‎লক্ষাধিক শিক্ষক নিয়োগের পরিকল্পনা জানালেন শিক্ষামন্ত্রী

✍︎ নাগরিক প্রতিবেদন ✍︎   

‎এক লাখের বেশি নতুন শিক্ষক নিয়োগের পরিকল্পনার কথা জানিয়েছেন শিক্ষা এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন। এর মধ্যে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক পদে ৩২ হাজার ৫০০ জন এবং বেসরকারি এমপিওভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষক-প্রভাষক পদে ৭০ হাজার জন নিয়োগের কথা রয়েছে।

‎বৃহস্পতিবার (২ জুলাই) রাজধানীর ইন্টারকন্টিনেন্টাল হোটেলে এক অনুষ্ঠানে শিক্ষামন্ত্রী এই পরিকল্পনার কথা জানান।

শিক্ষা‎মন্ত্রী বলেন, ‘প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ৩২ হাজার ৫০০ জন প্রধান শিক্ষক নিয়োগের বিষয়ে আপিল বিভাগ রায় ঘোষণা করেছেন। আপিল বিভাগ আমাদের আপিল গ্রহণ করেছেন এবং আমরা এখন ৩২ হাজার ৫০০ জন প্রধান শিক্ষক নিয়োগ করতে পারব।’

শিক্ষামন্ত্রী আরও বলেন, ‘এর সঙ্গে আরও প্রায় ৭০ হাজার জন (এমপিওভুক্ত শিক্ষক-প্রভাষক) অন্তর্ভুক্ত করা যেতে পারে। এটি আমাদের জন্য একটি বড় খবর।’

‎এমপিওভুক্ত স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসা ও কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর শূন্য থাকা প্রায় ৭৮ হাজার পদে নতুন পদ্ধতিতে সরাসরি লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষার মাধ্যমে সহকারী শিক্ষক, প্রভাষক ও ট্রেড ইন্সট্রাক্টর পদে নিয়োগপ্রক্রিয়া চালানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে বেসরকারি শিক্ষক নিবন্ধন ও প্রত্যয়ন কর্তৃপক্ষ-এনটিআরসিএ।

‎এত দিন নিবন্ধন পরীক্ষায় উত্তীর্ণদের কাছ থেকে শূন্যপদের বিপরীতে আবেদন নিয়ে তাঁদের নিয়োগ সুপারিশ করা হলেও নতুন পদ্ধতিতে শিক্ষক নিবন্ধন পরীক্ষা নিয়ে প্রার্থীদের সরাসরি শূন্যপদে নিয়োগের সুপারিশ করা হবে।

‎আগে মন্ত্রীদের পাবলিক পরীক্ষার কেন্দ্রে পরিদর্শনে ঢুকে পরীক্ষার্থীদের বিরক্তির কারণ হতে দেখা গেলেও সে ক্ষেত্রে পরিবর্তন এসেছে বলে মন্তব্য করেন মন্ত্রী।

‎শিক্ষামন্ত্রী বলেন, ‘সকালে এইচএসসি পরীক্ষা শুরু হয়েছে। আমাদের পরীক্ষাকেন্দ্র পরিদর্শন করার কথা ছিল, কিন্তু সম্ভবত আমাদের সহকর্মীরা মনে করেন যে আমাদের সেখানে যাওয়ার প্রয়োজন নেই। সে কারণেই সবাই এই কক্ষে বসে আছি, কিন্তু আগে এমনটি হতো না। অনেক বড় পরিবর্তন এসেছে।’

‎৫ লাখ ৪৪ হাজার শিক্ষার্থী উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ে ভর্তি হলেও সবাই পরীক্ষা দিচ্ছেন না তুলে ধরে মন্ত্রী বলেন, ‘সাধারণ ধারার প্রায় ৩৩ শতাংশ শিক্ষার্থী ঝরে পড়ছে। তারা এইচএসসি পরীক্ষায় অংশ নিচ্ছে না।’

