✍︎ নাগরিক প্রতিবেদক ✍︎
বিতর্কিত সাবেক আইজিপি বেনজীর আহমেদকে দেশে ফিরিয়ে আনতে ও চলমান আইনি প্রক্রিয়াকে ঘিরে বাংলাদেশ থেকে একটি উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধি দল দুবাই পৌঁছেছে।
বেনজীর আহমেদকে দুবাই আল আওয়ার কেন্দ্রীয় কারাগারে পাঠানো হয়েছে বলে জানা গেছে।
বেনজীর আহমেদের জামিনের জন্য মঙ্গলবার (১৬ জুন) দুবাই কোর্ট অব আপিলে তার আইনজীবী আবেদন দাখিল করেন। এ সময় বাংলাদেশ থেকে যাওয়া প্রতিনিধি দল একই আদালতে তাকে দেশে ফিরিয়ে আনার জন্য আলাদা আরেকটি আবেদন করেন।
আবেদন যাচাই-বাছাই করে আদালত কোনো সিদ্ধান্ত না দিয়ে উভয় পক্ষের কাগজপত্র যাচাই-বাছাই এবং দুবাইয়ের আইনানুগ বিষয় পর্যালোচনার জন্য আদালত সময় নিয়েছে। এ প্রক্রিয়ায় ১০-১৫ দিন বা তারও বেশি সময় লাগতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
ইন্টারপোলের দাখিল করা অভিযোগ এবং দুবাইয়ে অবস্থানের কারণসহ জামিনে মুক্তির জন্য সব ধরনের কাগজপত্র মঙ্গলবার দুবাইয়ের অফিসিয়াল সময়ের শুরুতেই পাবলিক প্রসিকিউটরের কাছে লিখিতভাবে জমা দেওয়া হয়।
আবেদন আদালত গ্রহণ করলেও জামিনের বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত দেয়নি। চুড়ান্ত শুনানির জন্য দিন ধার্য করে জানিয়ে দেওয়া হবে। তবে এর আগেই অর্থাৎ আগামী সাত দিনের মধ্যে তাকে জামিনে মুক্ত করার জন্য সব ধরনের চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে বলে দাবি করেছে বেনজীর আহমেদের আইনজীবী।
এদিকে বেনজীর আহমেদকে বাংলাদেশে ফিরিয়ে আনতে বাংলাদেশ থেকে কমপক্ষে পাঁচ সদস্যের একটি প্রতিনিধি দল ইতোমধ্যে দুবাই পৌঁছেছে। এনসিবি (ন্যাশনাল সেন্ট্রাল ব্যুরো) বা ইন্টারপোলের কর্মকর্তার নেতৃত্বে পুলিশ সদর দপ্তরের তিনজন এবং দেশের আলাদা দুটি গোয়েন্দা সংস্থার দুইজন সদস্য দুবাই গিয়ে মঙ্গলবার আদালতে বেনজীর আহমেদকে বাংলাদেশে ফিরিয়ে আনার পক্ষে বিভিন্ন অভিযোগ ও দুদকের মামলাসহ ইন্টারপোল নোটিশ-সংক্রান্ত সব কাগজপত্র জমা দিয়েছেন। দুবাইয়ের আদালতের পাশাপাশি প্রতিনিধি দলটি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আইনি প্রক্রিয়া ও নথিপত্র যাচাই-বাছাই কার্যক্রমে অংশ নিবে।
বেনজীর আহমেদের বাংলাদেশি আইনজীবীর কাছে দুবাইয়ের আইনজীবী ও বিচারকের নাম জানতে চাইলে তিনি বলেন, দুবাইয়ের পুলিশ ও বিচারব্যবস্থা অন্যান্য দেশের তুলনায় কঠোরভাবে পরিচালিত হয়। ফলে অনেক বিষয়ই গণমাধ্যমে প্রকাশ করা সম্ভব নয়।
পুলিশের একজন অতিরিক্ত আইজিপির কাছে দুবাইয়ে বেনজীর আহমেদের আগামী দিনগুলোতে কী হতে পারে জানতে চাইলে তিনি বলেন, বাংলাদেশ সরকার যেমন দুবাই থেকে বেনজীর আহমেদকে দেশে ফিরিয়ে আনার সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছে, একটি প্রতিনিধিদল দুবাই গেছেন, তেমনি তাকে জামিনে মুক্ত করার চেষ্টাও চলছে। তবে আগামী ১০ দিনের মধ্যে এ বিষয়ে দুবাই আদালত একটি সিদ্ধান্ত জানাবে।
দুবাই দূতাবাসে একসময় কর্মরত ছিলেন এমন এক ব্যক্তির সঙ্গে এ বিষয়ে কথা হলে তিনি দুবাইয়ের আইনি প্রক্রিয়ার বিষয়ে বলেন, গ্রেফতার হওয়া ব্যক্তিকে প্রথমে দুবাই পুলিশের হেফাজতে রাখা হয়। এরপর সাধারণত ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে তাকে দুবাই পাবলিক প্রসিকিউশনে পাঠানো হয়। সেখানে প্রসিকিউশন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির পরিচয়, ইন্টারপোলের রেড নোটিশের বৈধতা এবং অভিযোগকারী রাষ্ট্রের পাঠানো নথিপত্র যাচাই করে।
প্রাথমিক যাচাই শেষে মামলাটি পাঠানো হয় দুবাই কোর্ট অব আপিলে। সংযুক্ত আরব আমিরাতের ২০০৬ সালের ৩৯ নম্বর ফেডারেল আইন (আন্তর্জাতিক বিচারিক সহযোগিতা আইন) অনুযায়ী, প্রত্যর্পণ সংক্রান্ত মামলার প্রাথমিক শুনানির এখতিয়ার এই আদালতের। আপিল আদালতের রায়ে কোনো পক্ষ অসন্তুষ্ট হলে তারা সর্বোচ্চ আদালত কোর্ট অব ক্যাসেশনে আপিল করার সুযোগ পায়।
জামিনের বিষয়ে তিনি বলেন, ইন্টারপোল-সংক্রান্ত প্রত্যর্পণ মামলায় সাধারণত অভিযুক্ত ব্যক্তির পাসপোর্ট জব্দ করা হয়। পাশাপাশি দুবাইয়ে বসবাসরত কোনো নির্ভরযোগ্য বা প্রভাবশালী আমিরাতি নাগরিককে জামিনদার হিসেবে উপস্থাপন করতে হতে পারে। অনেক ক্ষেত্রে আদালতের নির্দেশে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ অর্থের বন্ড বা মুচলেকাও জমা দিতে হয়, যাতে নিশ্চিত হওয়া যায় যে অভিযুক্ত পালিয়ে যাবেন না।
অন্যদিকে মামলাটি আদালতে বিচারাধীন থাকলে কোর্ট অব আপিল বা কোর্ট অব ক্যাসেশনের সংশ্লিষ্ট বিচারকের কাছে শুনানির দিন বা তার আগেই জামিনের আবেদন করা যায়।
আদালত যদি প্রত্যর্পণের পক্ষে মত দেন, তবুও অভিযুক্তকে সঙ্গে সঙ্গে সংশ্লিষ্ট দেশের কাছে হস্তান্তর করা হয় না। আদালতের রায়ের পরও প্রত্যর্পণের চূড়ান্ত প্রশাসনিক অনুমোদন দেয় সংযুক্ত আরব আমিরাতের বিচার মন্ত্রণালয় বা সংশ্লিষ্ট কার্যনির্বাহী কর্তৃপক্ষ। তাদের অনুমোদনের পরই প্রত্যর্পণ কার্যকর হয়।
দুবাইয়ে বাংলাদেশের প্রতিনিধি দল যাওয়ার বিষয়ে আইজিপি, এআইজি মিডিয়াসহ এনসিবি শাখার কর্মকর্তাদের একাধিকবার যোগাযোগ করার চেষ্টা করা হলেও কাউকে মোবাইল ফোনে পাওয়া যায়নি। পরে পুলিশের অতিরিক্ত আইজিপি (অ্যাডমিন) একেএম আওলাদ হোসেনের কাছে এ বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, এই বিষয়টি আমার জানা নেই।
বেনজীরের বিরুদ্ধে যত অভিযোগ
সাবেক আইজিপি বেনজীর আহমেদের বিরুদ্ধে ক্ষমতার অপব্যবহার, শত শত কোটি টাকার অবৈধ সম্পদ অর্জন এবং মানি লন্ডারিংয়ের (অর্থ পাচার) গুরুতর অভিযোগ রয়েছে।
দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) মামলা: ২০২৪ সালের ১৫ ডিসেম্বর দুদকের পক্ষ থেকে অবৈধ সম্পদ অর্জন ও তথ্য গোপনের অভিযোগে বেনজীর ও তাঁর পরিবারের সদস্যদের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়।
অভিযোগপত্র বা চার্জশিট: দীর্ঘ অনুসন্ধান শেষে ২০২৫ সালের ৩০ নভেম্বর আদালতে তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দাখিল করে দুদক। তদন্ত প্রতিবেদন অনুযায়ী, বেনজীর তাঁর দাখিল করা সম্পদ বিবরণীতে কয়েক কোটি টাকার সম্পদ গোপন করেছেন এবং তাঁর নামে অন্তত ১১ কোটি ৪ লাখ টাকার অবৈধ সম্পদ পাওয়া গেছে।
আদালতের পরোয়ানা: অভিযোগপত্র গ্রহণের পর চলতি বছরের মার্চ মাসে ঢাকার একটি বিশেষ আদালত তাঁর বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেন। এরপর মে মাসে তাঁর অনুপস্থিতিতেই আদালতে অভিযোগ গঠন করা হয়।
মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগ
রাজধানীর মতিঝিলের শাপলা চত্বরে হেফাজতে ইসলামের সমাবেশ ঘিরে সংঘটিত হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় করা মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলার একজন আসামি বেনজীর আহমেদ। এই ঘটনার সময় ঢাকা মহানগর পুলিশ কমিশনারের দায়িত্বে ছিলেন তিনি।
চিফ প্রসিকিউটর মো.আমিনুল ইসলামের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০১৩ সালের ৫ ও ৬ মে মাসে রাজধানীর মতিঝিলের শাপলা চত্বরে হেফাজতে ইসলামের সমাবেশ ঘিরে ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ, কুমিল্লা ও চট্টগ্রামে ৫৮ জন হত্যাকাণ্ডের বিষয়টি এখন পর্যন্ত নিশ্চিত হওয়া গেছে।
ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহীউদ্দীন খান আলমগীর, সাবেক আইজিপি হাসান মাহমুদ খন্দকারসহ অনেকে এই মামলার আসামি।
আওয়ামী লীগ সরকার আমলে র্যাবের টিএফআই সেলে গুম করে রাখার ঘটনায় করা মানবতাবিরোধী অপরাধের আরেকটি মামলায়ও বেনজীর আহমেদ আসামি। এই মামলায় মোট আসামি ১৭ জন। এর মধ্যে ১২ জন সেনা কর্মকর্তা। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১-এ এই মামলায় এখন সাক্ষ্য গ্রহণ চলছে।
মার্কিন নিষেধাজ্ঞা ও পলাতক জীবন
বেনজীর আহমেদ ২০২০ সালের এপ্রিল থেকে ২০২২ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত বাংলাদেশ পুলিশের আইজিপি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এর আগে তিনি র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়নের (র্যাব) মহাপরিচালক এবং ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) কমিশনার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন।
যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা: ২০২১ সালের ডিসেম্বরে গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তর ও ট্রেজারি বিভাগ র্যাবের সাবেক ও বর্তমান সাত কর্মকর্তার ওপর নিষেধাজ্ঞা দেয়, যার মধ্যে বেনজীর আহমেদের নামও ছিল।
গত ২০২৪ সালের মাঝামাঝি সময়ে তাঁর বিশাল অবৈধ সম্পদের খতিয়ান গণমাধ্যমে আসার পর থেকেই তিনি সপরিবার আত্মগোপনে চলে যান। ধারণা করা হচ্ছিল, তিনি বাংলাদেশ ছেড়ে মধ্যপ্রাচ্য বা ইউরোপের কোনো দেশে আশ্রয় নিয়েছিলেন। পরে তাঁর সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত এবং ব্যাংক হিসাব অবরুদ্ধ করার নির্দেশ দেন আদালত।
বাংলাদেশে ফিরিয়ে আনার প্রক্রিয়া কেমন হবে
বাংলাদেশ ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের মধ্যে কোনো সরাসরি বন্দী প্রত্যর্পণ চুক্তি আছে কি না, তা নিয়ে কূটনৈতিক মহলে আলোচনা চলছে। তবে আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, চুক্তি না থাকলেও ইন্টারপোলের মাধ্যমে এবং দ্বিপক্ষীয় কূটনৈতিক তৎপরতা চালিয়ে কোনো আসামিকে ফিরিয়ে আনা সম্ভব।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একটি সূত্র জানিয়েছে, বেনজীর আহমেদকে দ্রুত দেশে ফিরিয়ে এনে আদালতে সোপর্দ করার জন্য পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং পুলিশ সদর দপ্তর যৌথভাবে কাজ শুরু করেছে। দুবাইয়ে বাংলাদেশের কনস্যুলেট এ বিষয়ে আমিরাত সরকারের সঙ্গে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রক্ষা করছে।
১৯৮৮ সালে পুলিশে যোগ দেওয়া বেনজীর আহমেদ ২০২০ সালের ১৫ এপ্রিল থেকে ২০২২ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত আইজিপি পদে ছিলেন। এর আগে ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি) কমিশনার এবং র্যাবের মহাপরিচালকের দায়িত্ব পালন করেন তিনি।
