✍︎ নাগরিক প্রতিবেদক ✍︎
ভারতের ইন্দিরা গান্ধী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে দুই ঘণ্টারও বেশি সময় বসিয়ে রেখে হেনস্তা করার প্রতিবাদ হিসেবে সেখান থেকেই দেশে ফিরে এসেছেন বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের তথ্য ও সম্প্রচার বিষয়ক উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমান।
তিনি বলেছেন, এটি কোনো ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত ছিল না, বরং সরকারের প্রতিনিধি হিসেবে রাষ্ট্রের আত্মসম্মান বজায় রাখতে তিনি তাৎক্ষণিক এই প্রতিবাদ জানিয়েছেন।
মঙ্গলবার সচিবালয়ে তথ্য অধিদপ্তরের (পিআইডি) সম্মেলন কক্ষে সরকারের বিভিন্ন কার্যক্রমের অগ্রগতি নিয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে উপদেষ্টা এসব কথা বলেন।
তিনি আশা প্রকাশ করেন, এই ঘটনার পর ভারত ভবিষ্যতে সতর্ক হবে, তবে বিষয়টি দুই দেশের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কে দীর্ঘমেয়াদি কোনো নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে না।
গত রোববার (১৪ জুন) ভারত মহাসাগরীয় আঞ্চলিক সহযোগিতা জোট (আইওআর)-এর জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের দুই দিনের একটি বৈঠকে যোগ দিতে নয়াদিল্লি গিয়েছিলেন উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমান। তাঁর এই সফরের বিষয়টি অন্তত দুই দিন আগেই আনুষ্ঠানিকভাবে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে জানিয়েছিল ঢাকা।
অভিযোগ উঠেছে, দিল্লির ইন্দিরা গান্ধী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর পৌঁছানোর পর তাঁকে প্রায় আড়াই ঘণ্টা অপেক্ষায় রাখা হয় এবং শুরুতে ভারতে প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হয়নি। পরবর্তীতে ভারতের উচ্চপর্যায়ের নির্দেশে প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হলেও, উপদেষ্টা সেখানে প্রবেশ না করে ঢাকায় ফিরে আসার সিদ্ধান্ত নেন।
গণমাধ্যমে প্রকাশিত খবরের সত্যতা নিশ্চিত করে উপদেষ্টা বলেন, ‘পত্র-পত্রিকায় যা যা দেখছেন, নানা সূত্র থেকে বাংলাদেশ ও ইন্ডিয়ার মিডিয়াতে যা যা এসেছে, আসলে ঘটনাগুলো ঠিক এই রকমই ঘটেছে। আমি সেখানে একটা ব্যক্তি হিসেবে যাইনি। আমি এই সরকারের ও এই রাষ্ট্রের একজন প্রতিনিধি হিসেবে গিয়েছি। ফলে আমার সঙ্গে সেখানে যা হয়েছে, আমার কাছে মনে হলো যে আমাদের তাৎক্ষণিক একটা প্রতিবাদ করা দরকার। সেই কারণেই আমি আসলে ফিরে আসার সিদ্ধান্ত নিয়েছি।’
উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমান জানান, ঢাকায় ফিরে আসার সিদ্ধান্তের আগে ভারতীয় কর্তৃপক্ষ তাঁকে বোঝানোর চেষ্টা করেছিল। তিনি বলেন, ‘মিডিয়াতে দেখেছেন, একটা পর্যায়ে তারা খুবই চেষ্টা করেছেন আমি যেন ভারতে প্রবেশ করি এবং নিয়মিত কার্যক্রমে অংশগ্রহণ করি। কিন্তু আমি তা করিনি। কারণ সরকারের একজন উপদেষ্টা হিসেবে আমার মনে হয়েছে, এই রাষ্ট্র বা সরকারের পক্ষ থেকে একটা স্পষ্ট বার্তা থাকা দরকার।’
উদ্দেশ্য কোনো বৈরিতা তৈরি করা ছিল না উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘আমার কখনো উদ্দেশ্য নেই যে এটার মাধ্যমে পাল্টা-পাল্টি কোনো নেতিবাচক পরিস্থিতি তৈরি হোক। তবে দেশ ও দেশের বাইরে সবার কাছে একটি বার্তা যাওয়া দরকার—সেটি হচ্ছে, এটি শেখ হাসিনার সরকার না। এটি জনগণের ম্যান্ডেটপ্রাপ্ত একটি সরকার।’
তিনি আরও যোগ করেন, জনগণের ম্যান্ডেটপ্রাপ্ত সরকারকে দেশের ভেতরে ও বাইরে সব জায়গায় মর্যাদার বিষয়টি মাথায় রেখে চলতে হয় এবং অন্য রাষ্ট্রগুলোকেও এই বাস্তবতা আমলে নিতে হবে।
