✍︎ নাগরিক প্রতিবেদক ✍︎
রাজধানীর ধানমন্ডিতে চিকিৎসক নাফিসা তাবাসসুম ধীপ্রার মৃত্যুর ঘটনায় বারডেম হাসপাতালের কার্ডিয়াক বিভাগের প্রধান ও তাঁর শ্বশুর চিকিৎসক মোহাম্মদ আব্দুর রশীদসহ চারজনের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে।
অবহেলাজনিত মৃত্যুর অভিযোগে ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট জুয়েল রানার আদালতে মামলা দায়ের করেন মো. মশিউর রহমান শাহ নামে মৃতের এক স্বজন।
মামলাটি পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগকে (সিআইডি) তদন্ত করে প্রতিবেদন দাখিলের নির্দেশ দিয়েছেন আদালত। বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন বাদীপক্ষের আইনজীবী ফরহাদ হোসাইন।
মামলার আসামিরা হলেন- ধীপ্রার শ্বশুর ডা. আব্দুর রশীদ, স্বামী ডা. রহমত রশীদ, শাশুড়ি সিদ্দিকা সুলতানা এবং ইয়ার্কির সম্পাদক সিমু নাসের।
মামলার অভিযোগে বলা হয়েছে, পড়াশোনা করার সময় ডা. নাফিসা তাবাসসুম ধীপ্রার সঙ্গে সহপাঠী ডা. রহমত রশীদের প্রেমের সম্পর্ক গড়ে ওঠে এবং পরে তাঁরা বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। তাঁদের সংসারে বর্তমানে দুই বছর বয়সী একটি পুত্রসন্তান রয়েছে। ধীপ্রা অপেক্ষাকৃত কম সচ্ছল পরিবার থেকে আসায় বিয়ের পর থেকে অভিযুক্ত ব্যক্তিরা তাঁর ওপর শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন চালাতে থাকেন। ক্রমাগত মানসিক নির্যাতনের কারণে তিনি তীব্র হতাশায় আক্রান্ত হন এবং সন্তান প্রসবের পর পোস্ট-পার্টাম ডিপ্রেশনসহ উচ্চ রক্তচাপ ও ডায়াবেটিসে ভুগতে থাকেন।
অভিযোগে আরও বলা হয়, অভিযুক্ত ব্যক্তিরা চিকিৎসক হওয়া সত্ত্বেও ডা. ধীপ্রার চিকিৎসার খরচ না দিয়ে ইচ্ছাকৃতভাবে অবহেলা করেন। এমনকি তাঁর এফসিপিএস পরীক্ষার প্রস্তুতি গ্রহণেও আসামিরা অন্যায়ভাবে বাধা দেন। মৃত্যুর কিছুদিন আগে ডা. ধীপ্রা ‘ফিমেল ডক্টরস ইন বাংলাদেশ’ নামে একটি ফেসবুক গ্রুপেও তাঁর ওপর হওয়া পারিবারিক নির্যাতনের কথা পোস্ট করেছিলেন বলে মামলায় উল্লেখ করা হয়।
অভিযোগে বাদী বলেন, ২ জুন থেকে একাধারে তিন দিন আসামিরা ডা. ধীপ্রাকে রুমে তালাবদ্ধ করে রাখেন। এই তিন দিন তাঁকে কোনো খাবার দেওয়া হয়নি এবং তাঁর দুই বছরের সন্তানকেও দেখতে দেওয়া হয়নি। ৪ জুন খবর পেয়ে ডা. ধীপ্রার মা ধানমন্ডির ‘বসতি গ্রিন’ আবাসন এলাকার ৪/এ রোডের ৪৩ নম্বর ফ্ল্যাটে যান। সেখানে মেয়েকে তালাবদ্ধ অবস্থায় দেখে তালা খুলে দেওয়ার অনুরোধ করলে ধীপ্রার স্বামী তালা খুলে দেন। ঘর থেকে মুক্ত হয়েই ডা. ধীপ্রা তাঁর মাকে জড়িয়ে ধরে বলেন, ‘মা, আমি ভাত খাব।’ এই কথা বলার পরপরই তিনি ঘরের মেঝেতে লুটিয়ে পড়েন।
মামলার অভিযোগে আরও বলা হয়, ডা. ধীপ্রা মাটিতে লুটিয়ে পড়ার পর তাৎক্ষণিকভাবে তাঁকে কোনো হাসপাতালে না নিয়ে আসামিরা ইচ্ছাকৃতভাবে বিলম্ব করতে থাকেন। পরে তাঁর শ্বশুর ডা. মোহাম্মদ আব্দুর রশীদের প্রভাব ব্যবহার করে চিকিৎসার নামে দূরবর্তী বারডেম হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার পথে তাঁর মৃত্যু হয়। মৃত্যুর পর অপরাধ ধামাচাপা দেওয়ার উদ্দেশ্যে আসামিরা তাঁদের ক্ষমতার প্রভাব খাঁটিয়ে কোনো ধরনের ময়নাতদন্ত ছাড়াই তড়িঘড়ি করে একটি মিথ্যা ডেথ সার্টিফিকেট ইস্যু করান এবং তড়িঘড়ি দাফন সম্পন্ন করেন। এটি ডা. ধীপ্রার স্বাভাবিক মৃত্যু নয়, বরং সুপরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড এবং আলামত ধ্বংসের একটি চেষ্টা।
বাদীপক্ষের আইনজীবী ফরহাদ হোসাইন বলেন, আসামিরা প্রভাবশালী হওয়ায় এবং নিহতের বাবা-মা ধর্মভীরু ও অসহায় হওয়ায় শুরুতে আইনি পদক্ষেপ নিতে বিলম্ব হয়েছে। তিনি জানান, আদালতের কাছে আসামিদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ, গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি এবং ঘটনার সুষ্ঠু তদন্তের আবেদন করা হয়েছে।
