ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সমঝোতা স্মারক হতে পারে ১৪ জুন

✍︎ নাগরিক নিউজ ডেস্ক ✍︎

মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত বন্ধে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে একটি সমঝোতা স্মারক আগামী ১৪ জুন, রোববার স্বাক্ষর হতে পারে। সম্ভাব্য ভেন্যু হিসেবে সুইজারল্যান্ডের জেনেভা আলোচনায় আছে।

সূত্র জানায়, স্মারকের লিখিত বার্তা চূড়ান্ত করার কাজ চলছে। এটি শনিবারের মধ্যে চূড়ান্ত হতে পারে। রোববার মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স ও ইরানের স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ এতে স্বাক্ষর করতে পারেন। যদিও আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো স্থান নির্ধারণ করা হয়নি, তবে জেনেভাকে সম্ভাব্য ভেন্যু হিসেবে দেখা হচ্ছে।

সমঝোতার ক্ষেত্রে লেবানন নিয়ে ইরান তাদের আগের অবস্থানেই অনড় আছে। অর্থাৎ, তারা দেশটিতে হিজবুল্লাহকে লক্ষ্য করে ইসরায়েলের আগ্রাসন বন্ধের নিশ্চয়তা চায়। বৃহস্পতিবার মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও সম্ভাব্য চুক্তি চূড়ান্ত করার ইঙ্গিত দেন। পূর্বঘোষিত হামলার পরিকল্পনা স্থগিতের কথা জানিয়ে তিনি বলেন, ‘আমরা ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ নিয়ে একটি দারুণ সমঝোতায় পৌঁছেছি।’

শুক্রবার ইরানি কর্মকর্তারা যে শর্তগুলোর কথা বলেছেন, তাতে দেখা যাচ্ছে তেহরান দীর্ঘদিনের দাবিগুলোর বেশিরভাগই আদায় করতে যাচ্ছে। অন্যদিকে ট্রাম্প তাঁর প্রত্যাশিত লক্ষ্যগুলোর খুব কমই অর্জন করতে পারছেন। তাঁর অর্জনের মধ্যে থাকতে পারে, হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়া। গত ফেব্রুয়ারিতে যুদ্ধ শুরুর পর থেকে ইরান জলপথটি বন্ধ রেখেছে।

ইরানের একটি সূত্র শুক্রবার রয়টার্সকে জানিয়েছে, খসড়া চুক্তি অনুযায়ী ইরানের তেলের ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করা হবে। জব্দকৃত কয়েক বিলিয়ন ডলারের তহবিল ছাড় এবং বন্ধ করতে হবে লেবাননসহ সব ফ্রন্টের সংঘাত। বিনিময়ে ইরান কী দেবে, সে বিষয়ে সূত্রটি কিছু বলেনি। যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকেও তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি।

পারমাণবিক কর্মসূচির বিষয়টি পরবর্তী আলোচনার জন্য রেখে দেওয়া হতে পারে। যুদ্ধের শুরু থেকে ওয়াশিংটন দাবি করছে, তেহরানের কাছে কোনো পারমাণবিক অস্ত্র থাকতে পারবে না। বিপরীতে ইরান বলেছে, তাদের অস্ত্র তৈরির কোনো পরিকল্পনা নেই।

ইরানের বার্তা সংস্থা মেহের জানিয়েছে, সমঝোতার শর্তে যুক্তরাষ্ট্রের আরও কিছু গুরুত্বপূর্ণ ছাড় আছে। যেমন- ইরানের আশপাশ থেকে মার্কিন সেনা প্রত্যাহারের অঙ্গীকার এবং যুদ্ধবিধ্বস্ত ইরানি অর্থনীতি পুনর্গঠনের জন্য একটি পরিকল্পনা উপস্থাপন। অর্থাৎ, ক্ষতিপূরণ হিসেবে যুক্তরাষ্ট্র ও মিত্রদের অন্তত ৩০০ বিলিয়ন ডলারের পরিকল্পনা জমা দিতে হবে।

