✍︎ কলকাতা প্রতিনিধি ✍︎
বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে গভীর শ্রদ্ধা জানিয়ে ভারতের পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভায় একটি আনুষ্ঠানিক শোকপ্রস্তাব গ্রহণ করা হয়েছে।
সম্প্রতি ওই শোক প্রস্তাবের আনুষ্ঠানিক অনুলিপি ঢাকায় পাঠানো হয়েছে। পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা সচিবালয়ের প্রধান সচিব সুমেন্দ্রনাথ দাস স্বাক্ষরিত চিঠির মাধ্যমে কলকাতাস্থ বাংলাদেশ উপ-হাইকমিশনের কাছে অনুলিপিটি হস্তান্তর করা হয়।
জানানো হয়, বার্তাটি যেন মরহুম নেত্রীর পরিবারের সদস্যদের কাছে পৌঁছে দেওয়া হয়।
মঙ্গলবার (২ জুন) পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা সচিবালয়ের পক্ষ থেকে এই গৃহীত শোকপ্রস্তাবের একটি আনুষ্ঠানিক অনুলিপি ও শোকবার্তা বিশেষ বার্তাবাহকের মাধ্যমে ঢাকার উদ্দেশ্যে প্রেরণ করা হয়েছে। ঢাকাস্থ বাংলাদেশ উপ-হাইকমিশনারের কাছে পাঠানো এই চিঠিটি মরহুমার নিকটাত্মীয় ও পরিবারের কাছে পৌঁছে দেওয়ার জন্য বিশেষভাবে অনুরোধ জানানো হয়েছে।
পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা সচিবালয়ের প্রিন্সিপাল সেক্রেটারি সুমেন্দ্রনাথ দাস স্বাক্ষরিত ওই চিঠির বিবরণী থেকে জানা গেছে, চলতি বছরের ৩ ফেব্রুয়ারি মঙ্গলবার অনুষ্ঠিত বিধানসভার বিশেষ অধিবেশনে স্পিকার রথীন্দ্রনাথ বসু তার শোকবার্তায় প্রয়াত বেগম খালেদা জিয়াকে শ্রদ্ধা জানিয়ে বিস্তারিত স্মৃতিচারণ করেন।
স্পিকার তার বক্তব্যে উল্লেখ করেন, বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া ২০২৫ সালের ৩০ ডিসেম্বর ঢাকার একটি হাসপাতালে দীর্ঘ অসুস্থতার পর মৃত্যুবরণ করেন এবং মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৮০ বছর। স্পিকারের বক্তব্যের পর গভীর শ্রদ্ধা ও শোকের প্রতীক হিসেবে বিধানসভার সমস্ত সদস্য এক মিনিট দাঁড়িয়ে নীরবতা পালন করেন এবং স্পিকার প্রধান সচিবকে এই শোকবার্তা মরহুমার পরিবারের কাছে পাঠানোর সুনির্দিষ্ট নির্দেশ দিয়ে সেদিনের মতো অধিবেশন মুলতবি ঘোষণা করেন।
অধিবেশনে দেওয়া বক্তব্যে স্পিকার রথীন্দ্রনাথ বসু বেগম খালেদা জিয়ার জীবন ও রাজনৈতিক অবদানের কথা স্মরণ করে বলেন, ১৯৪৬ সালে তৎকালীন ব্রিটিশ ভারতের বাংলা প্রদেশের জলপাইগুড়িতে জন্মগ্রহণ করেন খালেদা জিয়া। তিনি তার শিক্ষা জীবনে দিনাজপুর মিশনারি স্কুল, দিনাজপুর গার্লস স্কুল এবং পরবর্তীতে ভারতের সুরেন্দ্রনাথ কলেজে অধ্যয়ন করেছিলেন।
১৯৮১ সালে তার স্বামী বাংলাদেশের সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান হত্যাকাণ্ডের পর বেগম খালেদা জিয়া দেশের সক্রিয় রাজনীতিতে আসেন। পরবর্তীতে ১৯৮২ সালে তিনি বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলে (বিএনপি) যোগ দেন এবং ১৯৮৪ সালে সর্বসম্মতিক্রমে দলের চেয়ারপারসন নির্বাচিত হন।
শোকপ্রস্তাবে আরও উল্লেখ করা হয়, বাংলাদেশের স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে বেগম খালেদা জিয়ার আপসহীন নেতৃত্ব দেশের গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও ঐতিহাসিক ভূমিকা পালন করেছিল। তিনি বাংলাদেশের চারটি সাধারণ নির্বাচনে একাধিক আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে তার সবকটিতেই বিপুল ভোটে জয়ী হন। পরবর্তীতে ১৯৯১, ১৯৯৬ এবং ২০০১ সালে তিনি তিন দফায় অত্যন্ত সফলতার সঙ্গে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