প্রতিবেশী ভারতের পাশাপাশি অন্য যেকোনো দেশের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে বর্তমান সরকারের নীতি স্পষ্ট করে উপদেষ্টা বলেন, ‘কোনোভাবেই আমরা চাই না কোনো দেশের সঙ্গে খুব খারাপ কোনো পরিস্থিতি হোক, কোনো শত্রুতা তো দূরেই থাকুক। কিন্তু আমাদের একটি গুরুত্বপূর্ণ শর্ত আছে। আমাদের স্লোগানের মধ্যে আছে “সবার আগে বাংলাদেশ”। অর্থাৎ আমরা বাংলাদেশের স্বার্থকে শীর্ষে রাখব।’
তিনি জোর দিয়ে বলেন, ‘কোনো দেশের সঙ্গেই পারস্পরিক স্বার্থ সংশ্লিষ্ট বিষয়ে সম্পৃক্ততা রাষ্ট্রের আত্মসম্মান ও আত্মমর্যাদা বিকিয়ে দিয়ে কিংবা বাংলাদেশের ক্ষতি করে হবে না।’
এই অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনাটি দুই দেশের সম্পর্কের ওপর কোনো বাড়তি চাপ তৈরি করবে কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে জাহেদ উর রহমান বলেন, ‘আমি ব্যক্তিগতভাবে মনে করি এটা নিয়ে চাপ তৈরি করা কোনোভাবেই উচিত না। একটি অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল, সেটার একটা তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া হিসেবে আমি এই পদক্ষেপ নিয়েছি।’
পরবর্তী কূটনৈতিক পদক্ষেপের বিষয়ে তিনি জানান, বিষয়টি এখন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এখতিয়ারে রয়েছে।
‘পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় যা যা করণীয় তা করছে। পররাষ্ট্রমন্ত্রী অলরেডি এটা নিয়ে বক্তব্য দিয়েছেন। তাঁরা ভারতীয় হাই কমিশনের সঙ্গে যোগাযোগ করছেন। সরকার কতটা প্রতিক্রিয়া দেখাবে তা মন্ত্রণালয় নির্ধারণ করবে। তবে আমি আশা করব, এই ঘটনার প্রভাব দুই দেশের ভবিষ্যতের সম্পর্কের ক্ষেত্রে কোনো নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে না,’ বলেন তথ্য উপদেষ্টা।
তিনি বলেন, আমি কূটনৈতিক পাসপোর্ট নিতে কিন্তু বাধ্যও না। ওটা একটা প্রিভিলেজ, হুইচ আই ক্যান অ্যাভেইল। আমি আমার জায়গা থেকে এটা আমি নিতে পারি চাইলে। কিন্তু এটা আমাকে নিতেই হবে এমন কোনো কথা নেই এবং কেউ কেউ বলার চেষ্টা করছেন যে পাসপোর্ট কারণ ছিল, পাসপোর্ট কারণ ছিল না। অন্য কারণ ছিল, এগুলো আপনারা ইন্ডিয়ান মিডিয়াতেও এলেও কম বেশি এসেছে।
প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা বলেন, আমি একটা প্রতিনিধি দলকে নেতৃত্ব দিচ্ছিলাম। আমার সঙ্গে আরও মানুষজন ছিলেন। তারা তাদের ইমিগ্রেশন পার করে চলে গেলেন। আমার ইমিগ্রেশন যখন শুরু হলো, আমি মুহূর্তেই বুঝতে পারলাম তারা (ইমিগ্রেশন কর্তৃপক্ষ) দেরি করছেন, তাদের সময় লাগছে। তারা তারপরে নানান জনের সঙ্গে কথাবার্তা বলছেন। আমাদের হাই কমিশনার প্রথম থেকে আমার সঙ্গে ওখানে ছিলেন, এটা সবচেয়ে জরুরি কথা। আমাদের হাই কমিশনার সম্পর্কেও অনেক কথাবার্তা বলা হয় যে, তার দুর্বলতা, গাফিলতি কিছু ছিল কিনা। আমি এখানে স্পষ্টভাবে বলছি, আমি ওখানে ল্যান্ড করার পর থেকে, শেষে আমি ইন্ডিয়ান টাইম রাত সাড়ে বারোটায় একটা ফ্লাইটে কলম্বো হয়ে ঢাকায় ফিরেছি, কারণ আমি চাইনি ভারতের ইমিগ্রেশন ক্রস করব, সেজন্য আমারও বেশ কিছু ঝুটঝামেলা হয়েছে। পুরো সময়টা হাই কমিশনার পাশে ছিলেন, তিনি তার জায়গা থেকে সলভ করার চেষ্টা করেছেন বিভিন্ন জায়গায় ফোন করে।
‘কিন্তু দুই ঘণ্টার মাথায় আমি ডিসাইড করেছি, ইটস টু মাচ, আমি আসলে আর ঢুকব না এবং এই সময়টাতেও যে আমি, এই রাষ্ট্রের, আমি আবারো বলছি আমি ব্যক্তি না, আমি এই রাষ্ট্রের একটা পদে আছি, সেই পদের প্রতি যে সৌজন্য সেটা ল্যাক করেছে বলে আমার মনে হয়েছে। আর সে কারণেই আমি সিদ্ধান্তটা নিয়েছি।’
