✍︎ নাগরিক নিউজ ডেস্ক ✍︎
ফিলিস্তিনের গাজা উপত্যকায় নিজেদের প্রশাসনিক পর্ষদ বিলুপ্তির ঘোষণা দিয়েছে হামাস। সংগঠনটি গত দুই দশক ধরে অঞ্চলটি শাসন করে আসছিল। এই ঘোষণার মাধ্যমে উপত্যকার বেসামরিক শাসন পরিচালনার দায়িত্ব পেতে যাচ্ছে ‘ন্যাশনাল কমিটি ফর দ্য অ্যাডমিনিস্ট্রেশন অব গাজা’ বা এনসিএজি।
গত বছরের অক্টোবরে হামাস ও ইসরায়েলের মধ্যে যুদ্ধবিরতির পর ডোনাল্ড ট্রাম্পের ‘বোর্ড অব পিস’ বা শান্তি পর্ষদ উদ্যোগের আওতায় এনসিএজি গঠন করা হয়। তখন দেওয়া ঘোষণা অনুযায়ী, এনসিএজি গাজা উপত্যকার নিয়মিত প্রশাসনিক ও সরকারি সেবা দেওয়ার কাজ করবে।
হামাসের এই পদক্ষেপকে একটি তাৎপর্যপূর্ণ রাজনৈতিক পরিবর্তন হিসেবে দেখা হচ্ছে। ২০০৬ সালের নির্বাচনে জয়ের পর ২০০৭ সালে প্রতিদ্বন্দ্বী গোষ্ঠী ফাতাহর কাছে থেকে গাজার নিয়ন্ত্রণ নেয় হামাস। গত অক্টোবরে যুদ্ধবিরতির পর থেকেই সংগঠনটি শাসনভার ছেড়ে দেওয়ার ইঙ্গিত দিচ্ছিল।
হামাসের সরকারি গণমাধ্যম দপ্তরের প্রধান ইসমাইল আল-থাওয়াবতা সোমবার বলেন, সরকারের জরুরি কমিটির প্রধান মোহাম্মদ আল-ফাররা আনুষ্ঠানিকভাবে তাঁর পদত্যাগপত্র জমা দিয়েছেন। এনসিএজির কাছে ক্ষমতা হস্তান্তরের প্রক্রিয়া সহজ করতে তিনি বর্তমান প্রশাসনিক পর্ষদ বিলুপ্ত করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।
হামাসের মুখপাত্র হাজেম কাসেম এএফপিকে বলেন, দখলদার ইসরায়েলি বাহিনীর সব ধরনের অজুহাত এড়াতে তারা এমন সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। নতুন এই পদক্ষেপের কারণে উপত্যকার শাসনভার আর হামাসের হাতে থাকবে না।
এদিকে হামাস তাদের প্রশাসনিক পর্ষদ বিলুপ্তির ঘোষণা দেওয়ার পরপরই ‘বোর্ড অব পিস’ জানিয়েছে, এনসিএজি গাজার সব ধরনের অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ করার দায়িত্ব নেবে। এক্সে দেওয়া পোস্টে বোর্ড আরও জানায়, এক কর্তৃপক্ষ, এক আইন এবং এক অস্ত্র- এই মূলনীতির কোনো পরিবর্তন হয়নি। ফলে সব ধরনের অস্ত্র এনসিএজির অধীনে একত্রিত ও নিয়ন্ত্রিত হবে।
হামাসের আরেকজন কর্মকর্তা বলেছেন, সম্প্রতি কায়রোতে অনুষ্ঠিত এক বৈঠকে গোষ্ঠীটি ফিলিস্তিনের অন্যান্য উপদলগুলোকে এই সিদ্ধান্তের কথা জানিয়ে দিয়েছে। ওই কর্মকর্তা বলেন, উপদলগুলো হামাসের এই সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়েছে। তারা এটিকে গাজার শাসনভার গ্রহণের ক্ষেত্রে জাতীয় কমিটির সক্ষমতা বৃদ্ধির একটি বড় ও আন্তরিক পদক্ষেপ হিসেবে বর্ণনা করেছে।
হামাসের এই কমিটি বিলুপ্তির ফলে ফিলিস্তিনি কর্মকর্তা আলী শাথের নেতৃত্বাধীন ন্যাশনাল কমিটি ফর দ্য অ্যাডমিনিস্ট্রেশন অব গাজা (এনসিএজির) প্রশাসনিক দায়িত্ব নেওয়ার পথ উন্মুক্ত হলো।
হামাসের ঘোষণায় গাজা শান্তি বোর্ডের প্রতিক্রিয়া
