✍︎ নাগরিক প্রতিবেদন ✍︎
বাংলাদেশের পাপেট বা পুতুলনাচ শিল্পের প্রধান রূপকার, প্রখ্যাত চারুশিল্পী, নাট্যনির্দেশক মুস্তাফা মনোয়ার মারা গেছেন। সোমবার সকাল সাড়ে ৮টার দিকে ঢাকার স্কয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।
মৃত্যুকালে একুশে পদকপ্রাপ্ত এই কিংবদন্তি শিল্পীর বয়স হয়েছিল ৯১ বছর।
তাঁর মৃত্যুর খবর গণমাধ্যমকে নিশ্চিত করেছে তাঁর ভাগ্নি ও বিশিষ্ট অভিনেত্রী নিমা রহমান। তিনি জানান, হাসপাতাল থেকে মামার মরদেহ ধানমন্ডির বাসভবনে নিয়ে যাওয়া হবে। পরবর্তীতে তাঁর দাফন ও শেষ শ্রদ্ধা নিবেদনের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
হাসপাতাল ও পারিবারিক সূত্র জানিয়েছে, বার্ধক্যজনিত নানা জটিলতার পাশাপাশি নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হয়ে গত ১৪ জুন স্কয়ার হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন মুস্তাফা মনোয়ার। সেখানে তাঁর শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে তাঁকে নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) নেওয়া হয়।
মাঝখানে শারীরিক অবস্থার কিছুটা উন্নতি হলে চিকিৎসকেরা তাঁর ভেন্টিলেটর সাপোর্ট খুলে নিয়েছিলেন। তবে শেষ রক্ষা হয়নি; রোববার পুনরায় তাঁর শারীরিক অবস্থার অবনতি ঘটলে তাঁকে আবারও লাইফ সাপোর্টে নেওয়া হয়। আজ সকালে চিকিৎসকেরা তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন।
তুমুল জনপ্রিয় অনুষ্ঠানের আন্ম ছিল ‘মনের কথা’, যা এ প্রজন্মের অনেকেই আজও ভোলেননি। যেখানে পারুল আর বাউলের মজার মজার গল্প, আর একটু পরপর একটি গরুর ‘হাম্বা’ ডাক শিশুদের আনন্দে ভাসাত। বাউল হাতে একতারা নিয়ে গান গাইত, আর পারুল এসে গল্প জুড়ত।
পারুল-বাউলের এই যুগলবন্দি একটি প্রজন্মকে এতটাই কাছে টেনে নিয়েছিল যে, তার প্রয়াণের খবরের পরপরই সামাজিক মাধ্যমে ‘মনের কথা’ অনুষ্ঠানের পুরোনো ভিডিওর মন্তব্যঘরে এসে এই গুণী ব্যক্তিত্বকে স্মরণ করছেন নেটিজেনরা। শৈশবের স্মৃতি রোমন্থন করে অনেকেই তার আত্মার শান্তি কামনা করে আবেগঘন বার্তা দিচ্ছেন।
যদি একটু ইতিহাস ঘাটা হয়, তাহলে চলে আসে এই গুণী ব্যক্তির পাপেট শিল্পের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার কাহিনী। চারুকলায় পড়াশোনা করলেও মুস্তাফা মনোয়ার পেশা হিসেবে বেছে নিয়েছিলেন টেলিভিশনকে। চিত্রকলা, নির্দেশনা বা শিশুদের নানা অনুষ্ঠানের বাইরে পাপেট ছিল তার আগ্রহের মূল কেন্দ্রবিন্দু। জীবনের শেষ সময় পর্যন্ত তিনি পাপেট নিয়ে কাজ করেছেন এবং তৈরি করেছেন অসংখ্য অনুসারী ও গুণগ্রাহী।
কলকাতা আর্ট কলেজ থেকে পাস করার পর ঢাকা আর্ট কলেজে শিক্ষক হিসেবে যোগ দিয়ে তিনি প্রথম পাপেট নিয়ে কাজ করতে আগ্রহী হয়ে ওঠেন। মূলত গ্রামবাংলার পুতুলনাচ ছোটবেলাতেই তাকে আকৃষ্ট করেছিল। বাংলাদেশে পাপেট তৈরি ও কাহিনি সংবলিত পাপেট প্রদর্শনের মূল উদ্যোক্তা তিনিই।
