলে এসব ব্যক্তি বর্তমানে সীমান্তের শূন্যরেখা ও নো ম্যান্স ল্যান্ডে অবস্থান করছেন।
নওগাঁ
চাঁপাইনবাবগঞ্জের গোমস্তাপুর সীমান্তে পুশ ইনের জন্য জড়ো করা লোকজনকে ভারত সীমান্তের ভেতরে প্রায় ৫০ গজ অভ্যন্তরে সরিয়ে নিয়েছে বর্ডার সিকিউরিটি ফোর্স (বিএসএফ)।
উপজেলার বাঙ্গাবাড়ী ইউনিয়নের ঘুঘিয়া আনারপুর এলাকায় এসব লোকজনকে জড়ো করা হয়েছিল বলে জানা গেছে।
শুক্রবার (৫ জুন) দুপুরে বিষয়টি নিশ্চিত করেন ১৬ বিজিবি (নওগাঁ ব্যাটালিয়ন)–এর সহকারী পরিচালক রবিউল ইসলাম।
তিনি বলেন, শুক্রবার সকালে ওই সীমান্তে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) ও বিএসএফের কোম্পানি কমান্ডার পর্যায়ের একটি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। তবে বৈঠক কোনো সিদ্ধান্ত ছাড়াই শেষ হয়। বিএসএফ জানায়, বিষয়টি নিয়ে তারা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় রয়েছে।
এদিকে উপজেলার পাঁচটি সীমান্ত এলাকায় বৃহস্পতিবার রাতে বিজিবি স্থানীয় জনসাধারণকে সঙ্গে নিয়ে সীমান্ত পাহারার কার্যক্রম চালায়। তারা পুশ-ইন প্রতিরোধে সতর্ক অবস্থানে রয়েছে বলে জানিয়েছে।
এর আগে বৃহস্পতিবার ভোরে একই সীমান্ত দিয়ে ২৮ জন নারী, পুরুষ ও শিশুকে বাংলাদেশে পুশ-ইনের চেষ্টা করা হয়েছিল বলে জানা যায়।
পঞ্চগড়
পঞ্চগড় সদর উপজেলার বড়বাড়ী সীমান্ত পথে নারী-শিশুসহ ১০ জনকে বাংলাদেশে পুশ ইনের চেষ্টা চালায় ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিএসএফ)। তবে ভারত সীমান্ত অতিক্রমের আগেই তাদের আটকে দেয় বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি)। এমন অবস্থায় মানুষগুলো আটকে পড়ে দুই দেশের শূন্যরেখায়। এই প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত প্রায় ১২ ঘণ্টা ধরে তারা সেখানেই অবস্থান করছে।
বিজিবি জানিয়েছে, ওই ১০ জন শূন্যরেখার বাংলাদেশ অংশ থেকে প্রায় ২০ গজ দূরে ভারতের অংশে অবস্থান করছে।
শুক্রবার ভোরের দিকে সদর উপজেলার হাঁড়িভাসা ইউনিয়নের বড়বাড়ী সীমান্ত দিয়ে নারী-শিশুসহ ১০ জনকে পুশ ইনের চেষ্টা করে বিএসএফ। এলাকাটি নীলফামারী ব্যাটালিয়নের ৫৬ বিজিবির বড়বাড়ী বিওপির আওতাধীন সীমান্ত পিলার ৭৫৮/৫ এবং এর বিপরীত দিক ভারতের প্রধানপাড়া এলাকায় বিএসএফের ৯৩ টিয়াপাড়া ক্যাম্পের আওতাধীন।
বিজিবি জানায়, ভোরে ভারতীয় সীমান্তের কাঁটাতারের গেট খুলে দিয়ে তাদের বাংলাদেশের উদ্দেশে ঠেলে দেয় বিএসএফ। এ সময় বিজিবির একটি টহল দল তাদের বাধা দিলে বিএসএফের সদস্যরা ওই ব্যক্তিদের নিয়ে ভারতের ভেতরে সরে যান। বর্তমানে তারা সীমান্তের ভারতীয় অংশে শূন্যরেখা থেকে প্রায় ২০ গজ দূরে অবস্থান করছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সীমান্তের উভয় পাশে বিজিবি ও বিএসএফের টহল দল সতর্ক অবস্থানে রয়েছে।
এ বিষয়ে ৫৬ বিজিবির নীলফামারী ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মো. সিরাজুল ইসলাম বলেন, ‘আমাদের বড়বাড়ী ক্যাম্পের বিপরীতে ১০ জন নারী-পুরুষ ও শিশুকে বাংলাদেশে পুশ ইনের চেষ্টা করে বিএসএফ। বিষয়টি নিয়ে কোম্পানি কমান্ডার পর্যায়ে পতাকা বৈঠক অনুষ্ঠিত হলেও বিএসএফ তাদের ফেরত নিতে অস্বীকৃতি জানায়। বর্তমানে তারা ভারতের অভ্যন্তরে ভারতীয় ভূখণ্ডেই অবস্থান করছে।’
