✍︎ নাগরিক প্রতিবেদন ✍︎
লেখক ও গবেষক অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হক মারা গেছেন। ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন। রোববার দুপুরে রাজধানীর মিরপুরের একটি হাসপাতালে তিনি শেষনিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। মৃত্যুকালে বয়স হয়েছিল ৮৬ বছর।
বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক মোহাম্মদ আজম এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন। দুপুর আড়াইটা থেকে তিনটার মধ্যে তাঁর মৃত্যু হয় বলে জানান তিনি।
অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হক মিরপুরের একটি রেস্তোরাঁয় দুপুরে খেতে গিয়েছিলেন। সেখানেই অসুস্থ হয়ে পড়েন। পরে সেখানকার একটি হাসপাতালে তাঁর মৃত্যু হয়।
ফজলুল হকের জামাতা আনোয়ারুল হাসান জানিয়েছেন, ফজলুক হকের মরদেহ সোমবার সকাল ১০টা থেকে সাড়ে ১০টায় এ বাংলা একাডেমিতে নেওয়া হবে।
বাংলা একাডেমি থেকে বেলা ১১টায় মরদেহ নেওয়া হবে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে। সেখানে বেলা সাড়ে ১২টা পর্যন্ত শ্রদ্ধা নিবেদন করা হবে। এরপর দুপুর ১টায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাজেয় বাংলার সামনে কিছু সময় মরদেহ রাখা হবে। সবশেষে বাদ যোহর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মসজিদে জানাজা অনুষ্ঠিত হবে।
পরে অনুমতি সাপেক্ষে মিরপুরের শহীদ বুদ্ধিজীবী কবরস্থানে তাকে দাফন করা হতে পারে বলে জানিয়েছেন আনোয়ারুল হাসান।
আবুল কাসেম ফজলুল হকের জন্ম ১৯৪০ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর কিশোরগঞ্জের পাকুন্দিয়া উপজেলার পাকুন্দিয়া গ্রামে। তিনি অধ্যাপনা করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগে। বাংলা একাডেমির সভাপতি ছিলেন তিনি।
শিক্ষাজীবনে তিনি ময়মনসিংহ জিলা স্কুল থেকে মাধ্যমিক, আনন্দমোহন কলেজ থেকে উচ্চমাধ্যমিক এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগ থেকে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। ছাত্রজীবনে অধ্যাপক মুনীর চৌধুরী, আহমদ শরীফ, হুমায়ুন আজাদ ও নীলিমা ইব্রাহিমের সান্নিধ্যে এসে প্রগতিশীল চিন্তাধারার সঙ্গে যুক্ত হন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগে প্রায় চার দশক শিক্ষকতা করেন আবুল কাসেম ফজলুল হক। তিনি বিভাগীয় চেয়ারম্যান হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন। একই সঙ্গে নজরুল রচনাবলীর সম্পাদনা পরিষদের সদস্য ছিলেন এবং দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন জাতীয় দৈনিকে নিয়মিত কলাম লিখেছেন।
তাঁর উল্লেখযোগ্য গ্রন্থের মধ্যে রয়েছে মুক্তিসংগ্রাম (১৯৭২), কালের যাত্রার ধ্বনি (১৯৭৩), একুশে ফেব্রুয়ারি আন্দোলন (১৯৭৬), উনিশ শতকের মধ্যশ্রেণী ও বাংলা সাহিত্য (১৯৭৯), মানুষ ও তার পরিবেশ (১৯৮৮), সাহিত্যজিজ্ঞাসা: সাহিত্যসৃষ্টি ও সাহিত্যবিচার, জাতীয়তাবাদ, আন্তর্জাতিকতাবাদ, বিশ্বায়ন ও ভবিষ্যৎ, বুদ্ধির মুক্তি আন্দোলন ও উত্তরকাল, আধুনিকতাবাদ ও জীবনানন্দের জীবনোৎকণ্ঠা এবং বার্ট্রান্ড রাসেলের রাজনৈতিক আদর্শের বাংলা অনুবাদ।
তাঁর সম্পাদনায় প্রকাশিত হয়েছে মোতাহের হোসেন চৌধুরীর নির্বাচিত প্রবন্ধ, ইতিহাসের আলোকে বাংলাদেশের সংস্কৃতি এবং স্বদেশচিন্তাসহ একাধিক গ্রন্থ। পাশাপাশি তিনি ‘সুন্দরম’ ও ‘লোকায়ত’ নামে দুটি সাময়িকী সম্পাদনা করেন।
অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হক ১৯৮১ সালে বাংলা একাডেমি পুরস্কার পান।
২০২৪ সালের ২৭ অক্টোবর অন্তর্বর্তীকালীন সরকার তাকে বাংলা একাডেমির সভাপতি হিসেবে নিয়োগ দেয়। এর আগে ১৯৮১ সালে তিনি বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কারে ভূষিত হন। এছাড়া বাংলাদেশ লেখক শিবির পুরস্কার, আলাওল সাহিত্য পুরস্কার ও অলক্ত সাহিত্য পুরস্কারসহ বিভিন্ন সম্মাননা লাভ করেন।
রাষ্ট্র, রাজনীতি, সমাজ, ইতিহাস, সংস্কৃতি, দর্শন ও সাহিত্য নিয়ে তার গবেষণা ও প্রবন্ধ বাংলা চিন্তাজগতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান হিসেবে বিবেচিত হয়। তিনি ‘মুক্তিসংগ্রাম’, ‘একুশে ফেব্রুয়ারি আন্দোলন’, ‘উনিশশতকের মধ্যশ্রেণি ও বাংলা সাহিত্য’, ‘রাজনীতি ও দর্শন’, ‘রাষ্ট্রচিন্তায় বাংলাদেশ’, ‘মানুষের স্বরূপ’ এবং ‘শ্রেষ্ঠ প্রবন্ধ’সহ দুই ডজনেরও বেশি গ্রন্থের রচয়িতা।
এ ছাড়া তিনি দার্শনিক বার্ট্রান্ড রাসেলের ‘রাজনৈতিক আদর্শ’ ও ‘নবযুগের প্রত্যাশায়’ গ্রন্থ বাংলা ভাষায় অনুবাদ করেন এবং একাধিক গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থ সম্পাদনা করেন।
তার স্ত্রীর নাম ফরিদা প্রধান। তার দুই সন্তানের নাম যথাক্রমে শুচিতা শরমিন ও ফয়সল আরেফিন দীপন। তার মেয়ে শুচিতা শরমিন বর্তমানে বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। ছেলে ফয়সল আরেফিন দীপন জাগৃতি প্রকাশনীর স্বত্বাধিকারী ছিলেন। ২০১৫ সালের ৩১ অক্টোবর দীপনকে দুবৃত্তরা হত্যা করে।
দেখে যেতে পারলেন না ছেলে হত্যার বিচার
একমাত্র ছেলে ফয়সল আরেফিন দীপনকে হত্যা করা হয়েছিল। বিচারের রায়ও ঘোষণা হয়। কিন্তু সেই রায় কার্যকর হয়েছে— এমন চিত্র দেখে যেতে পারেননি বাংলা একাডেমির সভাপতি অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হক।
২০১৫ সালের ৩১ অক্টোবর রাজধানীর আজিজ কো-অপারেটিভ সুপার মার্কেটের তৃতীয় তলায় জাগৃতি প্রকাশনীর অফিসে হত্যা করা হয় দীপনকে।
ছেলেকে হারিয়ে বুক ভরা হাহাকার নিয়ে প্রতিক্রিয়া জানিয়েছিলেন অধ্যাপক হক। বলেছিলেন, ‘আমি কোনো বিচার চাই না। আমি চাই শুভবুদ্ধির উদয় হোক। যারা ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ নিয়ে রাজনীতি করছেন, যারা রাষ্ট্রধর্ম নিয়ে রাজনীতি করছেন, উভয় পক্ষ দেশের সর্বনাশ করছেন। উভয় পক্ষের শুভবুদ্ধির উদয় হোক। এটুকুই আমার কামনা। জেল-ফাঁসি দিয়ে কী হবে।’
বিচারহীনতার সংস্কৃতির ওপর বিরাট ক্ষোভ ছিল তার। দেশের বিচার ব্যবস্থার ওপর আস্থা না থাকার প্রতিফলন ছিল ওই প্রতিক্রিয়া। শেষ পর্যন্ত আদালতে এই হত্যার বিচার হলেও দীর্ঘসূত্রিতার কারণে রায় কার্যকর হয়নি।
২০২১ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি দীপন হত্যা মামলায় আট আসামির সবাইকে মৃত্যুদণ্ড দেন ঢাকার সন্ত্রাসবিরোধী ট্রাইব্যুনালের বিচারক মো. মজিবুর রহমান।
মৃত্যুদণ্ড পাওয়া ৮ আসামি হলেন- মইনুল হাসান শামীম ওরফে সিফাত সামির, আবদুস সবুর ওরফে আবদুস সামাদ, খাইরুল ইসলাম ওরফে জামিল রিফাত, আবু সিদ্দিক সোহেল ওরফে সাকিব সাজিদ, মোজাম্মেল হুসাইন ওরফে সায়মন, শেখ আবদুল্লাহ ওরফে জুবায়ের, চাকরিচ্যুত মেজর সৈয়দ জিয়াউল হক ও আকরাম হোসেন ওরফে হাসিব। তারা সবাই নিষিদ্ধ জঙ্গি সংগঠন আনসার আল ইসলামের সদস্য।
এদের মধ্যে জিয়া ও আকরাম বিচারের শুরু থেকেই পলাতক ছিলেন। ২০২২ সালের নভেম্বরে অন্য একটি মামলায় ঢাকা আদালতে হাজিরা দিতে নেওয়ার সময় পালিয়ে যায় মইনুল হাসান শামীম ও আবু সিদ্দিক সোহেল।
বিচারিক আদালতে রায়ের এক সপ্তাহের মধ্যেই এই মামলার ডেথ রেফারেন্স ও জেল আপিল হাইকোর্টে আসে। সেসব এখনো শুনানির অপেক্ষায়।
বিচারিক আদালতে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামিদের ফাঁসির রায় কার্যকরের আগে হাইকোর্টের অনুমতি লাগে। সেটাই ডেথ রেফারেন্স। পাশাপাশি বিচারিক আদালতের ফাঁসির রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করে থাকেন আসামিরা।
হাইকোর্টে আপিল শুনানি হয় মূলত বছরভিত্তিক। বর্তমানে ২০১৮ সালের আপিল ও ডেথ রেফারেন্সগুলোর শুনানি চলছে বলে কর্মকর্তারা জানাচ্ছেন। দীপন হত্যার রায় হয় ২০২১ সালে। ফলে এসব শুনানির জন্য আরও অপেক্ষা করতে হবে দীর্ঘ সময়। তবে রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবীদের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে এসব ডেথ রেফারেন্সের শুনানি হতে পারে।
বিচারিক আদালতে আসামিপক্ষের আইনজীবী এমএবিএম খাইরুল ইসলাম। তিনি জানান, রায়ের পর আসামিদের সাথে তার কোনো যোগাযোগ হয়নি। ফলে মামলার সর্বশেষ অবস্থা তার জানা নেই।
তবে উচ্চ আদালতে এ মামলার বিচার দীর্ঘায়িত হতে পারে— এমন আশঙ্কা থেকে মামলার দ্রুত নিষ্পত্তি ও রায় কার্যকরের দাবি জানিয়েছিলেন অধ্যাপক হক।
রায়ের পর এক প্রতিক্রিয়ায় বলেছিলেন, ‘বাংলাদেশকে বলা হত বিচারহীনতার সংস্কৃতির দেশ। এখন বিভিন্ন মামলা চলছে, রায় হচ্ছে। দীপন হত্যার বিচারের রায়ও হয়েছে, এটি একটি ভালো দিক। বিচারের যে রায় হয়েছে তাতে বিচারকই বলেছেন, এটি একটি দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি। অপরাধীদের বিরুদ্ধে অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হয়েছে। তবে আসামিরা হাইকোর্টে আপিল করবে। এরপর মামলা যাবে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে। সামনে এই বিচার দীর্ঘায়িত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। বিচার দ্রুত নিষ্পত্তি করে রায় তাড়াতাড়ি কার্যকর হবে— অবশ্যই এটি চাই।’
সে সময় তিনি আরও মন্তব্য করেন, ‘দীপন নেই, আমরা বেঁচে আছি। আমরা দীপনকে বাঁচাতে ব্যর্থ হয়েছি। দীপনকে কোনো দিন পাওয়া যাবে না। এজন্য কষ্টের-যন্ত্রণার অন্ত নেই। বাবা হিসেবে এই বোধ দারুণভাবে যন্ত্রণা দেয়। তবে এই রায়টি আমাদের কিছুটা হলেও স্বস্তি দেবে। আমাদের এখন পারিবারিকভাবে এই সান্ত্বনা ছাড়া আর কিছু নেই। দেশে আইনের শাসন সুপ্রতিষ্ঠিত করার জন্য যে কোনো অপরাধের বিচার হওয়া উচিত এবং যারা প্রকৃত অপরাধী তাদের যেন শাস্তি হয়।’
আবুল কাসেম ফজলুল হকের মৃত্যুতে প্রধানমন্ত্রীর শোক
বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ ও বাংলা একাডেমির সভাপতি অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হকের মৃত্যুতে গভীর শোক ও দুঃখ প্রকাশ করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
এক শোকবার্তায় প্রধানমন্ত্রী বলেন, “অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হকের মৃত্যুতে দেশ একজন প্রখ্যাত শিক্ষাবিদ ও লেখককে হারালো”।
তিনি বলেন, “তার মৃত্যুতে দেশের শিক্ষা অঙ্গনে যে শূন্যতার সৃষ্টি হয়েছে, তা সহজে পূরণ হওয়ার নয়”।
প্রধানমন্ত্রী মরহুমের রুহের মাগফেরাত ও চিরশান্তি কামনা করেন এবং শোকসন্তপ্ত পরিবারের সদস্যদের প্রতি গভীর সমবেদনা জানান।
