✍︎ নাগরিক প্রতিবেদক ✍︎
আমানতকারীদের স্বার্থ, ব্যাংকের স্থিতিশীলতা ও জনস্বার্থের কথা বিবেচনা করে ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসির চেয়ারম্যানসহ পুরো পরিচালনা পর্ষদ ভেঙে দিয়ে প্রশাসক বসিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। একই সঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক মোহাম্মদ জহির হোসেনকে ইসলামী ব্যাংকের প্রশাসক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। এর মাধ্যমে ব্যাংকটির সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ নিজের হাতে নিয়ে নিল কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসির পরিচালনা পর্ষদের চেয়ারম্যান খুরশীদ আলমসহ সব পরিচালকের নিয়োগ বাতিল করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক।
রোববার (১৪ জুন) বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে দেওয়া এক বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, ব্যাংক কোম্পানি আইন, ১৯৯১-এর ৪৫ ধারায় ও ৪৭(৩) ধারায় বাংলাদেশ ব্যাংকের ওপর অর্পিত ক্ষমতাবলে এবং ব্যাংক-কোম্পানির স্বার্থে, আমানতকারীদের স্বার্থে ও জনস্বার্থে বাংলাদেশ ব্যাংক আজ ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসি-এর পরিচালনা পর্ষদের চেয়ারম্যানসহ সব পরিচালকের নিয়োগ বাতিল করেছে।
ব্যাংক কোম্পানি আইন, ১৯৯১-এর ৪৭(৩) ধারায় বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক মোহাম্মদ জহির হোসেন পর্ষদের যাবতীয় ক্ষমতা প্রয়োগ ও দায়িত্ব পালন করবেন বলে বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ করা হয়।
বাংলাদেশ ব্যাংক বলেছে, পরবর্তী নির্দেশনা না দেওয়া পর্যন্ত মোহাম্মদ জহির হোসেন ব্যাংকটির প্রশাসক হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, চলতি মাসের প্রথম ৯ দিনে ইসলামী ব্যাংক থেকে প্রায় ছয় হাজার কোটি টাকা আমানত তুলে নিয়েছেন গ্রাহকরা। টাকা তোলার হিড়িকে শেষ দুই দিনে কয়েকটি শাখা ও এটিএম বুথে নগদ অর্থের চাপ তৈরি হয়। এমন অবস্থায় ১০ হাজার কোটি টাকা তারল্য সহায়তার আবেদন করে ব্যাংকটি। পর্যালোচনা শেষ রোববার দুপুরে আড়াই হাজার কোটি টাকা ধার হিসেবে তারল্য সহায়তা দেয় বাংলাদেশ ব্যাংক।
এর আগে আজ বিকেল ৪টায় বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ে ইসলামী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালকসহ (এমডি) ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের নিয়ে বৈঠকে বসে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। বৈঠকে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর মোস্তাকুর রহমান উপস্থিত ছিলেন। ইসলামী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (চলতি দায়িত্ব) আলতাফ হোসেন, দুজন অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এএমডি) এবং ছয়জন উপ-ব্যবস্থাপনা পরিচালক (ডিএমডি) এতে অংশ নেন।
বৈঠক শেষে ইসলামী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (চলতি দায়িত্বে) আলতাফ হোসেন বলেছেন, ব্যাংকটির গ্রাহকদের টাকা তোলার সমস্যা দ্রুতই কেটে যাবে। ব্যাংকের লেনদেন পরিস্থিতি ও তারল্যসংকট কাটিয়ে উঠতে তাঁরা কার্যকর পদক্ষেপ নিচ্ছেন। বাংলাদেশ ব্যাংকের সঙ্গে ব্যাংকের বর্তমান লেনদেনের অবস্থা, তহবিল ব্যবস্থাপনা এবং আগামী দিনগুলোর জন্য প্রয়োজনীয় আর্থিক পরিকল্পনা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে। তিনি আরও জানান, গত দুই দিনে ব্যাংকে গড়ে প্রতিদিন প্রায় ১ হাজার ২০০ কোটি টাকা জমা হয়েছে এবং সমপরিমাণ টাকা উত্তোলন করা হয়েছে। নগদ জমা ও উত্তোলনের পরিমাণ বর্তমানে প্রায় সমান অবস্থানে আছে।
এদিকে, চেয়ারম্যান নিয়োগকে ঘিরে সৃষ্ট অসন্তোষ ও আস্থাহীনতার কারণে গ্রাহকদের ব্যাপক টাকা উত্তোলনে বড় ধরনের সংকটে পড়েছে দেশের বৃহত্তম বেসরকারি এই বাণিজ্যিক ব্যাংকটি। পরিস্থিতি সামাল দিতে ইতোমধ্যে ইসলামী ব্যাংককে আড়াই হাজার কোটি টাকার সহায়তা দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক।
গত ২৪ মে ইসলামী ব্যাংকের চেয়ারম্যান অধ্যাপক এম. জুবায়দুর রহমান আকস্মিকভাবে পদত্যাগ করেন। একই দিনে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক ডেপুটি গভর্নর মো. খুরশীদ আলমকে নতুন চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। এই নিয়োগের পর থেকে ব্যাংকটির কর্মকর্তা-কর্মচারী, শেয়ারহোল্ডার ও গ্রাহকদের একটি অংশের মধ্যে ক্ষোভ ও প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়।
ইসলামী ব্যাংক সচেতন গ্রাহক ফোরাম-এর ব্যানারে মতিঝিলে ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের সামনে টানা এক সপ্তাহের বেশি সময় ধরে বিক্ষোভ কর্মসূচি চলছে। আন্দোলনকারীদের অভিযোগ, বিতর্কিত ব্যক্তিকে শীর্ষ পদে বসানোর ফলে ব্যাংকের চলমান সংস্কার কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত হতে পারে। তারা দাবি আদায় না হলে আগামী মঙ্গলবার বাংলাদেশ ব্যাংক ঘেরাও কর্মসূচির ঘোষণা দিয়েছে।