শিক্ষামন্ত্রী আরও বলেন, ‘আমাদের কারিগরি শিক্ষায় ৫৪ শতাংশ এবং মাদ্রাসাশিক্ষায় ৪৪ শতাংশ শিক্ষার্থী ঝরে পড়ছে। যখন আমরা দেশের শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে কথা বলছি, তখন এটি আমাদের জন্য ভালো খবর নয়।’

‎ইউনেসকো আয়োজিত ‘গ্লোবাল পার্টনারশিপ এডুকেশন সিস্টেম ট্রান্সফরমেশন গ্র‍্যান্ট অ্যান্ড মাল্টিপ্লায়ার গ্র‍্যান্ট ফর বাংলাদেশ’ শীর্ষক অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন শিক্ষামন্ত্রী মিলন।

‎অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য দেন প্রধানমন্ত্রীর শিক্ষা উপদেষ্টা মাহদী আমিন, প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ, মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগের সচিব আবদুল খালেকসহ অনেকে।

‎‎শিক্ষা খাতে বরাদ্দ দেওয়া টাকার অপচয় সহ্য করা হবে না বলে সতর্ক করেন মন্ত্রী। তিনি বলেন, ‘২০০১ সালে আমি প্রতিমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছি এবং এসব প্রকল্প সম্পর্কে আমার অভিজ্ঞতা ছিল। পূর্ববর্তী সরকার প্রচুর ঋণ ও অনুদান নিয়েছিল, কিন্তু তা সঠিকভাবে ব্যবহৃত হয়নি।’

শিক্ষামন্ত্রী বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রীর পক্ষ থেকে কঠোর নির্দেশনা রয়েছে, আমাদের বিভাগে কোনো অপচয় বা অব্যবস্থাপনা বরদাশত করা হবে না। তাই আমাদের খুব সতর্ক থাকতে হবে, যা আমাদের সচিব বারবার বলছেন, শিক্ষা খাতে এই অর্থ আমরা কীভাবে বিনিয়োগ করব, সে বিষয়ে আমাদের সতর্ক থাকতে হবে। প্রতিটি পয়সা সঠিকভাবে ব্যয়ের মাধ্যমে আমাদের খরচ নিয়ন্ত্রণ করতে হবে।’

‎দেশে মানসম্মত শিক্ষার ‘সত্যিই প্রয়োজন’ তুলে ধরে মন্ত্রী মিলন বলেন, ‘সম্ভবত আমরা মানসম্মত শিক্ষায় পিছিয়ে পড়েছি। আমি বিশ্বাস করি, সরকারের একটি সহায়ক প্রতিষ্ঠান হিসেবে কাজ করা উচিত। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের মাধ্যমে পরিচালিত হবে। কিন্তু আমরা এখানে সহায়ক হিসেবে কাজ করছি, যাতে তারা শিক্ষা কার্যক্রম চালিয়ে যেতে পারে।’

শিক্ষামন্ত্রী আরও বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী এই বছর আমাদের জিডিপির ২ শতাংশ শিক্ষা খাতে বরাদ্দ করেছেন এবং এটি একটি বড় অঙ্কের অর্থ। এ ছাড়াও তিনি প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন যে এটি জিডিপির ৫ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি করবেন। ‎এ ক্ষেত্রে শিক্ষকদের যোগ্যতা এবং প্রশিক্ষণ সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। আশা করি, আমরা এই অর্থ সঠিকভাবে বিনিয়োগ করব।’

‎দেশের শিক্ষা খাত নিয়ে মন্ত্রী বলেন, ‘২০০১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত আমার অভিজ্ঞতা এবং বর্তমানে এই অফিসে আসার পর আমার মনে হচ্ছে যেন আমি পেছনের আয়না দেখে রিভার্স গিয়ারে গাড়ি চালাচ্ছি। ২০০১ থেকে ২০০৬ সময়কালে আমরা যেখানে শিক্ষাব্যবস্থাকে রেখে গিয়েছিলাম, আমি এই মন্ত্রণালয়ে ফিরে এসে নিজেকে তার চেয়ে অনেক পিছিয়ে আবিষ্কার করেছি।’

শিক্ষামন্ত্রী আরও বলেন, ‘আপিল বিভাগ যে মামলাটি নিষ্পত্তি করেছেন, তা ২০১৭ সালে দায়ের করা হয়েছিল। এই মামলা সমাধানের জন্য আমাদের অনেক বছর অপেক্ষা করতে হয়েছে। আমি জানি না কেন সরকার এই মামলাগুলো সমাধানের ব্যাপারে সিরিয়াস ছিল না।’

৩২ হাজার সরকারি প্রাথমিক স্কুলে প্রধান শিক্ষক নিয়োগে বাধা কাটল

দীর্ঘদিন ধরে আইনি জটিলতায় শূন্য থাকা দেশের প্রায় ৩২ হাজার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষক নিয়োগে বাধা নেই বলে রায় দিয়েছেন আপিল বিভাগ।

বৃহস্পতিবার (২ জুলাই) প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বাধীন আপিল বিভাগ এই রায় দেন।

আদালতে রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন অ্যাটর্নি জেনারেল ব্যারিস্টার মো. রুহুল কুদ্দুস কাজল।

পরে তিনি বলেন, সরকার ২০১৩ সালে ২৬,০০০ বেসরকারি প্রাথমিক স্কুলকে অধিগ্রহণ করে। তখন সরকার একটি আইন প্রণয়ন করল। সে আইনে বলা হলো অধিগ্রহণ স্কুলের সবাই যোগদান করতে পারবেন। প্রধান শিক্ষকসহ তারা যোগদান করবে সহকারী শিক্ষক হিসেবে। তার মানে প্রধান শিক্ষক হিসেবে তারা পূর্বে দায়িত্ব পালন করলেও আইন অনুযায়ী তারা সবাই যোগদান করলেন সহকারী শিক্ষক হিসেবে। তখন তারা সেটা মেনে নিলেন। কিন্তু ওই আইনের মধ্যে একটা বিধান যেটাতে বলা হলো যারা সরাসরি নিয়োগপ্রাপ্ত হবে, তাদের সিরিয়ালটা হবে উপরে।

‘আর যারা অধিগ্রহণ করা বেসরকারি স্কুল থেকে যারা এসেছেন তাদের সিরিয়ালটা হবে তাদের নিচে এবং তাদের আগের সময়কালের তারা যে চাকরি করেছে, চাকরির মেয়াদ গণনার ক্ষেত্রে পেনশন ৫০ শতাংশ কাউন্ট করা হবে, পেনশনের ক্ষেত্রে, গ্র্যাচুইটির ক্ষেত্রে। তো তারা বলল যে, না। আমরা আগে প্রধান শিক্ষক ছিলাম। ​আমরা এখন প্রধান শিক্ষক হব। আমরা এতদিনকার সিনিয়রিটি, আমরা ৫০ শতাংশ কেন কাউন্ট হবে? এবং তারা বললেন ৫০ শতাংশ কাউন্ট হলেও আমাদের প্রমোশনের ক্ষেত্রেও এগুলো হবে।  তারা হাইকোর্টে রিট করলেন। সবগুলো মিলিয়ে হাইকোর্টে রায় দিলেন যে, তাদেরকে যে এই পেছনে দেওয়া হলো, এটা আইনটা বাতিল করে দিলেন। এই আইন বাতিলের বিরুদ্ধে সরকার আপিল করলেন। আজ আপিল বিভাগ হাইকোর্টের রায় বাতিল করেছেন। এর ফলে প্রায় ৩২ হাজার প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সরকার প্রধান শিক্ষক নিয়োগ দিতে পারবে,’ বলেন অ্যাটর্নি জেনারেল।

২৬ হাজার থেকে ৩২ হাজার হওয়া প্রসঙ্গে অ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, অনেক সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক তো অবসরে গেছে। ওগুলোতে নিয়োগ হয় নাই। এই ২৬,০০০ এর সঙ্গে বাড়তে বাড়তে ২০১৩ সাল থেকে আজকে পর্যন্ত আরও ৬,০০০ বেড়ে আজকে প্রায় ৩২,০০০ হয়েছে। এগুলো সব সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়।

শেয়ার করতে

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *