ইরান-যুক্তরাষ্ট্র শান্তি চুক্তিতে যা যা থাকছে

✍︎ নাগরিক নিউজ ডেস্ক ✍︎

ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে চলমান আলোচনায় প্রস্তাবিত সমঝোতা স্মারক-এর খসড়া নিয়ে নতুন তথ্য প্রকাশ পেয়েছে। ইরানের আলোচক দলের ঘনিষ্ঠ একটি সূত্র জানিয়েছে, ১৪ দফা সমঝোতা খসড়ায় ইরানের প্রায় ২৪ বিলিয়ন ডলারের জব্দকৃত অর্থ ৬০ দিনের চূড়ান্ত আলোচনাকালীন সময়ে মুক্ত করার প্রস্তাব রয়েছে। সূত্রটি জানায়, এখন পর্যন্ত এটি খসড়ার সবচেয়ে বিস্তারিত প্রকাশিত সংস্করণ।

এছাড়া জানা গেছে, প্রস্তাবিত চুক্তিটি আগামী শুক্রবার সুইজারল্যান্ডের জেনেভায় আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাক্ষরিত হতে পারে, যদিও এখনো তা চূড়ান্ত অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে।

প্রস্তাবিত খসড়ায় যেসব গুরুত্বপূর্ণ বিষয় অন্তর্ভুক্ত রয়েছে তা হলো-

১. লেবাননসহ সব ফ্রন্টে যুদ্ধের স্থায়ী ও অবিলম্বে অবসান।
২. ইরানের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ না করা এবং সার্বভৌমত্বের প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের সম্মান প্রদর্শনের প্রতিশ্রুতি।
৩. ৩০ দিনের মধ্যে ইরানের ওপর আরোপিত নৌ-অবরোধ সম্পূর্ণ প্রত্যাহার।
৪. ইরান সংলগ্ন অঞ্চল থেকে মার্কিন সেনা প্রত্যাহারের প্রতিশ্রুতি এবং অতিরিক্ত সেনা মোতায়েন না করার অঙ্গীকার।
৫. ৩০ দিনের মধ্যে হরমুজ প্রণালি পুনরায় চালু করা।
৬. তেল ও পেট্রোকেমিক্যাল পণ্যের ওপর নিষেধাজ্ঞা স্থগিত এবং ইরানের আর্থিক সম্পদে পূর্ণ প্রবেশাধিকার প্রদান।
৭. যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের পক্ষ থেকে অন্তত ৩০০ বিলিয়ন ডলারের পুনর্গঠন পরিকল্পনা উপস্থাপন।
৮. পারমাণবিক ইস্যুতে চূড়ান্ত সমঝোতা ও নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের লক্ষ্যে ৬০ দিনের আলোচনা প্রক্রিয়া।
৯. পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি না করার বিষয়ে এনপিটি-তে ইরানের প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত।
১০. আলোচনার সময় নতুন নিষেধাজ্ঞা আরোপ না করা এবং মধ্যপ্রাচ্যে অতিরিক্ত সামরিক উপস্থিতি না বাড়ানোর মার্কিন প্রতিশ্রুতি।
১১. আলোচনার ৬০ দিনের মধ্যে ইরানের ২৪ বিলিয়ন ডলারের জব্দকৃত অর্থ মুক্ত করা; এর অর্ধেক আলোচনা শুরুর আগেই প্রদান।
১২. চুক্তি বাস্তবায়নের জন্য একটি পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা গঠন।
১৩. চূড়ান্ত চুক্তিকে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের প্রস্তাব হিসেবে অনুমোদন।
১৪. আলোচনার শুরু শর্তসাপেক্ষ-অর্থ মুক্তি, তেল নিষেধাজ্ঞা স্থগিত এবং নৌ-অবরোধ প্রত্যাহারের পরই চূড়ান্ত আলোচনা শুরু হবে। চূড়ান্ত চুক্তিতে মূলত ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ, নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার এবং অর্থনৈতিক পুনর্গঠন বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত থাকবে। পাশাপাশি ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি এবং আঞ্চলিক গোষ্ঠীগুলোর প্রতি সমর্থন বিষয়টি আলোচনার বাইরে রাখা হয়েছে।

এছাড়া নতুন তথ্য অনুযায়ী, খসড়ায় লেবাননের সার্বভৌমত্ব ও আঞ্চলিক অখণ্ডতা রক্ষার বিষয়ে অতিরিক্ত নিশ্চয়তা সংযুক্ত করা হয়েছে বলে জানা গেছে। ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র জানিয়েছেন, প্রস্তাবিত খসড়াটি এখনো সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থাগুলোর পর্যালোচনা ও চূড়ান্ত অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে।

এ ছাড়া ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির ভবিষ্যৎ নিয়েও এই পরবর্তী আলোচনায় সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে বলে আগে থেকেই রয়টার্সকে জানিয়েছিল সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো। এই ঘোষণার পরপরই ইসরায়েলের কোনো আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি। তবে দেশটি আগেই জানিয়েছিল, যুক্তরাষ্ট্র-ইরান আলোচনার অংশ তারা নয়।

ট্রাম্প জানিয়েছেন, বৈশ্বিক তেল ও গ্যাস সরবরাহের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ হরমুজ প্রণালি আগামী শুক্রবার থেকে পুনরায় খুলে দেওয়া হবে। কয়েক মাস ধরে ইরান কার্যত এই রুট বন্ধ করে রেখেছিল বলে যুক্তরাষ্ট্রের দাবি।

একই সঙ্গে ট্রাম্প বলেছেন, তিনি ইরানি বন্দরগুলোর ওপর আরোপিত মার্কিন অবরোধ প্রত্যাহারের নির্দেশ দিয়েছেন। ট্রুথ সোশ্যালে তিনি লেখেন, ‘বিশ্বের জাহাজগুলো, ইঞ্জিন চালু করো। তেল প্রবাহিত হতে দাও!’ এই ঘোষণার পর বাজারে তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া দেখা যায়। সোমবার দিনের শুরুতে ব্রেন্ট ক্রুড ফিউচারের দাম প্রায় ৪ শতাংশ কমে যায়। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েটের দাম ৪ দশমিক ৬ শতাংশের বেশি পড়ে যায়। এশিয়ার শেয়ারবাজারেও ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা দেখা যায়।

এদিকে, বাইডেন প্রশাসনের সাবেক পররাষ্ট্র দপ্তরের মুখপাত্র ম্যাথিউ মিলার বলেন, ট্রাম্প এমন কিছু গুরুত্বপূর্ণ ছাড় দিয়েছেন যার মাধ্যমে যুদ্ধ শুরুর আগের অবস্থায় ফিরে যাওয়া সম্ভব হয়েছে। তাঁর ভাষায়, ‘পারমাণবিক কর্মসূচি আদৌ সমাধান হবে, এমন কোনো নিশ্চয়তা নেই। কিন্তু ইরান বিশ্বকে দেখিয়েছে যে তারা বৈশ্বিক অর্থনীতিকে জিম্মি করতে পারে এবং এর বিনিময়ে যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে কিছু আদায় করতে পারে।’

ফেব্রুয়ারি ২৮ তারিখে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল প্রথম ইরানে হামলা চালানোর পর থেকে কয়েক হাজার মানুষ নিহত হয়েছে। নিহতদের বড় অংশ ইরান ও লেবাননের নাগরিক। এ সময় ইরান পাল্টা হামলায় ইসরায়েল ও উপসাগরীয় অঞ্চলে মার্কিন ঘাঁটি থাকা দেশগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করে। পাশাপাশি হরমুজ প্রণালিতে কার্যত অবরোধ সৃষ্টি করে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে চাপ তৈরি করে। এর জবাবে যুক্তরাষ্ট্র ইরানি বন্দর অবরোধ করে।

দেশীয় রাজনীতিতেও যুদ্ধ ট্রাম্প ও রিপাবলিকানদের জন্য চাপ তৈরি করেছে। বিভিন্ন জনমত জরিপে দেখা গেছে, নভেম্বরে মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে জ্বালানির দাম বাড়ায় মার্কিন ভোটারদের মধ্যে অসন্তোষ বাড়ছে। তবে একই সময়ে ট্রাম্প নিজের দল থেকেও চাপের মুখে পড়েছেন। রিপাবলিকানদের একটি অংশ ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি পুরোপুরি বন্ধ না হওয়া পর্যন্ত আপসের বিরোধিতা করছে।

ইরান বিষয়ে কঠোর অবস্থানের জন্য পরিচিত রিপাবলিকান সিনেটর লিন্ডসি গ্রাহাম চুক্তিকে স্বাগত জানিয়ে বলেছেন, পারমাণবিক আলোচনার পরবর্তী ধাপ তিনি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করবেন। তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের আইন অনুযায়ী ইরানের সঙ্গে যেকোনো পারমাণবিক চুক্তি কংগ্রেসে পর্যালোচনা ও ভোটের জন্য পাঠাতে হবে।

নিজের প্রথম মেয়াদে ট্রাম্প ২০১৫ সালে করা বহুপাক্ষিক ইরান চুক্তি থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে প্রত্যাহার করে নেন। ডেমোক্র্যাট প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার সময় করা সেই চুক্তির আওতায় ইরানের ওপর নিষেধাজ্ঞা শিথিলের বিনিময়ে পারমাণবিক কর্মসূচির ওপর সীমা এবং আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষণ চালুর ব্যবস্থা ছিল। পরে ইরান ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ বাড়িয়ে প্রায় অস্ত্রমানের বিশুদ্ধতার কাছাকাছি পর্যায়ে ৪০০ কেজির বেশি, অর্থাৎ প্রায় ৯০০ পাউন্ড উপাদান উৎপাদন করে। এই মজুত ইউরেনিয়ামের ভবিষ্যৎ আসন্ন আলোচনার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হতে যাচ্ছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

শেয়ার করতে

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *