✍︎ নাগরিক প্রতিবেদক ✍︎
ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসিতে একজন পর্যবেক্ষক নিয়োগ দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। ব্যাংকটির কার্যক্রম নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ এবং আমানতকারীদের স্বার্থ সংরক্ষণের লক্ষ্যে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
বুধবার বাংলাদেশ ব্যাংকের এক বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়। এতে বলা হয়, ব্যাংক কোম্পানি আইন, ১৯৯১-এর ধারা ৪৯(১)(ঘ)(আ) অনুযায়ী বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক মো. আশরাফুল আলমকে ইসলামী ব্যাংকের পর্যবেক্ষক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।
বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, পর্যবেক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে মো. আশরাফুল আলম ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের সভাসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ কার্যক্রমে অংশ নেবেন। পাশাপাশি ব্যাংকের কার্যক্রম সম্পর্কে বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে প্রয়োজনীয় তথ্য, মতামত ও পর্যবেক্ষণ তুলে ধরবেন।
বাংলাদেশ ব্যাংক বলেছে, ব্যাংক খাতের স্থিতিশীলতা, সুশাসন, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। ইসলামী ব্যাংকে পর্যবেক্ষক নিয়োগের এ উদ্যোগ ব্যাংকটির কার্যক্রমে আস্থা ও শৃঙ্খলা আরও শক্তিশালী করতে সহায়ক হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
সম্প্রতি ইসলামী ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদে পরিবর্তনকে কেন্দ্র করে ব্যাংকটির বিভিন্ন শাখায় অস্থিরতা দেখা দেয়। নতুন চেয়ারম্যান নিয়োগের পর আমানতের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন অনেক গ্রাহক। এ সময় উল্লেখযোগ্য পরিমাণ আমানতও তুলে নেওয়া হয়। এতে ব্যাংকটির তারল্য পরিস্থিতি ও স্বাভাবিক কার্যক্রম নিয়ে আলোচনা শুরু হয় ব্যাংক খাতে।
এদিকে দেশের বিভিন্ন ব্যাংকের প্রধান নির্বাহীরাও এ পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তাদের মতে, দেশের সবচেয়ে বড় শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংক হিসেবে ইসলামী ব্যাংকের যেকোনো অস্থিরতা পুরো ব্যাংক খাতেই প্রভাব ফেলতে পারে।
সম্প্রতি বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরও সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর সঙ্গে আলোচনা করে পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখার উদ্যোগ নেওয়ার কথা জানান। তারই ধারাবাহিকতায় ইসলামী ব্যাংকে পর্যবেক্ষক নিয়োগের সিদ্ধান্ত এলো।
গত ২৪ আগস্ট আগের চেয়ারম্যানকে সরিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক ডেপুটি গভর্নর খুরশীদ আলমকে ইসলামী ব্যাংকের চেয়ারম্যান নিয়োগ দেয় কেন্দ্রীয় ব্যাংক। খুরশীদ আলম ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে তিন বছরের জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর হিসেবে নিয়োগ পান। তবে আওয়ামী লীগ ক্ষমতা হারানোর পর বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তাদের আন্দোলনের মুখে তিনিসহ কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ঊর্ধ্বতন চার কর্মকর্তা পদত্যাগে বাধ্য হন। এদিকে ঈদের আগে শেষ কর্মদিবসে ইসলামী ব্যাংকের এমডি ওমর ফারুক খানও বাধ্য হয়ে পদত্যাগ করেন। এসব নিয়ে ব্যাংকটির গ্রাহক ফোরামের ব্যানারে আন্দোলন চলছে।
