প্রতিমন্ত্রীর পরিবারের নামে ৩ ইউনিয়নের নামকরণ

✍︎ নাগরিক প্রতিবেদক ✍︎

বগুড়ার প্রশাসনিক মানচিত্রে নবগঠিত মোকামতলা উপজেলায় তিনটি নতুন ইউনিয়ন ও শিবগঞ্জ উপজেলায় একটি নতুন ইউনিয়ন সংযোজন হয়েছে।

শিবগঞ্জ উপজেলায় গঠিত নতুন ইউনিয়নের নামকরণ করা হয়েছে ‘মীরবাড়ী ইউনিয়ন’। অন্যদিকে নবঘোষিত মোকামতলা উপজেলায় গঠিত নতুন তিনটি ইউনিয়নে নামকরণ করা হয়েছে ‘সীমান্ত ইউনিয়ন’, ‘দিগন্ত ইউনিয়ন’ এবং ‘স্বর্ণগ্রাম ইউনিয়ন’।

অভিযোগ উঠেছে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী এবং বগুড়া-২ (শিবগঞ্জ) আসনের সংসদ সদস্য মীর শাহে আলম তাঁর পৈতৃক বাসভবন ‘মীরবাড়ী’র নামে শিবগঞ্জ উপজেলার নতুন ইউনিয়নের নামকরণ করেছেন। অন্যদিকে তাঁর দুই ছেলে মীর শাকরুল আলম সীমান্ত এবং মীর সাকলাইন আলম দিগন্ত’র নামানুসারে মোকামতলা উপজেলার দুটি ইউনিয়নের নামকরণ করা হয়েছে।

তবে প্রতিমন্ত্রী তা অস্বীকার করে দাবি করেন, অলৌকিকভাবে তাঁর ছেলেদের নামের সঙ্গে মিলে গেছে।

মোকামতলা উপজেলায় গঠিত নতুন ইউনিয়নগুলোর মধ্যে দুটি হলো ‘সীমান্ত’ ও ‘দিগন্ত’। 

অন্যদিকে শিবগঞ্জ উপজেলায় নতুন গঠিত ইউনিয়নের নাম রাখা হয়েছে ‘মীরবাড়ী’, যা প্রতিমন্ত্রীর পারিবারিক ও আদি নিবাস হিসেবে পরিচিত।

গত রোববার বগুড়া জেলা প্রশাসক তৌফিকুর রহমান স্বাক্ষরিত গেজেটে এসব ইউনিয়ন গঠন ও পুনর্গঠনের তথ্য প্রকাশিত হওয়ার পর থেকেই বিষয়টি নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, রাজনৈতিক অঙ্গন এবং স্থানীয় জনগণের মধ্যে আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয়েছে।

অনেকেই প্রশ্ন তুলছেন, প্রশাসনিক ইউনিটের নামকরণে একজন ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব ও তার পরিবারের প্রভাব কতটা গ্রহণযোগ্য।

সরকারি গেজেট অনুযায়ী, নবগঠিত মোকামতলা উপজেলায় ময়দানহাট্টা ইউনিয়ন ভেঙে ‘স্বর্ণগ্রাম’ ইউনিয়ন, সৈয়দপুর ইউনিয়ন ভেঙে ‘সীমান্ত’ ইউনিয়ন এবং দেউলী ইউনিয়ন ভেঙে ‘দিগন্ত’ ইউনিয়ন গঠন করা হয়েছে।

নতুন গঠিত সীমান্ত ইউনিয়নের জনসংখ্যা ১৬ হাজার ২৬৭ জন এবং দিগন্ত ইউনিয়নের জনসংখ্যা ১৭ হাজার ৭৫৯ জন। 

একই সঙ্গে পুরোনো ইউনিয়নগুলোকেও নতুন করে পুনর্গঠন করা হয়েছে।

অন্যদিকে শিবগঞ্জ উপজেলায় বিহার, রায়নগর ও বুড়িগঞ্জ ইউনিয়নের বিভিন্ন মৌজা নিয়ে ‘মীরবাড়ী’ নামে নতুন ইউনিয়ন গঠন করা হয়েছে। নতুন ইউনিয়নটির জনসংখ্যা ১৮ হাজার ৯২৪ জন।

এ ছাড়া শিবগঞ্জ পৌরসভার সীমানা সম্প্রসারণের অংশ হিসেবে বিহার, রায়নগর, বুড়িগঞ্জ, কিচক ও আটমুল ইউনিয়নও পুনর্গঠন করা হয়েছে।

প্রশাসনিক পুনর্গঠনের ক্ষেত্রে নতুন ইউনিয়ন বা পৌরসভার নাম সাধারণত এলাকার ঐতিহাসিক পরিচিতি, ভৌগোলিক বৈশিষ্ট্য, সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য কিংবা জনমতের ভিত্তিতে নির্ধারণ করা হয়।