গাজায় দীর্ঘ দুই দশকের শাসন ব্যবস্থার অবসান ঘটিয়ে জরুরি প্রশাসনিক কমিটি বিলুপ্ত করার ঘোষণা দিয়েছে ফিলিস্তিনের স্বাধীনতাকামী সংগঠন হামাস। গাজায় বেসামরিক শাসন চালু এবং ইসরায়েলের বর্বর হামলা থামানোর উদ্দেশে সোমবার (৬ জুলাই) এই ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত নেয় তারা। হামাসের এই বড় রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর এর আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে গাজাকেন্দ্রিক গঠিত আন্তর্জাতিক ‘বোর্ড অব পিস’ (শান্তি বোর্ড)।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প নিয়ন্ত্রিত এই বোর্ডটি জানিয়েছে, তারা হামাসের কেবল মুখের কথায় বিশ্বাসী নয়। বরং গাজার মাটিতে তারা হামাসের বাস্তব পদক্ষেপ দেখতে চায়।
গাজা শান্তি বোর্ড জানায়, গাজার জরুরি কমিটি বিলুপ্ত করার বিষয়ে হামাসের ঘোষণা আমাদের নজরে এসেছে। তবে চূড়ান্তভাবে আমাদের মূল্যায়ন কেবল কোনো মৌখিক প্রতিশ্রুতির ওপর ভিত্তি করে হবে না। গাজার সাধারণ মানুষের জরুরি ও মৌলিক চাহিদাগুলো পূরণে মাঠপর্যায়ে কী ধরনের বাস্তব পদক্ষেপ বা কাজ নেওয়া হচ্ছে, আমরা সেটিই পর্যবেক্ষণ করব।
বিতর্কিত এই শান্তি বোর্ডে ফিলিস্তিনের কোনো প্রতিনিধি বা সদস্য রাখা হয়নি।
হামাসের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, সরকারের জরুরি কমিটির প্রধান মোহাম্মদ আল-ফাররা আনুষ্ঠানিকভাবে তার পদত্যাগপত্র জমা দিয়েছেন। প্রশাসনিক ও সরকারি দায়িত্ব রূপান্তরের প্রক্রিয়াটিকে সহজ করতে এই কমিটি বিলুপ্ত করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এর ফলে ন্যাশনাল কমিটি ফর দ্য অ্যাডমিনিস্ট্রেশন অব গাজা (এনসিএজি)-এর হাতে ক্ষমতা হস্তান্তরের পথ সম্পূর্ণ সুগম হলো।
গত ২০২৫ সালের অক্টোবর মাসে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের মধ্যস্থতায় হামাস ও ইসরায়েলের মধ্যে গাজায় ‘যুদ্ধবিরতি’ চুক্তি সই হয়েছিল। সেই সময় ট্রাম্পের উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত ‘বোর্ড অব পিস’ গাজার বেসামরিক প্রশাসনিক কাজ সচল রাখার জন্য এই এনসিএজি কমিটি গঠন করে।
হামাসের মুখপাত্র হাজেম কাসেম স্পষ্ট করে বলেছেন, হামাস এই নতুন পদক্ষেপটি নিয়েছে যাতে দখলদার ইসরায়েলি বাহিনীর গাজায় আগ্রাসন ও নিধন যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার আর কোনো অজুহাত না থাকে। এই কমিটির শতভাগ সাফল্য নিশ্চিত করতে হামাস সমস্ত সরকারি দায়দায়িত্ব ও ক্ষমতা তাদের হাতে বুঝিয়ে দিতে সম্পূর্ণ প্রস্তুত রয়েছে।
এদিকে কূটনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, ফিলিস্তিনিদের প্রতি এই পিস বোর্ডের আচরণ বরাবরই পক্ষপাতদুষ্ট। গত অক্টোবর মাসে যুদ্ধবিরতি চুক্তি হওয়ার পর থেকে ইসরায়েলি বাহিনী প্রতিদিন সেই শর্ত লঙ্ঘন করে চলেছে। গাজায় ইসরায়েলি সেনাদের এই নিত্যদিনের বর্বরোচিত হামলা, ফিলিস্তিনিদের হত্যা ও আহত করার ঘটনাগুলোর বিরুদ্ধে এই ‘বোর্ড অব পিস’-কে খুব কম সময়ই নিন্দা জানাতে বা মুখ খুলতে দেখা গেছে। এই পরিস্থিতিতে হামাসের ক্ষমতা হস্তান্তরের প্রক্রিয়াটিকে তারা কতটা সততার সাথে মূল্যায়ন করে, এখন সেটিই দেখার বিষয়।