নিজের পাপেট দল এবং বাংলাদেশের ফোক পাপেট দল ধনমিয়াকে নিয়ে তিনি মস্কো ও তাশখন্দ সফর করেছিলেন, যা সেখানে ব্যাপক প্রশংসা অর্জন করেছিল। মুস্তাফা মনোয়ার তার শিল্পকর্মে বাংলাদেশের স্বকীয় বৈশিষ্ট্যকে গেঁথে দিতে সিদ্ধহস্ত ছিলেন। তার পাপেটের কেন্দ্রীয় চরিত্র ‘পারুল’ নামটি নেওয়া হয়েছিল আবহমান বাংলার ‘সাত ভাই চম্পা’ লোককথা থেকে। আনন্দময় শিক্ষা কর্মসূচিতে পাপেটকে প্রয়োগ করতেই তিনি এই চরিত্রটি বেছে নিয়েছিলেন।
এর আগে ১৯৬০-৬১ সালের দিকে কলিম শরাফী তার একটি ডকুমেন্টারিতে সর্বপ্রথম মুস্তাফা মনোয়ারের পাপেটকে অন্তর্ভুক্ত করেন। পরবর্তীতে টেলিভিশনে ‘আজব দেশে’ অনুষ্ঠানে তিনি ‘বাঘা’ ও ‘মেনি’ চরিত্র রচনা করে পাপেট প্রদর্শনী করেন। ১৯৬৭-৬৮ সালে এসব পাপেট নাটকের মাধ্যমেই তৎকালীন রাজনৈতিক পরিবেশ এবং বাঙালি সংস্কৃতিবিরোধী পাকিস্তানি মনোভাবকে ব্যঙ্গ করা হতো।
১৯৩৫ সালের ১ সেপ্টেম্বর তৎকালীন যশোর জেলার (বর্তমান মাগুরা) নাকোল গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন মুস্তাফা মনোয়ার। তাঁর পৈতৃক নিবাস ঝিনাইদহের শৈলকূপা উপজেলার মনোহরপুর গ্রামে। তিনি ছিলেন বাংলার খ্যাতনামা কবি গোলাম মোস্তফার সন্তান। পারিবারিক পরিমণ্ডলেই তাঁর শিল্প ও সাহিত্যের প্রতি গভীর অনুরাগ গড়ে ওঠে।
মুস্তাফা মনোয়ারকে বাংলাদেশে আধুনিক পাপেট বা পুতুলনাট্যের পথিকৃৎ বলা হয়। কলকাতা সরকারি চারু ও কারুকলা কলেজ থেকে স্বর্ণপদকসহ চিত্রকলায় স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করার পর তিনি বাংলাদেশে চারুশিল্পের প্রসারে ব্রতী হন।
দীর্ঘ কর্মজীবনে তিনি একাধারে চিত্রকলা, টেলিভিশন অনুষ্ঠান নির্মাণ, নাট্যনির্দেশনা এবং শিশুতোষ শিক্ষামূলক বিনোদন নিয়ে কাজ করেছেন। আশির দশকে বাংলাদেশ টেলিভিশনে সম্প্রচারিত তাঁর পাপেট শো ‘মনের কথা’ এবং চরিত্র ‘বাঘা’ ও ‘ভুতু’ বাংলাদেশের শিশু-কিশোরদের হৃদয়ে স্থায়ী আসন করে নেয়।
শিল্পকলা, সংস্কৃতি ও পাপেট শিল্পের আধুনিকায়নে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ২০০৪ সালে বাংলাদেশ সরকার তাঁকে দেশের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মাননা ‘একুশে পদক’-এ ভূষিত করে। এছাড়াও তিনি দেশ-বিদেশ থেকে বহু সম্মাননা ও পুরস্কার লাভ করেছেন।
মুস্তাফা মনোয়ারের কর্মজীবনের শুরু পূর্ব পাকিস্তান চারু ও কারুকলা মহাবিদ্যালয়ের প্রভাষক হিসেবে। পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশ শিশু একাডেমি, বাংলাদেশ টেলিভিশন, বাংলাদেশ চলচ্চিত্র উন্নয়ন সংস্থা, শিল্পকলা একাডেমিসহ অনেক গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে উচ্চপদে কর্মরত ছিলেন।
মুক্তিযুদ্ধের সময় শরণার্থীশিবিরে শিশুদের আতঙ্কগ্রস্ত মলিন চেহারা মুস্তাফা মনোয়ারকে ব্যথিত করে। তাই বাচ্চাদের মুখে হাসি ফোটানোর জন্য সেই শরণার্থীশিবিরেই আয়োজন করেন জীবনের প্রথম পাপেট শো। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর নতুন আঙ্গিকে বাংলাদেশের শিল্পজগতে মুস্তাফা মনোয়ার মেলে ধরেন পাপেটের এক নতুন রূপ।