স্পিকার রথীন্দ্রনাথ বসু তার বক্তৃতার শেষাংশে বলেন, বেগম খালেদা জিয়া ছিলেন সমগ্র দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতির এক অত্যন্ত প্রভাবশালী ও কালজয়ী ব্যক্তিত্ব, যিনি এই অঞ্চলে গণতান্ত্রিক সংস্কার, অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও নারীর ক্ষমতায়নে আজীবন কাজ করে গেছেন।
পর্যবেক্ষকদের মতে, এ পদক্ষেপ কেবল একজন সাবেক রাষ্ট্রনায়কের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন নয়, বরং দুই প্রতিবেশী দেশের জনগণের মধ্যে বিদ্যমান ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক বন্ধনেরও প্রতিফলন। বিশেষ করে ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর ভারত ও বাংলাদেশের সম্পর্ক নিয়ে নানা আলোচনা, উদ্বেগ এবং মতবিরোধ দেখা গেলেও বাস্তব কূটনৈতিক সম্পর্ক যে সেই অবস্থার বাইরে এগিয়ে চলেছে, পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভার এই উদ্যোগ তার একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ। গত কয়েক বছরে সমাজমাধ্যমে উভয় দেশের কিছু ব্যক্তি ও বিভিন্ন অনলাইন মাধ্যমে পরস্পরকে নিয়ে নেতিবাচক মন্তব্য ও প্রচারণা চালানো হয়েছে। অনেক সময় এসব বক্তব্য দুই দেশের জনগণের সম্পর্ক নিয়ে বিভ্রান্তিরও সৃষ্টি করেছে। তবে কূটনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক পর্যায়ে ভারত ও বাংলাদেশের যোগাযোগ অব্যাহত রয়েছে। উভয় দেশই বাণিজ্য, যোগাযোগ, সংস্কৃতি এবং আঞ্চলিক সহযোগিতার নানা ক্ষেত্রে সম্পর্ক এগিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একাংশ মনে করেন, পশ্চিমবঙ্গের মতো সীমান্তবর্তী একটি রাজ্যের আইনসভায় বাংলাদেশের একজন সাবেক প্রধানমন্ত্রীর স্মরণে শোক প্রস্তাব গ্রহণ এবং পরে সেই বার্তা আনুষ্ঠানিকভাবে ঢাকায় পাঠানো নিঃসন্দেহে তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা। এর মাধ্যমে পারস্পরিক সম্মান, গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ এবং ঐতিহাসিক সম্পর্কের প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শিত হয়েছে।
কলকাতার বিভিন্ন গণমাধ্যমেও বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে প্রকাশিত হয়েছে। অনেকেই মনে করছেন, রাজনৈতিক মতাদর্শের ভিন্নতা থাকলেও প্রতিবেশী দেশের একজন সাবেক সরকারপ্রধানের প্রতি এমন সম্মান প্রদর্শন দুই দেশের জনগণের মধ্যে ইতিবাচক বার্তা পৌঁছে দেবে। ভারত ও বাংলাদেশের সম্পর্ক বহু দশকের। ভাষা, সংস্কৃতি, ইতিহাস এবং মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি দুই দেশের জনগণকে বিশেষ বন্ধনে আবদ্ধ করেছে। সেই প্রেক্ষাপটে পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভার এই শোক প্রস্তাবকে কেবল আনুষ্ঠানিকতা নয়, বরং পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সৌহার্দ্যের প্রতীক হিসেবেই দেখা হচ্ছে।
সংশ্লিষ্ট মহলের ধারণা, বর্তমান সময়ের নানা রাজনৈতিক আলোচনা ও মতভেদের মধ্যেও এ ধরনের মানবিক ও সম্মানজনক উদ্যোগ দুই দেশের সম্পর্ককে আরও ইতিবাচক ভিত্তির ওপর দাঁড় করাতে সহায়ক হবে। একই সঙ্গে ভবিষ্যতে ভারত ও বাংলাদেশের জনগণের মধ্যে পারস্পরিক আস্থা ও সহযোগিতার নতুন দিগন্ত উন্মোচনেও এমন পদক্ষেপ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