কিন্তু মোকামতলার দুটি ইউনিয়নের নাম সরাসরি প্রতিমন্ত্রীর দুই সন্তানের নামের সঙ্গে মিলে যাওয়ায় শুরু হয়েছে বিতর্ক।

স্থানীয়দের একটি অংশ বলছেন, নতুন ইউনিয়নগুলোর নামকরণে এলাকার ইতিহাস বা ভৌগোলিক বৈশিষ্ট্যের প্রতিফলন খুব একটা দেখা যায় না। বরং নামগুলো ব্যক্তিকেন্দ্রিক বলে মনে হচ্ছে।

গেজেট প্রকাশের পর ফেসবুকসহ বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিষয়টি নিয়ে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়।

অনেক পোস্টে মীর শাহে আলমকে ‘বগুড়ার নতুন জমিদার’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

সমালোচকদের দাবি, প্রশাসনিক মানচিত্রে একই পরিবারের নামের প্রভাব বিস্তার স্থানীয় সরকার ব্যবস্থার নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তুলতে পারে। তবে প্রতিমন্ত্রীর সমর্থকেরা বলছেন, এসব সমালোচনা রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত।

তাদের দাবি, ইউনিয়নগুলোর নাম স্থানীয় পর্যায়ে আলোচনা ও সুপারিশের ভিত্তিতেই নির্ধারণ করা হয়েছে।

এ বিষয়ে জানতে স্থানীয় প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলমের ব্যক্তিগত নাম্বারে ফোন করা হলেও তিনি কল রিসিভ করেননি। ম্যাসেজ করেও কোনো তথ্য উত্তর পাওয়া যায়নি। 

একই বিষয়ে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের কেউ আনুষ্ঠানিকভাবে কথা বলতে চাননি।

প্রশাসনিক এলাকাগুলোর নামকরণ স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রীর পরিবারের নামে হওয়ায় এর নৈতিকতা নিয়ে তীব্র সমালোচনা হচ্ছে। 

সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার এই ঘটনাকে ব্যক্তিগত রুচিহীনতা হিসেবে অভিহিত করেন।

তিনি বলেন, পরিবারের নামে ব্যক্তির নামে এগুলো কোনভাবেই কাঙ্কিত নয়। হ্যাঁ; কোন যদি গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি হয়, যে যাকে সবাই সর্বজন শ্রদ্ধেয় যাকে সবাই স্মরণ রাখতে চায়। এরকম হলে হইতে পারে।

তিনি বলেন, এখন এটা না হওয়াই ভালো ছিল। এটা অগ্রহণযোগ্য চর্চা। কোনো স্থান বা প্রতিষ্ঠানের নামে কেবল এমন সর্বজন শ্রদ্ধেয় ব্যক্তিদের নামে হওয়া উচিত। যাদের অবদান জাতি আজীবন মনে রাখবে।

রাষ্ট্রীয় কার্যক্রমে এ ধরনের পারিবারিক প্রভাব বিস্তার করা মোটেও কাম্য নয় বলেও দাবি করেন তিনি। 

বগুড়ার শিবগঞ্জ উপজেলার নামও পরিবর্তন করা হবে বলে ঘোষণা দিয়েছেন স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম। গত শুক্রবার রাতে বগুড়ার মোকামতলা উপজেলায় বাজেটকে স্বাগত জানিয়ে আনন্দমিছিল শেষে আয়োজিত সমাবেশে তিনি শিবগঞ্জের নাম বদলে মহাস্থান উপজেলা নামকরণের ঘোষণা দেন।

সমাবেশে মীর শাহে আলম বলেন, শিবগঞ্জ নামে চাঁপাইনবাবগঞ্জে আরও একটি উপজেলা আছে। একই নামে একাধিক উপজেলা থাকায় সরকারি কাজকর্মে নানা জটিলতা সৃষ্টি হয়। এ জন্য শিবগঞ্জ উপজেলার নাম বদলে দিয়ে মহাস্থান উপজেলা নামকরণ করা হবে।

এর আগে, চলতি বছরের ১২ এপ্রিল মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সিনিয়র সহকারী সচিব ইমতিয়াজ মোরশেদ বগুড়ার শিবগঞ্জ উপজেলার মোকামতলা বন্দরকে নতুন উপজেলা ঘোষণার অনুমোদন করেন। মোকামতলা দেউলী, সৈয়দপুর, ময়দানহাট্টা এবং শিবগঞ্জ সদর নিয়ে মোকামতলা উপজেলা গঠন করা হয়। নতুন করে তিনটি ইউনিয়ন গঠিত হওয়ায় এখন এ সংখ্যা ৮ হলো। এর আয়তন ১২৮ দশমিক ৭৪ বর্গকিলোমিটার। লোকসংখ্যা প্রায় দেড় লাখের মতো।

শেয়ার করতে

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *