যুক্তরাষ্ট্র-ইরানের ১৪ দফা চুক্তিতে কী আছে

✍︎ নাগরিক নিউজ ডেস্ক ✍︎

যুক্তরাষ্ট্র বা ইরান কেউই এখন পর্যন্ত চুক্তির পূর্ণাঙ্গ নথি প্রকাশ করেনি। মার্কিন সংবাদমাধ্যম ব্লুমবার্গ এবং সৌদি সংবাদমাধ্যম আল আরাবিয়া যে নথি প্রকাশ করেছে, তাতে তারা চুক্তিটিকে ১৪ দফার খসড়া চুক্তি বলে দাবি করছে।

  • চুক্তিতে বলা হয়েছে, ‘লেবাননসহ সব ফ্রন্টে যুদ্ধের অবিলম্বে এবং স্থায়ী সমাপ্তি’ ঘটবে। একই সঙ্গে উভয় পক্ষ অঙ্গীকার করবে যে ‘এখন থেকে তারা একে অপরের বিরুদ্ধে কোনো শত্রুতামূলক পদক্ষেপ নেবে না।’
  • যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বন্দরগুলোর ওপর আরোপিত নৌ অবরোধ তুলে নেবে এবং ‘চূড়ান্ত চুক্তি হওয়ার পর ৩০ দিনের মধ্যে আশপাশের অঞ্চলগুলো থেকে নিজেদের বাহিনী প্রত্যাহার করার প্রতিশ্রুতি দেবে’।
  • ইরান ‘অবিলম্বে পদক্ষেপ নেবে’ যাতে হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল ও ট্রানজিট পুনরায় সম্ভব হয়।
  • যুক্তরাষ্ট্র ও তার আঞ্চলিক অংশীদাররা ইরানের ‘পুনর্বাসন ও অর্থনৈতিক উন্নয়ন’ নিয়ে একটি ‘সমন্বিত পরিকল্পনা’ তৈরি করবে এবং অন্তত ৩০০ বিলিয়ন ডলারের অর্থায়ন নিশ্চিত করবে।
  • যুক্তরাষ্ট্র ইরানের ওপর আরোপিত ‘সব ধরনের নিষেধাজ্ঞা’ প্রত্যাহারের প্রতিশ্রুতি দেবে, যার মধ্যে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের নিষেধাজ্ঞাও থাকবে। তবে এটি ‘চূড়ান্ত চুক্তির অংশ হিসেবে সম্মত হওয়া সময়সূচি অনুযায়ী’ কার্যকর হবে।
  • ইরান ‘পুনর্ব্যক্ত করবে যে তারা কখনোই পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করবে না’। সমৃদ্ধ (এনরিচড) পারমাণবিক উপাদানের ভবিষ্যৎ এবং সংশ্লিষ্ট অন্যান্য বিষয় চূড়ান্ত চুক্তিতে নির্ধারণ করা হবে।
  • নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার কার্যকর হওয়ার দিন পর্যন্ত ইরানের তেল রপ্তানির জন্য যুক্তরাষ্ট্র ছাড়পত্র (ওয়েভার) দেবে।
  • যুক্তরাষ্ট্র প্রতিশ্রুতি দেবে যে ‘চূড়ান্ত চুক্তির দিকে আলোচনার অগ্রগতির আলোকে’ ইরানের জব্দ বা স্থগিত রাখা তহবিল ও সম্পদ মুক্ত করে দেওয়া হবে।

এদিকে, চুক্তির বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স ফক্স নিউজকে বলেছেন, ইরান ‘বাস্তব সুবিধা’ পেতে পারে, তবে সেটি তখনই সম্ভব হবে যদি দেশটি ‘মৌলিকভাবে নিজেদের বদলে ফেলবে’। ভ্যান্স বলেন, ‘চুক্তিটি আসলে খুবই সহজ। প্রথমত, ইরান পারমাণবিক অস্ত্র রাখতে পারবে না। দ্বিতীয়ত, হরমুজ প্রণালি উন্মুক্ত থাকবে। আর তৃতীয়ত, ইরান যদি নিয়ম মেনে চলে, তাহলে তারা অনেক ধরনের সুবিধা পেতে পারে, যেগুলো এই চুক্তিতে বিবেচনা করা হয়েছে।’

ভ্যান্স আরও বলেন, ‘যদি তারা সন্ত্রাসবাদে অর্থায়ন বন্ধ করে, যদি তারা পারমাণবিক অস্ত্র কর্মসূচি পুনর্গঠনে সমর্থন দেওয়া বন্ধ করে, তাহলে তারা সত্যিকারের কিছু সুবিধা পেতে পারে। আর যদি তারা এসবের কিছুই না করে, তাহলে তারা কিছুই পাবে না।’ ভ্যান্স যোগ করেন, ‘যেভাবেই হোক, যুক্তরাষ্ট্র লাভবান হবে।’

অপর দিকে, শিল্পোন্নত দেশগুলোর জোট জি-৭ নেতারা যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে হওয়া এই চুক্তির ঘোষণাকে স্বাগত জানিয়েছেন। তাঁরা একে ‘একটি বড় অগ্রগতি’ এবং ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন থেকে বিরত রাখার ‘সুযোগ’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। নেতারা বলেন, তাঁরা এই চুক্তিকে সমর্থন করেন এবং ‘বাস্তবায়নে অবদান রাখতে প্রস্তুত।’

তাঁরা হরমুজ প্রণালিতে কোনো ধরনের ‘নিষেধাজ্ঞা বা টোল ছাড়া’ অবাধ চলাচলের আহ্বান জানান। একই সঙ্গে তাঁরা এই চুক্তির পরবর্তী ধাপে একটি ‘শক্তিশালী ও বিস্তৃত কূটনৈতিক পরবর্তী চুক্তি’র প্রতি দৃঢ় সমর্থন জানান, যার লক্ষ্য হবে ‘অঞ্চলের সবার জন্য শান্তি ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা’।

লেবাননের বিষয়ে জি-৭ নেতারা ‘তাৎক্ষণিক ও কার্যকর যুদ্ধবিরতি’র প্রতি সমর্থন জানান এবং হিজবুল্লাহকে নিরস্ত্র করার জন্য লেবানন রাষ্ট্রের প্রচেষ্টার পক্ষেও অবস্থান নেন। ফিলিস্তিন প্রসঙ্গে তাঁরা প্রতিশ্রুতি দেন, গাজায় ‘মানবিক সহায়তা ও পুনর্গঠন কার্যক্রম দ্রুততর করা হবে এবং সংশ্লিষ্ট রাজনৈতিক ও নিরাপত্তাবিষয়ক পদক্ষেপ দ্রুত বাস্তবায়ন করা হবে’। একই সঙ্গে তাঁরা পশ্চিম তীরে চলমান ‘সহিংসতা’ বন্ধের আহ্বান জানান।

মঙ্গলবার জি৭ সম্মেলনে আবারও লেবাননে ইসরায়েলি আগ্রাসনের সমালোচনা করেন ট্রাম্প। তিনি বলেন, দেশটিতে ইসরায়েলের অভিযানের কারণে অনেক প্রাণহানি হচ্ছে। তাই তিনি বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুকে পরামর্শ দিয়েছেন, তেল আবিব যদি প্রাণহানি ছাড়াই হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে অভিযান চালাতে না পারে তাহলে সিরিয়া ব্যবস্থা নেবে।

সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট আহমেদ আল-শারার প্রশংসা করে ট্রাম্প বলেন, শারা অসাধারণ কাজ করছেন। হিজবুল্লাহকে সামলাতে ইসরায়েল যদি ব্যর্থ হয়, তাহলে শারা কাজটি করবেন। সিরিয়া কাজটি করবে। ২০২৪ সালে বাশার আল-আসাদকে ক্ষমতাচ্যুত করে সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট হন আল-শারা। তিনি এক সময় আল কায়দা ঘনিষ্ঠ সন্ত্রাসী সংগঠন হায়াত তাহরির আল-শামের নেতা ছিলেন। গত বছরের জুলাইয়ে ওয়াশিংটন তাহরির আল-শামকে সন্ত্রাসী সংগঠনের তালিকা থেকে বাদ দেয়। 

ইরানের ঘনিষ্ঠ মিত্র বাশার আল আসাদের বিরুদ্ধে সিরিয়ার যেসব সশস্ত্র গোষ্ঠী গৃহযুদ্ধ শুরু করেছিল, সেগুলোর মধ্যে অন্যতম তাহরির আল-শাম। ওই যুদ্ধে ২০১৩ সালে আসাদ বাহিনীর পক্ষে অংশ নিয়েছিল ইরান সমর্থিত হিজবুল্লাহর সামরিক শাখা ‘আইআরএল’। ডোনাল্ড ট্রাম্প সেই হিজবুল্লাহকে মোকাবিলায় এবার তাহরির আল-শামের সাবেক নেতা আল-শারাকে কাজে লাগাতে চাইছেন, যা অঞ্চলটিতে নতুন করে অস্থিরতা সৃষ্টির শঙ্কা জাগাচ্ছে।

সিরিয়ার ক্ষমতায় বসার পর গত বছর ওয়াশিংটনে গিয়ে ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে বৈঠক করেছিলেন আল-শারা। তখন কূটনৈতিক সূত্রের বরাত দিয়ে এএফপিতে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, মানবিক সহায়তা কার্যক্রম সমন্বয় এবং সিরিয়া ও ইসরায়েলের মধ্যকার পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণের জন্য যুক্তরাষ্ট্র দামেস্কের কাছে একটি সামরিক ঘাঁটি স্থাপনের পরিকল্পনা করছে।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, ট্রাম্পের প্রত্যাশা– সিরিয়া আব্রাহাম চুক্তির আওতায় ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করবে। ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে শারা নিজেও বলেছিলেন, ইসরায়েলের সঙ্গে উত্তেজনা কমাতে তিনি একটি নিরাপত্তা চুক্তি চান। একই বছরের ডিসেম্বর থেকে ইসরায়েল জাতিসংঘ নিয়ন্ত্রিত বাফার জোনে (সিরিয়া সীমান্তবর্তী) সেনা মোতায়েন করে। পাশাপাশি সিরিয়ায় বেশ কয়েক দফায় হামলা করে। কিন্তু দামেস্ক কোনো পাল্টা জবাব দেয়নি।

বিশ্লেষকরা সতর্ক করে বলছেন, লেবাননে কোনো ধরনের সংঘাত ইরান-যুক্তরাষ্ট্রের কূটনৈতিক সম্পর্কোন্নয়ন প্রক্রিয়ার জন্য বড় হুমকি হয়ে উঠতে পারে। মিডল ইস্ট ইনস্টিটিউটের জ্যেষ্ঠ ফেলো রস হ্যারিসন মঙ্গলবার এএফপিকে বলেন, সংঘাতের এই ক্ষেত্র আসন্ন আলোচনায় শেষ পর্যন্ত সবচেয়ে বড় বাধা হয়ে উঠতে পারে।

রয়টার্স বলছে, ইরান যুদ্ধ শুরুর সময় নেতানিয়াহু ও ট্রাম্প যে দুটি বিষয়কে হামলার অন্যতম কারণ হিসেবে তুলে ধরেছিলেন, সেগুলো হলো– ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি সীমিত করা এবং আঞ্চলিক সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর প্রতি সমর্থন বন্ধ করা। কিন্তু এগুলো আসন্ন আলোচনার বিষয়বস্তু বলে মনে হচ্ছে না।

অন্তত ৬০ দিনের আলোচনা পর্বটি শুরু হওয়ার কথা সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের পর। মূলত এই আলোচনার ওপর ভিত্তি করে চূড়ান্ত চুক্তি হবে। আব্বাস আরাঘচি মঙ্গলবার বলেন, চূড়ান্ত চুক্তিতে পারমাণবিক কর্মসূচি ও নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার নিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।

ইরানের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করার বিষয়টিকে ইসরায়েল নিজেদের নিরাপত্তার হুমকি হিসেবে মনে করে। দ্য নিউইয়র্ক টাইমসকে ট্রাম্প বলেছেন, ইরান ২০ বছরের জন্য ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ স্থগিত রাখবে কিনা, সে বিষয়ে এখনও আলোচনা চলছে। একই সঙ্গে তিনি ইঙ্গিত দেন, ২০ বছরের বদলে ১৫ বছরের ব্যবস্থাও মেনে নিতে পারেন।

মূল সমস্যার সমাধান নিয়ে এখনও স্পষ্ট তথ্য প্রকাশ করা না হলেও ইরানের অতিরক্ষণশীল দৈনিক ভাতান-ই এমরুজ সম্ভাব্য সমঝোতাকে ট্রাম্পের ‘আত্মসমর্পণের দলিল’ বলে বর্ণনা করেছে। তবে মঙ্গলবার আব্বাস আরাঘচি তাঁর বক্তব্যে বেশ সতর্ক ছিলেন। তিনি বলেন, প্রতিশ্রুতি ভঙ্গের দীর্ঘ ইতিহাস আছে। চুক্তি ছিঁড়ে ফেলার ইতিহাসও আছে। তেহরান সেগুলো ভুলে যায়নি।

ইসরায়েলের বার-ইলান বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও রাজনীতি বিশ্লেষক জোনাথন রাইনহোল্ড রয়টার্সকে বলেছেন, এই সমঝোতা চুক্তিকে বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ইসরায়েলি জনগণের কাছে গ্রহণযোগ্য করে তুলতে পারবেন না। তিনি বরং চূড়ান্ত চুক্তি বাধাগ্রস্ত হওয়ার প্রত্যাশা এবং সমঝোতায় স্বাক্ষরের ৬০ দিনের মধ্যে আবার যুদ্ধ শুরু করতে পারেন। এই উদ্যোগকে তখন ইসরায়েলিদের স্বার্থ রক্ষার পদক্ষেপ হিসেবে তুলে ধরা হতে পারে।

ইসরায়েলের জ্বালানিমন্ত্রী এলি কোহেনের কথাতেও এমন ইঙ্গিত আছে। রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম ‘কান’-এ তিনি বলেন, ইরান যদি আবার পারমাণবিক ও ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা বাড়ায়, তাহলে ইসরায়েল একাই (যুক্তরাষ্ট্রকে ছাড়া) পদক্ষেপ নিতে প্রস্তুত থাকবে।

শেয়ার করতে

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *