✍︎ নাগরিক প্রতিবেদক ✍︎
আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেট উপস্থাপনকালে একাধিকবার পুঁজিবাজারের প্রসঙ্গ টেনেছেন আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। অতীতে এই বাজারে অনিয়ম-অব্যস্থাপনার কথা তুলে ধরে জানিয়েছেন বাজারে সংস্কার ও উন্নয়নে বর্তমান সরকারের নানা পরিকল্পনা।
বৃহস্পতিবার (১১ জুন) অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী জাতীয় সংসদে আগামী অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেট উপস্থাপন করেন।
পুঁজিবাজারকে আরও গভীর, স্বচ্ছ, বহুমাত্রিক ও আস্থাভিত্তিক করতে বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করা হচ্ছে মর্মে জানিয়ে নিচের ব্যবস্থাগুলোর কথা বলেন তিনি-
- ভালো ও সম্ভাবনাময় কোম্পানিগুলোর পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত হওয়া সহজ কর অপ্রয়োজনীয় জটিলতা, দীর্ঘসূত্রিতা, অতিরিক্ত ব্যয় এবং অনুমোদন ও পরিপাল সংক্রান্ত অস্পষ্টতা কমানো হচ্ছে।
- আইপিও প্রক্রিয়া সময়নির্ধারিত ও প্রযুক্তিনির্ভর করা হবে। আবেদন দাখি আনুষঙ্গিক দলিলাদি, যাচাই-বাছাই, ফি পরিশোধ, সংশোধন ও অনুমোদনের ধা অনলাইনে সম্পন্ন করা হবে।
- ইস্যুকারী কোম্পানি, ইস্যু ম্যানেজার, স্টক এক্সচেঞ্জ, সিডিবিএল ও নিয়ন্ত্রক সংস্থার মধ্যে তথ্য আদান-প্রদান সমন্বিত ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে করা হবে।
- পেনশন তহবিল, বীমা প্রতিষ্ঠান, Asset Management Company (AMC), মিউচুয়াল ফান্ড এবং অন্যান্য দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগকারীর অংশগ্রহণ বাড়ানো হবে।
- কোম্পানি বন্ড বাজার সম্প্রসারণ এবং স্থানীয় সরকার ও নগর অবকাঠামো উন্নয়নে পৌর বন্ড ইস্যুর ব্যবস্থা করা হবে।
- সরকারি ও বেসরকারি দীর্ঘমেয়াদি প্রকল্প অর্থায়নে বন্ড, সুকুক, অবকাঠামো তহবিলসহ বিভিন্ন financing instruments-এর ব্যবহার বাড়ানো হবে।
- বিএসইসি, স্টক এক্সচেঞ্জ, সিডিবিএল, ব্যাংক, ব্রোকার ও সংশ্লিষ্ট সংস্থার তথ্যব্যবস্থার সমন্বয় জোরদার করা হবে।
- দেশীয় কোম্পানির জন্য আঞ্চলিক স্টক এক্সচেঞ্জে regional dual listing-এর সম্ভাবনা যাচাই করা হবে।
- নিরীক্ষক, মূল্যায়নকারী, issue manager সহ পুঁজিবাজার সংশ্লিষ্টদের professional liability framework এবং liability insurance প্রবর্তন করা হবে।
- পুঁজিবাজারে লেনদেন নিষ্পত্তির সময় (Sattlement Time) বর্তমানের T+2 থেকে ধাপে ধাপে কমিয়ে T+0 করা হবে।
- বৈধ বিদেশি বিনিয়োগের মুনাফা এবং Non-Resident Investors Taka Account-এর মাধ্যমে ক্রয়কৃত শেয়ার বা সিকিউরিটিজ বিক্রয়লব্ধ অর্থ প্রত্যাবাসন ও পুনঃবিনিয়োগের প্রক্রিয়া এক কর্মদিবসের মধ্যে সম্পন্ন করা সম্ভব হবে।
একাধিক নীতিগত সুপারিশ ডিবিএর
দেশের শেয়ারবাজার, ব্যাংকিং ব্যবস্থা এবং সামগ্রিক আর্থিক খাতের উন্নয়ন ও স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের সঙ্গে ডিএসই ব্রোকার্স এসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ডিবিএ)-এর একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে। বৈঠকে আর্থিক খাতের বিভিন্ন চ্যালেঞ্জ, সংস্কার উদ্যোগ এবং দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন কৌশল নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়।
বুধবার (১০ জুন) বিকেল ৩টায় বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত এ বৈঠকে ডিবিএ প্রেসিডেন্ট সাইফুল ইসলামের নেতৃত্বে সংগঠনটির পরিচালনা পর্ষদের সদস্যরা অংশগ্রহণ করেন। বৈঠকে দেশের বর্তমান শেয়ারবাজার পরিস্থিতি, ব্যাংকিং খাতের বিদ্যমান চ্যালেঞ্জ, বিনিয়োগকারীদের আস্থা পুনরুদ্ধার এবং আর্থিক খাতের টেকসই উন্নয়ন সংক্রান্ত বিভিন্ন বিষয় গুরুত্বের সঙ্গে আলোচিত হয়।
বৈঠকে ডিবিএর পক্ষ থেকে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের কাছে একটি সমন্বিত নীতিগত প্রস্তাবনা উপস্থাপন করা হয়। এতে মোট আটটি গুরুত্বপূর্ণ সুপারিশ অন্তর্ভুক্ত ছিল।