বিজিবির এই অধিনায়ক আরও বলেন, বৈঠকে বিএসএফ ওই ১০ জনকে বাংলাদেশের নাগরিক বলে দাবি করেছে। তবে তারা বাংলাদেশি কি না, তা এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি। এ জন্য তাদের নেওয়া হয়নি। তা ছাড়া সীমান্ত দিয়ে এভাবে ঠেলে পাঠানো নিয়মবহির্ভূত পদক্ষেপ।
সীমান্তে যেকোনো ধরনের পুশ ইন ও অবৈধ অনুপ্রবেশ প্রতিরোধে বিজিবির সার্বক্ষণিক নজরদারি ও টহল কার্যক্রম জোরদার করা হয়েছে বলেও জানিয়েছেন বিজিবির এ কর্মকর্তা।
লালমনিরহাট
লালমনিরহাটের আদিতমারী, হাতীবান্ধা ও পাটগ্রাম উপজেলার চারটি সীমান্ত দিয়ে নারী, পুরুষ, শিশুসহ অন্তত ৩৩ জনকে বাংলাদেশে ঠেলে পাঠানোর চেষ্টা করেছে বিএসএফ। গতকাল বৃহস্পতিবার গভীর রাত থেকে আজ শুক্রবার ভোর পর্যন্ত এসব চেষ্টাকে রুখে দেওয়ার দাবি করেছে বিজিবি।
বিজিবি জানিয়েছে, সীমান্ত এলাকায় টহল জোরদার করা হলে স্থানীয় বাসিন্দাদের সহযোগিতায় অনুপ্রবেশের এসব চেষ্টা ব্যর্থ করা হয়। বর্তমানে সংশ্লিষ্ট সীমান্তগুলোতে বিজিবি ও বিএসএফ মুখোমুখি অবস্থানে আছে। আজ সকালে ওই ব্যক্তিদের লাগেজসহ সীমান্তের শূন্যরেখায় অবস্থান করতে দেখা যায়।
লালমনিরহাট-১৫ বিজিবি ব্যাটালিয়নের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, আদিতমারী উপজেলার দীঘলটারী ও দুর্গাপুর সীমান্তের ৯২৫ ও ৯২৭/৭-এস নম্বর মেইন পিলার এলাকায় ১২ জন সন্দেহভাজন ব্যক্তির উপস্থিতি টের পান বিজিবি সদস্যরা। পরে হ্যান্ডমাইকের মাধ্যমে সতর্ক করা হলে তাঁদের ভারতীয় অংশে সরে যেতে দেখা যায়।
বিজ্ঞপ্তিতে আরও বলা হয়, ওই ব্যক্তিদের পরিচয় শনাক্তে ভারতীয় রানীনগর-৩ বিএসএফ ব্যাটালিয়নের সঙ্গে পতাকা বৈঠকের আহ্বান জানিয়েছে বিজিবি। তবে এ বিষয়ে বিএসএফের পক্ষ থেকে এখনো কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি।
এদিকে হাতীবান্ধা উপজেলার ফকিরপাড়া ইউনিয়ন সীমান্ত দিয়ে নারী, শিশুসহ ১১ জনকে বাংলাদেশে ঠেলে পাঠানোর চেষ্টা করে বিএসএফ—এমন অভিযোগ করেছে বিজিবি। শুক্রবার ভোরে তিস্তা-৬১ বিজিবি ব্যাটালিয়নের বড়খাতা কোম্পানির টহল দল স্থানীয় বাসিন্দাদের সহযোগিতায় তাঁদের অনুপ্রবেশ ঠেকিয়ে দেয়। শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত ওই ১১ জন শূন্যরেখায় অবস্থান করছেন।
অন্যদিকে পাটগ্রাম উপজেলার শ্রীরামপুর ইউনিয়নের ঝালাঙ্গী (পকেট) সীমান্ত দিয়ে নারী, শিশুসহ আরও ১০ জনকে বাংলাদেশে পাঠানোর চেষ্টা করা হয় বলে জানিয়েছে বিজিবি। শুক্রবার ভোরে বিজিবির টহল দল ও স্থানীয় বাসিন্দারা তাঁদের অনুপ্রবেশ প্রতিহত করেন। এ ঘটনায়ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা শূন্যরেখায় অবস্থান করছেন।
সীমান্তের পরিস্থিতি সম্পর্কে তিস্তা-৬১ বিজিবি ব্যাটালিয়নের ভারপ্রাপ্ত অধিনায়ক মেজর তানভীর আহমেদ বলেন, হাতীবান্ধা ও পাটগ্রাম সীমান্তে ২১ জনের অনুপ্রবেশের চেষ্টা প্রতিহত করা হয়েছে। বিষয়টি নিয়ে তাঁরা কাজ করছেন। পরে বিস্তারিত জানানো হবে।
এদিকে লালমনিরহাট-১৫ বিজিবি ব্যাটালিয়ন পৃথক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে আদিতমারী সীমান্তে ১২ জনের অনুপ্রবেশচেষ্টার তথ্য নিশ্চিত করেছে।
লালমনিরহাট জেলার একাধিক সীমান্ত দিয়ে বিএসএফের পুশ ইনের চেষ্টা এবং তা প্রতিহত করার বিষয়টি বিজিবির রংপুর সেক্টরও পৃথক এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে নিশ্চিত করেছে।
