✍︎ নাগরিক প্রতিবেদক ✍︎
সারা দেশে গত ছয় মাসে অন্তত ১৬৪ শিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছে। এর মধ্যে ২৪টি ঘটনায় ধর্ষণের পর হত্যার শিকার হয়েছে।
সবচেয়ে বেশি শিশু ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে চট্টগ্রাম জেলায় ৩৭টি। বিভাগের হিসাবে সবচেয়ে বেশি ঢাকায় ৪৯টি। ১৬৪ জনের মধ্যে ১১৭ জনের বয়স ১০ বছরের নিচে। অন্যদিকে ৭৬টি ৪৪ শতাংশ ঘটনায় পরিবার, আত্মীয় বা পরিচিতজনেরা জড়িত এবং ৮৮ জন ক্ষেত্রে জড়িত অপরিচিতরা।
মোট ১৫৬টি ঘটনায় ধর্ষণের শিকার হয়েছে এই ১৬৪ শিশু। কোনো কেনো ঘটনার ভুক্তভোগী একাধিক শিশু।
অভিযুক্তদের পরিচয় বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ৭৬টি শিশু ধর্ষণের ঘটনায় পরিবার, আত্মীয় বা পরিচিতরা জড়িত। অর্থাৎ ৪৪ শতাংশ ঘটনা ঘটিয়েছেন পরিচিতজনেরা। অন্যদিকে ৮৮ জন অভিযুক্ত ভুক্তভোগী শিশু বা তার পরিবারের কাছে আগে থেকে সম্পূর্ণ অপরিচিত ছিল। এই হার মোট অভিযুক্তের ৫৬ শতাংশ। অর্থাৎ অর্ধেকেরও বেশি ঘটনায় সম্পূর্ণ অজানা ব্যক্তির হাতে শিশুরা নির্যাতনের শিকার হয়েছে।
মোট ঘটনার ৪৪ শতাংশেই অভিযুক্ত ছিলেন শিশুর পরিচিত কেউ। এর মধ্যে নিকটাত্মীয় ও প্রতিবেশীর নাম এসেছে ৩৬টি ঘটনায়, যা মোট ঘটনার ২৩ শতাংশ। স্কুল-মাদ্রাসার শিক্ষক ও ইমামদের নাম এসেছে ৩২টি ঘটনায়, যা ২১ শতাংশ।
এই পরিসংখ্যান বলছে, রাস্তাঘাট বা অজানা পরিবেশের পাশাপাশি ঘর, পাড়া-মহল্লা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, কোনোটিই আর শিশুদের জন্য সম্পূর্ণ নিরাপদ নয়।
১৬৪টি ঘটনার মধ্যে ২৪টিতে ধর্ষণের পর শিশুকে হত্যা করা হয়েছে। প্রতি সাতটি ঘটনার একটিতে শিশুকে জীবন দিতে হয়েছে। হত্যার শিকার এই ২৪ শিশুর বেশির ভাগই ছিল ৯ বছরের কম বয়সি। সবচেয়ে কম বয়সি তিন শিশুর বয়স ছিল মাত্র চার বছর।
হত্যাকাণ্ডের ঘটনাগুলোর দুই-তৃতীয়াংশ, অর্থাৎ ১৬টিতে অভিযুক্ত ব্যক্তি শিশু বা তার পরিবারের কাছে সম্পূর্ণ অপরিচিত ছিল। বাকি আটটি ঘটনায় সৎবাবা, দুলাভাই বা পরিবারের অন্য সদস্যরা অভিযুক্ত। অর্থাৎ পরিবারের ভেতরেও শিশু সম্পূর্ণ নিরাপদ নয়।
১৬৪ জন ভুক্তভোগীর মধ্যে ১১৭ জনই ১০ বছরের কম বয়সি। এই হার ৭১ শতাংশ বা প্রতি চারজনে তিনজন।
পাঁচ বছরের কম বয়সি শিশুরাও এই নৃশংসতা থেকে রেহাই পায়নি। এই বয়সের ২২ জন শিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছে, যা মোট ভুক্তভোগীর ১৩ শতাংশ। অন্যদিকে ১১ থেকে ১৪ বছর বয়সি ভুক্তভোগীর সংখ্যা ৩৭ জন, যা প্রতি চারজনে একজন।
লিঙ্গভিত্তিক তথ্যে দেখা গেছে, ৮৭ জন কন্যাশিশু এবং ৪৩ জন ছেলেশিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছে। মোট ভুক্তভোগীর ৫৩ শতাংশ কন্যাশিশু এবং ২৬ শতাংশ ছেলেশিশু। বাকি ৩৪ জনের ক্ষেত্রে গণমাধ্যমে লিঙ্গপরিচয় উল্লেখ ছিল না।
ছয় মাসে মোট ৪৩টি বলাৎকারের ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে। এর মধ্যে ২৬টিতেই অভিযুক্ত ছিলেন মাদ্রাসা শিক্ষক বা মসজিদের ইমাম। অর্থাৎ ৬০ শতাংশ বলাৎকারের ঘটনায় ধর্মীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বা উপাসনালয়ের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা অভিযুক্ত।
পরিবারের সদস্য বা নিকট আত্মীয়ের বিরুদ্ধে অভিযোগ এসেছে পাঁচটি ঘটনায়। বাকি ১২টিতে অভিযুক্ত ছিল সম্পূর্ণ অপরিচিত ব্যক্তি।
ধর্মীয় শিক্ষার জন্য যেসব শিশুকে মাদ্রাসা বা মসজিদে পাঠানো হচ্ছে, তাদের একটি অংশ সেখানেই যৌন নির্যাতনের শিকার হচ্ছে। এটি সমাজের গভীরে বিদ্যমান বিশ্বাস ও আস্থার সংকটকে আরও স্পষ্ট করে তুলছে।
মাসভিত্তিক তথ্য বিশ্লেষণে ধর্ষণের ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা স্পষ্ট। ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে ধর্ষণের ভুক্তভোগী ছিল ১৯টি শিশু। চলতি বছরের জানুয়ারিতে এ সংখ্যা ছিল ১৭টি। ফেব্রুয়ারিতে তা কিছুটা কমে হয় ১৩টি। মার্চে এ সংখ্যা ছিল ১৮টি। এপ্রিলে এটি ৪২টিতে পৌঁছায়। আর মে মাসে সব রেকর্ড ছাড়িয়ে এ সংখ্যা দাঁড়ায় ৫৫টিতে।
ডিসেম্বর থেকে মার্চ, এই চার মাসে ধর্ষণের শিকার হয়েছে ৬৭ শিশু। আর শুধু মে মাসেই ভুক্তভোগীর সংখ্যা ৫৫। অর্থাৎ, এই এক মাসেই চার মাসের কাছাকাছি ঘটনা ঘটেছে।
জেলাভিত্তিক তথ্যে দেখা গেছে, গত ছয় মাসে সর্বোচ্চ ১২টি ঘটনা ঘটেছে চট্টগ্রাম জেলায়। দ্বিতীয় অবস্থানে একই বিভাগের জেলা কুমিল্লায় আটটি ঘটনা। সাতটি করে ঘটনা নিয়ে তৃতীয় স্থানে রয়েছে ঢাকা এবং পাশের জেলা নারায়ণগঞ্জ। একই সময়ে গাইবান্ধা ও যশোরে ছয়টি করে ঘটনা ঘটেছে।
বিভাগভিত্তিক হিসাবে ৪৯টি ঘটনা নিয়ে শীর্ষে ঢাকা বিভাগ। দ্বিতীয় চট্টগ্রাম বিভাগে ৩৭টি, তৃতীয় রাজশাহীতে ২০টি। ময়মনসিংহে ১৬টি, খুলনায় ১১টি এবং রংপুরে ১০টি ঘটনার তথ্য পাওয়া গেছে।
তুলনামূলকভাবে কম ঘটনা ঘটেছে বরিশাল ও সিলেট বিভাগে। বরিশালে আটটি এবং সিলেটে পাঁচটি ঘটনার তথ্য পাওয়া গেছে এই ছয় মাসে।