প্রথম প্রস্তাবে সমস্যাগ্রস্ত ব্যাংকগুলোর বাজারভিত্তিক পুনর্গঠনের বিষয়টি তুলে ধরা হয়। ডিবিএর মতে, করদাতাদের অর্থ ব্যবহার করে বারবার ব্যাংক পুনঃমূলধনীকরণ দীর্ঘমেয়াদে অর্থনীতির জন্য ইতিবাচক নয়। তাই বাজারভিত্তিক বিনিয়োগ, একীভূতকরণ এবং বেসরকারি খাতের অংশগ্রহণের মাধ্যমে এসব ব্যাংকের পুনর্গঠন করা প্রয়োজন।
দ্বিতীয় প্রস্তাবে বৃহৎ ঋণগ্রহীতা করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলোর শেয়ারবাজারে অংশগ্রহণ বাড়ানোর সুপারিশ করা হয়। ডিবিএ মনে করে, বড় প্রতিষ্ঠানগুলো ব্যাংকঋণের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীল হওয়ায় ব্যাংকিং খাতের ঝুঁকি বাড়ছে। বন্ড ও ইক্যুইটির মাধ্যমে অর্থ সংগ্রহ বাধ্যতামূলক করা হলে শেয়ারবাজার শক্তিশালী হওয়ার পাশাপাশি ব্যাংকের ওপর চাপও কমবে।
তৃতীয় প্রস্তাবে সরকারি সিকিউরিটিজে নন-কম্পিটিটিভ বিডের সুযোগ সম্প্রসারণের কথা বলা হয়। সংগঠনটির মতে, সাধারণ বিনিয়োগকারী, ব্রোকার এবং নন-পিডি ব্যাংকগুলোর অংশগ্রহণ বাড়ানো গেলে বাজারে তারল্য বৃদ্ধি এবং বিনিয়োগের সুযোগ সম্প্রসারিত হবে।
চতুর্থ প্রস্তাবে আয়কর আইন এবং মূলধন সংরক্ষণ নীতির মধ্যে বিদ্যমান অসামঞ্জস্য দূর করার বিষয়টি তুলে ধরা হয়। ডিবিএর মতে, রিটেইনড আর্নিংস ও স্টক ডিভিডেন্ডের ওপর অতিরিক্ত কর আরোপ ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের মূলধন শক্তিশালীকরণে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করছে। এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংক ও জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) মধ্যে সমন্বয় প্রয়োজন।
পঞ্চম প্রস্তাবে বন্ড খেলাপিদের তথ্য ক্রেডিট ইনফরমেশন ব্যুরো (সিআইবি)-এর আওতায় অন্তর্ভুক্ত করার সুপারিশ করা হয়। এতে আর্থিক খাতে স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা এবং শৃঙ্খলা আরও জোরদার হবে বলে মনে করে ডিবিএ।
ষষ্ঠ প্রস্তাবে দেশের শেয়ারবাজারে টি+১ সেটেলমেন্ট ব্যবস্থা চালুর দাবি জানানো হয়। সংগঠনটির মতে, এই ব্যবস্থা কার্যকর হলে লেনদেনজনিত ঝুঁকি কমবে, বিনিয়োগকারীরা দ্রুত অর্থ পুনঃবিনিয়োগের সুযোগ পাবেন এবং আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে দেশের পুঁজিবাজারের সামঞ্জস্য আরও বৃদ্ধি পাবে।
সপ্তম প্রস্তাবে দেশীয় সমন্বিত ডিজিটাল পেমেন্ট সিস্টেম বা ‘বিইউপিআই’ (BUPI) চালুর ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়। ডিবিএর মতে, এ ধরনের একটি প্ল্যাটফর্ম চালু হলে আন্তর্জাতিক পেমেন্ট গেটওয়ের ওপর নির্ভরতা কমবে, লেনদেন ব্যয় হ্রাস পাবে এবং ডিজিটাল আর্থিক অন্তর্ভুক্তি আরও সম্প্রসারিত হবে।
অষ্টম ও শেষ প্রস্তাবে ওপেন-এন্ড মিউচ্যুয়াল ফান্ডে ব্যাংকগুলোর বিনিয়োগসীমা বৃদ্ধির সুপারিশ করা হয়। ডিবিএর মতে, এতে মিউচ্যুয়াল ফান্ড খাতে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগ বাড়বে, বাজারে তারল্য বৃদ্ধি পাবে এবং দীর্ঘমেয়াদে শেয়ারবাজারের স্থিতিশীলতা শক্তিশালী হবে।
বৈঠকে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ডিবিএর উপস্থাপিত প্রস্তাবনাগুলো গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনার আশ্বাস দেন। একই সঙ্গে দেশের আর্থিক খাতের উন্নয়ন ও স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট সব অংশীজনের সমন্বিত ও সহযোগিতামূলক উদ্যোগের ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
এ সময় ডিবিএ প্রেসিডেন্ট সাইফুল ইসলাম দেশের আর্থিক খাত ও শেয়ারবাজারের উন্নয়নে ইতিবাচক নেতৃত্ব এবং বিভিন্ন সংস্কারমূলক উদ্যোগ গ্রহণের জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরকে আন্তরিক ধন্যবাদ জানান। পাশাপাশি তিনি ভবিষ্যতেও পুঁজিবাজারের উন্নয়ন, সংস্কার ও স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে বাংলাদেশ ব্যাংকের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করার এবং সর্বাত্মক সহযোগিতা অব্যাহত রাখার প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করেন।
