বেনজীরকে ফেরাতে দুদকের নথি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে

✍︎ নাগরিক প্রতিবেদক ✍︎

দুবাই পুলিশের হাতে গ্রেফতার হওয়া বাংলাদেশ পুলিশের বিতর্কিত সাবেক মহাপরিদর্শক (আইজিপি) বেনজীর আহমেদকে দেশে ফিরিয়ে আনতে প্রয়োজনীয় নথিপত্র স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)।

মঙ্গলবার (১৬ জুন) দুপুরে বিষয়টি নিশ্চিত করেন দুদকের উপপরিচালক ও জনসংযোগ কর্মকর্তা আকতারুল ইসলাম।

তিনি জানান, পুলিশ সদর দফতরের ন্যাশনাল সেন্ট্রাল ব্যুরো (এনসিবি)-এর দুই কর্মকর্তার সহায়তায় বেনজীর আহমেদকে দেশে ফেরানোর জন্য প্রয়োজনীয় নথিপত্র প্রস্তুত করা হয়েছে। এসব নথি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে এবং সেগুলো পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে সংযুক্ত আরব আমিরাত সরকারের কাছে পাঠানোর কথা রয়েছে।

দুবাইয়ে গত ১২ জুন গ্রেফতার হওয়ার পর থেকেই বেনজীর আহমেদকে দেশে ফিরিয়ে আনার প্রক্রিয়া শুরু করে দুদক। তার বিরুদ্ধে অবৈধ সম্পদ অর্জন, অর্থপাচার (মানি লন্ডারিং) ও পাসপোর্ট জালিয়াতিসহ বিভিন্ন অভিযোগে ছয়টি মামলা রয়েছে। এর মধ্যে জ্ঞাত-আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের একটি মামলায় ইতোমধ্যে আদালতে অভিযোগপত্র (চার্জশিট) দাখিল করা হয়েছে।

দুদক সূত্র জানায়, বেনজীর আহমেদের বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলাগুলোর তথ্য-প্রমাণ এবং আইনি নথি সংযুক্ত করে একটি আনুষ্ঠানিক অনুরোধপত্র চূড়ান্ত করা হয়েছে, যা তার প্রত্যর্পণ প্রক্রিয়ায় ব্যবহৃত হবে।

সাবেক পুলিশ মহাপরিদর্শক বেনজীর আহমেদকে ফিরিয়ে আনার ব্যাপারে প্রয়োজনীয় নথিপত্র তৈরি শুরু করেছে। বাংলাদেশ এ সংক্রান্ত একটি চিঠিতে আন্তর্জাতিক পুলিশ সংস্থা ইন্টারপোলকে জানানো হয়েছে। সোমবার ইন্টারপোলের সঙ্গে যোগাযোগকারী বাংলাদেশ পুলিশের ন্যাশনাল সেন্ট্রাল ব্যুরোর (এনসিবি) পক্ষ থেকে ওই চিঠি পাঠানো হয়। 

ওই চিঠিতে বলা হয়েছে, প্রয়োজনীয় আইনী প্রক্রিয়া অনুসরন করে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে বাংলাদেশের তরফ থেকে কূটনৈতিক চ্যানেলে চিঠি পাঠানো হবে। রেডনোটিশধারী সাবেক পুলিশ মহাপরিদর্শকে গ্রেফতারের পর এনসিবির পক্ষ থেকে ইন্টারপোলের সংশ্লিষ্ট শাখায় পাঠানো এটিই প্রথম আনুষ্ঠানিক পত্র। 

মঙ্গলবার পুলিশের একটি নির্ভরযোগ্য সূত্র থেকে এই তথ্য পাওয়া গেছে।  

সংশ্লিষ্ট একজন কর্মকর্তা বলেন, বেনজীরকে ফেরানোর জন্য বাংলাদেশ যে কাজ শুরু করেছে, এটি চিঠির মাধ্যমে ইন্টারপোলকে অবহিত হয়েছে। নির্দিষ্ট সময়সীমার আগে পুরো প্রক্রিয়া বাংলাদেশ সম্পন্ন করতে চায়।

গত ১২ জুন সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাইয়ে বেনজীর আহমেদ গ্রেফতার হন। পরে দেশটির সরকার ই-মেইলের মাধ্যমে বাংলাদেশ সরকারকে বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে অবহিত করে। এ বিষয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ গত ১৪ জুন জাতীয় সংসদে বিধি ৩০০-এর অধীনে দেওয়া এক বিবৃতিতে সংসদকে অবহিত করেন।

জানা গেছে, গ্রেফতারের পর ৩০ দিনের মধ্যে প্রত্যর্পণের জন্য আনুষ্ঠানিক অনুরোধ পাঠানোর সুযোগ থাকলেও বাংলাদেশ সরকার বিষয়টিকে গুরুত্ব দিয়ে নির্ধারিত সময়ের অপেক্ষা না করে দ্রুত নথিপত্র পাঠানোর উদ্যোগ নিয়েছে।

বেনজীরের বিরুদ্ধে যত অভিযোগ

সাবেক আইজিপি বেনজীর আহমেদের বিরুদ্ধে ক্ষমতার অপব্যবহার, শত শত কোটি টাকার অবৈধ সম্পদ অর্জন এবং মানি লন্ডারিংয়ের (অর্থ পাচার) গুরুতর অভিযোগ রয়েছে।

দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) মামলা: ২০২৪ সালের ১৫ ডিসেম্বর দুদকের পক্ষ থেকে অবৈধ সম্পদ অর্জন ও তথ্য গোপনের অভিযোগে বেনজীর ও তাঁর পরিবারের সদস্যদের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়।

অভিযোগপত্র বা চার্জশিট: দীর্ঘ অনুসন্ধান শেষে ২০২৫ সালের ৩০ নভেম্বর আদালতে তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দাখিল করে দুদক। তদন্ত প্রতিবেদন অনুযায়ী, বেনজীর তাঁর দাখিল করা সম্পদ বিবরণীতে কয়েক কোটি টাকার সম্পদ গোপন করেছেন এবং তাঁর নামে অন্তত ১১ কোটি ৪ লাখ টাকার অবৈধ সম্পদ পাওয়া গেছে।

আদালতের পরোয়ানা: অভিযোগপত্র গ্রহণের পর চলতি বছরের মার্চ মাসে ঢাকার একটি বিশেষ আদালত তাঁর বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেন। এরপর মে মাসে তাঁর অনুপস্থিতিতেই আদালতে অভিযোগ গঠন করা হয়।

মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগ

রাজধানীর মতিঝিলের শাপলা চত্বরে হেফাজতে ইসলামের সমাবেশ ঘিরে সংঘটিত হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় করা মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলার একজন আসামি বেনজীর আহমেদ। এই ঘটনার সময় ঢাকা মহানগর পুলিশ কমিশনারের দায়িত্বে ছিলেন তিনি।

চিফ প্রসিকিউটর মো.আমিনুল ইসলামের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০১৩ সালের ৫ ও ৬ মে মাসে রাজধানীর মতিঝিলের শাপলা চত্বরে হেফাজতে ইসলামের সমাবেশ ঘিরে ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ, কুমিল্লা ও চট্টগ্রামে ৫৮ জন হত্যাকাণ্ডের বিষয়টি এখন পর্যন্ত নিশ্চিত হওয়া গেছে।

ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহীউদ্দীন খান আলমগীর, সাবেক আইজিপি হাসান মাহমুদ খন্দকারসহ অনেকে এই মামলার আসামি।

আওয়ামী লীগ সরকার আমলে র‍্যাবের টিএফআই সেলে গুম করে রাখার ঘটনায় করা মানবতাবিরোধী অপরাধের আরেকটি মামলায়ও বেনজীর আহমেদ আসামি। এই মামলায় মোট আসামি ১৭ জন। এর মধ্যে ১২ জন সেনা কর্মকর্তা। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১-এ এই মামলায় এখন সাক্ষ্য গ্রহণ চলছে।

মার্কিন নিষেধাজ্ঞা ও পলাতক জীবন

বেনজীর আহমেদ ২০২০ সালের এপ্রিল থেকে ২০২২ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত বাংলাদেশ পুলিশের আইজিপি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এর আগে তিনি র‍্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়নের (র‍্যাব) মহাপরিচালক এবং ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) কমিশনার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন।

যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা: ২০২১ সালের ডিসেম্বরে গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তর ও ট্রেজারি বিভাগ র‍্যাবের সাবেক ও বর্তমান সাত কর্মকর্তার ওপর নিষেধাজ্ঞা দেয়, যার মধ্যে বেনজীর আহমেদের নামও ছিল।

গত ২০২৪ সালের মাঝামাঝি সময়ে তাঁর বিশাল অবৈধ সম্পদের খতিয়ান গণমাধ্যমে আসার পর থেকেই তিনি সপরিবার আত্মগোপনে চলে যান। ধারণা করা হচ্ছিল, তিনি বাংলাদেশ ছেড়ে মধ্যপ্রাচ্য বা ইউরোপের কোনো দেশে আশ্রয় নিয়েছিলেন। পরে তাঁর সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত এবং ব্যাংক হিসাব অবরুদ্ধ করার নির্দেশ দেন আদালত।

বাংলাদেশে ফিরিয়ে আনার প্রক্রিয়া কেমন হবে

বাংলাদেশ ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের মধ্যে কোনো সরাসরি বন্দী প্রত্যর্পণ চুক্তি আছে কি না, তা নিয়ে কূটনৈতিক মহলে আলোচনা চলছে। তবে আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, চুক্তি না থাকলেও ইন্টারপোলের মাধ্যমে এবং দ্বিপক্ষীয় কূটনৈতিক তৎপরতা চালিয়ে কোনো আসামিকে ফিরিয়ে আনা সম্ভব।

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একটি সূত্র জানিয়েছে, বেনজীর আহমেদকে দ্রুত দেশে ফিরিয়ে এনে আদালতে সোপর্দ করার জন্য পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং পুলিশ সদর দপ্তর যৌথভাবে কাজ শুরু করেছে। দুবাইয়ে বাংলাদেশের কনস্যুলেট এ বিষয়ে আমিরাত সরকারের সঙ্গে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রক্ষা করছে।

১৯৮৮ সালে পুলিশে যোগ দেওয়া বেনজীর আহমেদ ২০২০ সালের ১৫ এপ্রিল থেকে ২০২২ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত আইজিপি পদে ছিলেন। এর আগে ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি) কমিশনার এবং র‍্যাবের মহাপরিচালকের দায়িত্ব পালন করেন তিনি।

শেয়ার করতে

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *