✍︎ নাগরিক প্রতিবেদক ✍︎
সাবেক আইজিপি বেনজীর আহমেদের বিরুদ্ধে থাকা মামলাসহ প্রয়োজনীয় সব কাগজপত্র ইতোমধ্যে দুবাই সরকারের কাছে পাঠানো হয়েছে বলে জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। দ্রুতই তাকে দেশে ফেরত আনা সম্ভব হবে বলে আশা প্রকাশ করেছেন তিনি।
শনিবার (২০ জুন) দুপুরে সচিবালয়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় অবদানের জন্য পুলিশ সদস্যদের পুরস্কৃত করার অনুষ্ঠান শেষে সাংবাদিকদের এসব তথ্য জানান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।
সালাহউদ্দিন বলেন, তার (বেনজীর) বিরুদ্ধে থাকা মামলাসহ প্রয়োজনীয় সব কাগজপত্র সেই দেশে পাঠানো হয়েছে। আশা করি দেশটির সরকার দ্রুতই সমস্ত প্রক্রিয়া শেষে তাকে বাংলাদেশে ফেরত পাঠাবে।
এ সময় তিনি রাজধানীর মোহাম্মদপুর এলাকার অপরাধীদের নির্মূল করাসহ দেশের সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সরকারের কঠোর অবস্থানের কথা পুনর্ব্যক্ত করেন।
মন্ত্রী বলেন, মোহাম্মদপুর এলাকা বহু বছর ধরেই অপরাধীদের অভয়ারণ্য হয়ে রয়েছে। এই মোহাম্মদপুরকেও নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসা হবে। এখানকার অপরাধীদের নির্মূল করা হবে।
আগের যেকোনো সরকারের তুলনায় বর্তমান সরকার অনেক গতিতে কাজ করছে জানিয়ে তিনি বলেন, সেটি এরই মধ্যে সবার দৃষ্টিগোচর হয়েছে।
নির্বাচিত সরকার আসার পরে পুলিশ সদস্যরা এত বেশি দায়িত্ব পালন করছেন যে, তাদের প্রশংসনীয় কাজের জন্য পুরস্কৃত করা হচ্ছে বলেও জানান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।
আওয়ামী লীগ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, আওয়ামী লীগকে কোনো রাজনৈতিক দল মনে করি না; একটা মাফিয়া দল। তাদের কার্যক্রম নিষিদ্ধ রয়েছে। তবে আগামী ২৩ জুন তাদের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী সামনে রেখে যেকোনো কার্যক্রম সম্পর্কে সতর্ক থাকার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
বেনজীরের বিরুদ্ধে যত অভিযোগ
সাবেক আইজিপি বেনজীর আহমেদের বিরুদ্ধে ক্ষমতার অপব্যবহার, শত শত কোটি টাকার অবৈধ সম্পদ অর্জন এবং মানি লন্ডারিংয়ের (অর্থ পাচার) গুরুতর অভিযোগ রয়েছে।
দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) মামলা: ২০২৪ সালের ১৫ ডিসেম্বর দুদকের পক্ষ থেকে অবৈধ সম্পদ অর্জন ও তথ্য গোপনের অভিযোগে বেনজীর ও তাঁর পরিবারের সদস্যদের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়।
অভিযোগপত্র বা চার্জশিট: দীর্ঘ অনুসন্ধান শেষে ২০২৫ সালের ৩০ নভেম্বর আদালতে তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দাখিল করে দুদক। তদন্ত প্রতিবেদন অনুযায়ী, বেনজীর তাঁর দাখিল করা সম্পদ বিবরণীতে কয়েক কোটি টাকার সম্পদ গোপন করেছেন এবং তাঁর নামে অন্তত ১১ কোটি ৪ লাখ টাকার অবৈধ সম্পদ পাওয়া গেছে।
আদালতের পরোয়ানা: অভিযোগপত্র গ্রহণের পর চলতি বছরের মার্চ মাসে ঢাকার একটি বিশেষ আদালত তাঁর বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেন। এরপর মে মাসে তাঁর অনুপস্থিতিতেই আদালতে অভিযোগ গঠন করা হয়।
মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগ
রাজধানীর মতিঝিলের শাপলা চত্বরে হেফাজতে ইসলামের সমাবেশ ঘিরে সংঘটিত হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় করা মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলার একজন আসামি বেনজীর আহমেদ। এই ঘটনার সময় ঢাকা মহানগর পুলিশ কমিশনারের দায়িত্বে ছিলেন তিনি।
চিফ প্রসিকিউটর মো.আমিনুল ইসলামের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০১৩ সালের ৫ ও ৬ মে মাসে রাজধানীর মতিঝিলের শাপলা চত্বরে হেফাজতে ইসলামের সমাবেশ ঘিরে ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ, কুমিল্লা ও চট্টগ্রামে ৫৮ জন হত্যাকাণ্ডের বিষয়টি এখন পর্যন্ত নিশ্চিত হওয়া গেছে।
ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহীউদ্দীন খান আলমগীর, সাবেক আইজিপি হাসান মাহমুদ খন্দকারসহ অনেকে এই মামলার আসামি।
আওয়ামী লীগ সরকার আমলে র্যাবের টিএফআই সেলে গুম করে রাখার ঘটনায় করা মানবতাবিরোধী অপরাধের আরেকটি মামলায়ও বেনজীর আহমেদ আসামি। এই মামলায় মোট আসামি ১৭ জন। এর মধ্যে ১২ জন সেনা কর্মকর্তা। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১-এ এই মামলায় এখন সাক্ষ্য গ্রহণ চলছে।
মার্কিন নিষেধাজ্ঞা ও পলাতক জীবন
বেনজীর আহমেদ ২০২০ সালের এপ্রিল থেকে ২০২২ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত বাংলাদেশ পুলিশের আইজিপি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এর আগে তিনি র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়নের (র্যাব) মহাপরিচালক এবং ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) কমিশনার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন।
যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা: ২০২১ সালের ডিসেম্বরে গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তর ও ট্রেজারি বিভাগ র্যাবের সাবেক ও বর্তমান সাত কর্মকর্তার ওপর নিষেধাজ্ঞা দেয়, যার মধ্যে বেনজীর আহমেদের নামও ছিল।
গত ২০২৪ সালের মাঝামাঝি সময়ে তাঁর বিশাল অবৈধ সম্পদের খতিয়ান গণমাধ্যমে আসার পর থেকেই তিনি সপরিবার আত্মগোপনে চলে যান। ধারণা করা হচ্ছিল, তিনি বাংলাদেশ ছেড়ে মধ্যপ্রাচ্য বা ইউরোপের কোনো দেশে আশ্রয় নিয়েছিলেন। পরে তাঁর সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত এবং ব্যাংক হিসাব অবরুদ্ধ করার নির্দেশ দেন আদালত।
বাংলাদেশে ফিরিয়ে আনার প্রক্রিয়া কেমন হবে
বাংলাদেশ ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের মধ্যে কোনো সরাসরি বন্দী প্রত্যর্পণ চুক্তি আছে কি না, তা নিয়ে কূটনৈতিক মহলে আলোচনা চলছে। তবে আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, চুক্তি না থাকলেও ইন্টারপোলের মাধ্যমে এবং দ্বিপক্ষীয় কূটনৈতিক তৎপরতা চালিয়ে কোনো আসামিকে ফিরিয়ে আনা সম্ভব।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একটি সূত্র জানিয়েছে, বেনজীর আহমেদকে দ্রুত দেশে ফিরিয়ে এনে আদালতে সোপর্দ করার জন্য পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং পুলিশ সদর দপ্তর যৌথভাবে কাজ শুরু করেছে। দুবাইয়ে বাংলাদেশের কনস্যুলেট এ বিষয়ে আমিরাত সরকারের সঙ্গে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রক্ষা করছে।
১৯৮৮ সালে পুলিশে যোগ দেওয়া বেনজীর আহমেদ ২০২০ সালের ১৫ এপ্রিল থেকে ২০২২ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত আইজিপি পদে ছিলেন। এর আগে ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি) কমিশনার এবং র্যাবের মহাপরিচালকের দায়িত্ব পালন করেন তিনি।