এর আগে বৃহস্পতিবার (১১ জুন) মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প হোয়াইট হাউসে সাংবাদিকদের বলেন, ইরানের সাথে আমরা যুদ্ধের একটি দুর্দান্ত সমাধান করতে পেরেছি। এই সফল আলোচনার প্রেক্ষিতেই তিনি ইরানে নতুন করে মার্কিন বিমান হামলা বাতিলের নির্দেশ দেন।

তবে চুক্তির খসড়া শর্তাবলি বিশ্লেষণ করে দেখা যাচ্ছে, এতে মূলত তেহরানের দাবিগুলোই বেশি প্রাধান্য পেয়েছে। ট্রাম্পের একমাত্র বড় অর্জন হতে যাচ্ছে হরমুজ প্রণালি পুনরুন্মুক্ত করা, যা গত ফেব্রুয়ারিতে মার্কিন হামলার পর ইরান বন্ধ করে দিয়েছিল। ইরানের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, এই চুক্তির আওতায় ইরানের ওপর থেকে তেল রপ্তানির নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করা হবে, ফ্রিজ বা অবরুদ্ধ করে রাখা বিলিয়ন বিলিয়ন ডলারের তহবিল মুক্ত করা হবে এবং লেবাননসহ সব ফ্রন্টে শত্রুতা ও সামরিক অভিযান বন্ধ করা হবে। 

তবে দীর্ঘদিনের বিতর্কিত পারমাণবিক বিষয়টি আপাতত একপাশে সরিয়ে পরবর্তী আলোচনার জন্য রাখা হচ্ছে। এছাড়া ইরানের মেহর নিউজ এজেন্সির দাবি, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের যুদ্ধবিধ্বস্ত ইরানের অর্থনীতি পুনর্গঠনের জন্য অন্তত ৩০০ বিলিয়ন ডলারের একটি পরিকল্পনা পেশ করতে হবে।

এই শান্তি চুক্তির আভাসের পর বিশ্ব শেয়ার বাজারে বড় ধরনের উত্থান দেখা গেছে এবং অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দাম প্রায় ২ শতাংশ কমে গেছে। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি মার্কিন ও ইসরাইলি বিমান হামলার মাধ্যমে শুরু হওয়া এই যুদ্ধের পর ট্রাম্প এর আগেও কয়েকবার চুক্তি কাছাকাছি থাকার কথা বললেও তা বাস্তবে রূপ নেয়নি। তবে এবার এপ্রিলের যুদ্ধবিরতি ভেঙে গত কয়েক দিনে ইরান ও ইসরাইলের সরাসরি ক্ষেপণাস্ত্র বিনিময় এবং মার্কিন ঘাঁটিতে ইরানি হামলার পর ট্রাম্পের এই অনমনীয় অবস্থানকে বাজার ইতিবাচক হিসেবে দেখছে। ট্রাম্প জানিয়েছেন, ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ মোজতবা খামেনির অনুমোদন পাওয়ার পরই এই চুক্তির প্রক্রিয়া চূড়ান্ত হয়েছে।

অবশ্য চুক্তি নিয়ে আলোচনার মধ্যেই হরমুজ প্রণালিতে উত্তেজনা বিরাজ করছে। মার্কিন সামরিক বাহিনী জানিয়েছে, তারা বৃহস্পতিবার বাণিজ্যিক জাহাজে হামলা চালাতে যাওয়া দুটি ইরানি ড্রোন ভূপাতিত করেছে। অন্যদিকে, মার্কিন অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে এই যুদ্ধ ট্রাম্পের জন্য বড় মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছিল, কারণ তেলের উচ্চমূল্যের কারণে তার জনপ্রিয়তায় ধস নেমেছে এবং আগামী নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনে রিপাবলিকানদের পরাজয়ের শঙ্কা তৈরি হয়েছে। 

তবে এই শান্তি আলোচনা থেকে ইসরাইলকে সম্পূর্ণ বাইরে রাখায় তেল আবিব অসন্তোষ প্রকাশ করেছে। ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর কার্যালয় থেকে স্পষ্ট করে দেওয়া হয়েছে যে, ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যকার এই সমঝোতা স্মারকের কোনো পক্ষ ইসরাইল নয়।

শেয়ার করতে

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *