✍︎ নাগরিক প্রতিবেদন ✍︎
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরান যুদ্ধ শুরুর পর আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধিতে গত সাড়ে তিন মাসে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) লোকসান হয়েছে ১৭ হাজার ৩৯ কোটি ৫৬ লাখ টাকা।
সোমবার সংসদে এই তথ্য জানিয়ে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ বলেছেন, মে মাস থেকে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম কিছুটা কমতে শুরু করেছে। এর পরও দেশীয় বাজারের তুলনায় বেশি। জুন মাসে প্রতি লিটার ডিজেলের খরচ ১৭৫ টাকা ২২ পয়সা, অকটনের খরচ ১৬০ টাকা ৭০ টাকা পয়সা। তবে সরকার জনস্বার্থে ডিজেলের দাম বাড়ায়নি। পেট্রোল, অকটেনের দাম লিটারে ৫ টাকা বৃদ্ধির পরও বিপিসি দৈনিক প্রায় ৭৮ কোটি টাকা লোকসান দিতে হচ্ছে।সাতক্ষীরা-২ আসনের সংসদ সদস্য মুহাম্মদ আব্দুল খালেকের প্রশ্নে এসব তথ্য জানান মন্ত্রী।
স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের সভাপতিত্বে প্রশ্নোত্তর টেবিলে উপস্থাপিত হয়। মন্ত্রী আরও বলেন, আন্তর্জাতিক বাজারের চেয়ে অনেক কমে দেশে জ্বালানি তেলের মূল্য নির্ধারণ করায় লোকসান সত্ত্বেও বিপিসি নিজস্ব তহবিল দিয়ে তিন মাস ধরে আমদানি কার্যক্রম সচল রেখে চলেছে। আন্তর্জাতিক বাজারে দাম কমলে দেশের বাজারেও জ্বালানির দাম হ্রাস বিবেচনা করা হবে।
সংরক্ষিত আসনের সদস্য সেলিনা সুলতানার প্রশ্নে মন্ত্রী বলেন, দেশে এখন পর্যন্ত আবিষ্কৃত কয়লা ক্ষেত্র পাঁচটি। বড়পুকুরিয়া, ফুলবাড়ি, দিঘীপাড়া, খালাসীপাড়া ও জামালগঞ্জ। এর মধ্যে শুধুমাত্র বড়পুকুরিযা কয়লাক্ষেত্র থেকে ২০০৫ সাল থেকে বাণিজ্যিকভাবে কয়লা উত্তোলন করা হচ্ছে। ফুলবাড়ী ও দিঘীপাড়া কয়লাক্ষেত্রের সমীক্ষা সম্পন্ন হয়েছে।
নরসিংদী-৫ আসনের সংসদ সদস্য মো. আশরাফ উদ্দিনের প্রশ্নে ইকবাল হাসান মাহমুদ বলেন, তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলপিজি) সহজলভ্য হওয়ায় আবাসিক খাতে নতুন গ্যাস সংযোগ চালুর আপাতত কোনো পরিকল্পনা নেই সরকারের। এলএনজি ঘাটতি থাকায় ২০২৫ সালের ২৩ জুলাই থেকে বিদ্যুৎ, সার ও বিশেষায়িত শিল্পাঞ্চল ব্যতীত আবাসিক, বাণিজ্যিক ও সিএনজি শ্রেণিতে নতুন গ্যাস সংযোগ প্রদান স্থগিত রাখা হয়েছে।