গত ১ জুন আন্দোলন শুরুর পর ব্যাংকটি থেকে সমানে টাকা তুলে নিচ্ছে মানুষ। এতে করে তারল্য সঙ্কটে পড়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছে ১০ হাজার কোটি টাকার বিশেষ ধার চেয়েছে ইসলামী ব্যাংক।
ইসলামী ব্যাংক নিয়ে ব্যাংক এমডিদের উদ্বেগ
ইসলামী ব্যাংকে চলমান অস্থিরতা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে ব্যাংকগুলোর প্রধান নির্বাহীদের সংগঠন অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স, বাংলাদেশ (এবিবি)। দ্রুত ‘সমঝোতা’ করে ইসলামী ব্যাংকের পরিস্থিতি শান্ত করার আহ্বান জানিয়েছেন এবিবি চেয়ারম্যান ও সিটি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মাসরুর আরেফিন।
বুধবার (১০ জুন) বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমানের সঙ্গে বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের এ উদ্বেগের কথা জানান মাসরুর আরেফিন।
এবিবি চেয়ারম্যান বলেন, ‘ইসলামী ব্যাংকের পরিস্থিতি শুধু একটি প্রতিষ্ঠানের সমস্যা নয়; এর প্রভাব পুরো ব্যাংক খাতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে শুরু করেছে। আমরা একটি স্থিতিশীল ব্যাংকিং ব্যবস্থা চাই। গভর্নরও একই অবস্থানে আছেন।’
তিনি আরও বলেন, ‘গভর্নর এই পরিস্থিতিকে কেবল ব্যাংকিং খাতের সমস্যা হিসেবে নয়, রাজনৈতিক ইস্যু হিসেবেও দেখছেন। সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর মধ্যে সমঝোতার মাধ্যমে সমাধানের চেষ্টা চলছে।’
ব্যাংক খাতে সুশাসন নিশ্চিত করার বিষয়ে গভর্নর কঠোর অবস্থানের কথা জানিয়ে তিনি ব্যাংকগুলোর প্রধান নির্বাহীদের রাজনৈতিক চাপের কাছে নতি স্বীকার না করার আহ্বান জানিয়েছেন। একই সঙ্গে ক্রেডিট ইনফরমেশন ব্যুরোতে (সিআইবি) সঠিক তথ্য দেওয়ার নির্দেশনাও দিয়েছেন।
মাসরুর আরেফিন বলেন, বৈঠকে ব্যাংক খাতে ঋণপ্রবাহ বাড়ানোর বিষয়েও আলোচনা হয়েছে। সরকার ও বাংলাদেশ ব্যাংক ৬০ হাজার কোটি টাকার নতুন তহবিল গঠনের উদ্যোগ নিয়েছে। ক্ষুদ্র, ছোট ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের (এসএমই) ঋণসহায়তা দিতে এই অর্থ ব্যবহার করা হবে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পুনঃ অর্থায়ন (রিফাইন্যান্স) কর্মসূচির আওতায় অর্থ বিতরণ করা হবে।
বৈঠকে দেশের সব ব্যাংকের এমডিদের পাশাপাশি বাংলাদেশ ব্যাংকের সব ডেপুটি গভর্নর ও শীর্ষ কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
গত ২৪ মে ইসলামী ব্যাংকের চেয়ারম্যান জোবায়দুর রহমান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক ওমর ফারুক খান পদত্যাগ করেন। সেদিনই নতুন চেয়ারম্যান হিসেবে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক ডেপুটি গভর্নর খুরশীদ আলমকে বেছে নেয় কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
ঈদের পর এ সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করে ব্যাংকটির কার্যালয়ের সামনে অবস্থান নিয়ে বিক্ষোভ শুরু করেন একদল ব্যক্তি। ‘গ্রাহক ফোরাম’ নামেরে ব্যানারে তখন থেকে তারা বিক্ষোভ করছে। এসব আন্দোলনকারীকে হটিয়ে দিতে এক দিন পুলিশ বলপ্রয়োগও করে।
সম্প্রতি কয়েক দিনে ব্যাংকটি থেকে গ্রাহকরা তিন হাজার কোটি টাকা তুলে নিয়েছে বলে খবর আসে। বিষয়টি নিয়ে আলোচনা গড়ায় জাতীয় সংসদ অধিবেশনে।
ইসলামী ব্যাংকে নতুন চেয়ারম্যান বসানোর পর আলোচনার মধ্যে ফের ব্যাংকটি ‘দখলের চেষ্টা’ হচ্ছে বলে অভিযোগ তোলেন বিরোধীদলীয় নেতা ও জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমান।
তার বিভিন্ন প্রশ্নের জবাবে অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী পাল্টা অভিযোগ করে বলেন, ‘ব্যাংকটিকে “অস্থিতিশীল করে রাজনৈতিক ফায়দা নেওয়ার চেষ্টা চলছে।”’