চট্টগ্রাম-১৫ আসনের সদস্য শাহাজাহান চৌধুরীর প্রশ্নে মন্ত্রী বলেন, সব কুইক রেন্টাল বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র অবসরে পাঠানো হয়েছে। সরকার নবায়নযোগ্য জ্বালানি নীতিমালার মাধ্যমে ২০৩০ সালের মধ্যে বিদ্যুৎ চাহিদার ২০ শতাংশ এবং ২০৪০ সালের মধ্যে ৩০ শতাংশ নবায়নযোগ্য উৎস্য থেকে সরবরাহের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। ইতোমধ্যে ১০ হাজার মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা অর্জনের লক্ষ্যও নির্ধারণ করা হয়েছে।
মেহেরপুর-১ আসনের সংসদ সদস্য মো. তাজউদ্দীন খানের প্রশ্নের জবাবে ইকবাল হাসান বলেন, দেশে প্রাকৃতিক গ্যাসের বর্তমান চাহিদা দৈনিক প্রায় ৩ হাজার ৮০০ মিলিয়ন ঘনফুট। চাহিদার বিপরীতে সরবরাহের পরিমান দৈনিক ২ হাজার ৬৫৪ মিলিয়ন ঘনফুট। ঘাটতির পরিমান দৈনিক প্রায় ১ হাজার ১৪৬ মিলিয়ন ঘনফুট।
সিরাজগঞ্জ-১ আসনের সদস্য মো. সেলিম রেজার প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রী বলেন, সচল ১৩৭টি বিদ্যুৎ কেন্দ্রের উৎপাদন ক্ষমতা ২৯ হাজার ৫৯৩ মেগাওয়াট।
মুহাম্মাদ আব্দুল খালেক লিখিত প্রশ্নে জানতে চান, বর্তমানে দেশে মজুদকৃত জ্বালানির পরিমাণ কত এবং জ্বালানি তেলের দাম কমানোর কোনো পরিকল্পনা আছে কি না।
জবাবে ইকবাল হাসান মাহমুদ জানান, গত ১ জুনের তথ্য অনুযায়ী বর্তমানে দেশে প্রাকৃতিক গ্যাসের অবশিষ্ট উত্তোলনযোগ্য মজুদের পরিমাণ ৭.৬৩ ট্রিলিয়ন ঘনফুট। দেশে এযাবৎ আবিষ্কৃত ২৯টি গ্যাসক্ষেত্রের ২০২৪ সালে সর্বশেষ হালনাগাদকৃত গ্যাস মজুদের পরিমাণ ২৯.৭৪ ট্রিলিয়ন ঘনফুট এবং ৩১ ডিসেম্বর ২০২৫ পর্যন্ত উত্তোলিত গ্যাসের পরিমাণ ২২.১১ ট্রিলিয়ন ঘনফুট।
এ সময় তিনি গত ১০ জুন পর্যন্ত জ্বালানি তেলের মজুদের তথ্যও তুলে ধরেন।
তিনি বলেন, ‘ডিজেল- ৩ লাখ ৯৭ হাজার ১৯৯ মেট্রিক টন, অকটেন- ৪৪ হাজার ৮৩ টন, পেট্রোল- ১৯ হাজার ১৬৪ টন, ফার্নেস অয়েল- ৭৬ হাজার ৭১২ টন, জেট ফুয়েল- ৪১ হাজার ৩২৯ টন, কেরোসিন- ১৩ হাজার ৯১৬ টন ও মেরিন ফুয়েল- এক হাজার ২৬ টন মিলিয়ে মোট ৫ লাখ ২৯ হাজার ৫৬ মেট্রিক টন জ্বালানি তেল মজুদ রয়েছে।’
জ্বালানি মন্ত্রী বলেন, ‘মধ্যপ্রাচ্যে ইরান এবং আমেরিকা-ইসরায়েলের মধ্যে চলমান যুদ্ধের কারণে গত মার্চ মাস হতে আন্তর্জাতিক বাজারের জ্বালানি তেলের মূল্য অধিক বৃদ্ধি পায়। গত মে মাস থেকে জ্বালানি তেলের মূল্য কিছুটা হ্রাস পেতে শুরু করে। তবে মূল্য হ্রাসের পরেও দেশে জ্বালানি তেলের মূল্য আন্তর্জাতিক বাজারের তুলনায় এখনো অনেক কম রয়েছে। স্বয়ংক্রিয় মূল্য নির্ধারণ ফর্মুলা অনুযায়ী গত এপ্রিল মাসের জন্য প্রতি লিটার ডিজেলের কস্টিং ১৫৫.৪৬ টাকা এবং প্রতি লিটার অকটেনের কস্টিং ১৪৮.৯৩ টাকা হলেও সরকার ১৯ এপ্রিল হতে প্রতি লিটার ডিজেলের দাম ১০০ টাকা হতে ১১৫ টাকা, অকটেন লিটার প্রতি ১২০ টাকা হতে ১৪০ টাকা, পেট্রোল লিটার প্রতি ১১৬ টাকা হতে ১৩৫ টাকা এবং কেরোসিন ১১২ টাকা হতে ১৩০ টাকায় পুনঃনির্ধারণ করে।’
ইকবাল হাসান মাহমুদ যোগ করেন, ‘পরবর্তীতে, মে মাসের জন্য প্রতি লিটার ডিজেলের কস্টিং ২৩৪.৭৯ টাকা এবং অকটেনের কস্টিং ১৬৫.৫৬ টাকা হলেও সরকার মে মাসে জ্বালানি তেলের মূল্য অপরিবর্তিত রেখেছে। জুন মাসের জন্য প্রতি লিটার ডিজেলের কস্টিং ১৭৫.২২ টাকা এবং অকটেনের কস্টিং ১৬০.৭০ টাকা হলেও সরকার জনস্বার্থে জুন মাসেও ডিজেলের মূল্য বৃদ্ধি করেনি। তবে অকটেন, পেট্রোল ও কেরোসিনের মূল্য লিটার প্রতি ৫ টাকা বৃদ্ধি করেছে।’
তিনি বলেন, ‘ডিজেলের মূল্য আন্তর্জাতিক বাজারে ১৫২ শতাংশ বৃদ্ধি পেলেও সরকার দেশে ডিজেলের মূল্য মাত্র ১৫ শতাংশ বৃদ্ধি করেছে এবং অকটেনের মূল্য আন্তর্জাতিক বাজারে ৮২ শতাংশ বৃদ্ধি পেলেও সরকার দেশে অকটেনের মূল্য মাত্র ২১ শতাংশ বৃদ্ধি করেছে।’
মন্ত্রী বলেন, ‘আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের মূল্য এখনো ব্রেক-ইভেনের ওপরে রয়েছে। ফলে ডিজেল, অকটেন, পেট্রোল বিক্রয়ে বিপিসিকে এখনো দৈনিক প্রায় ৭৮ কোটি টাকা লোকসান দিতে হচ্ছে। গত মার্চ থেকে ১১ জুন পর্যন্ত আমদানিকৃত জ্বালানি তেলের এলসি পেমেন্ট অনুযায়ী বিপিসি’র প্রকৃত লোকসানের পরিমাণ প্রায় ১৭ হাজার ৩৯ দশমিক ৫৬ কোটি টাকা। এরমধ্যে মার্চ মাসে ২ হাজার ২৪৮ দশমিক ৩৭ কোটি টাকা, এপ্রিল মাসে ৭ হাজার ৮৬৬ দশমিক ০৩ কোটি, মে মাসে ২ হাজার ৬২৩ দশমিক ৩৪ কোটি এবং জুন মাসের প্রথম ১১ দিনে ৪ হাজার ৩০১ দশমিক ৮২ কোটি টাকা লোকসান হয়েছে।’
তিনি বলেন, ‘আন্তর্জাতিক বাজারের চেয়ে অনেক কমে দেশে জ্বালানি তেলের মূল্য নির্ধারণ করায় লোকসান সত্ত্বেও বিপিসি নিজস্ব তহবিল দিয়ে বিগত ৩ মাস ধরে জ্বালানি তেলের আমদানি কার্যক্রম সচল রেখে চলেছে।’
