আবু সাঈদের মৃত্যুই অভ্যুত্থানের সূচনা করেছিল

✍︎ নাগরিক প্রতিবেদন ✍︎

২০২৪ সালের ১৬ জুলাই কোটা সংস্কার আন্দোলনে পুলিশের গুলির সামনে বুক চিতিয়ে সাহস নিয়ে দাঁড়িয়ে ছিলেন আবু সাঈদ। চব্বিশের এই বীরের আত্মত্যাগে জ্বলে ওঠা আন্দোলনের দাবানল শেষ পর্যন্ত গণঅভ্যুত্থানে রূপ নেয়। হাসিনার দমননীতি উপেক্ষা করে ছাত্র-জনতার ক্রোধ ও ক্ষোভের দীর্ঘ নিঃশ্বাস পরিণত হয় অপ্রতিরোধ্য শক্তিতে। ত্বরান্বিত হয় দীর্ঘ ১৫ বছরের দুঃশাসনের অবসান। চব্বিশের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার তোপের মুখে দেশ ছেড়ে পালিয়ে যান স্বৈরশাসক শেখ হাসিনা।

ঐতিহাসিক সেই জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সূচনা ছিল শহীদ আবু সাঈদ। গুলিবিদ্ধ হয়ে মৃত্যুর আগে দুই হাত প্রসারিত করে এই আন্দোলনকে ছড়িয়ে দিয়ে গেছেন দেশজুড়ে। আবু সাঈদের আত্মত্যাগের আজ দুই বছর।

এরই মধ্যে আবু সাঈদ হত্যার ঘটনায় মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলার রায় হয়েছে। কিন্তু আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন না হওয়ায় এখনো রায় কার্যকর হয়নি।

জুলাইয়ের শহীদ আবু সাঈদের মা-বাবার চাওয়া- জীবদ্দশায় দায়ী পুলিশ সদস্যদের সর্বোচ্চ শাস্তি দেখে যাওয়া। একই চাওয়া তার সহপাঠী ও জুলাইযোদ্ধাদের। যদিও রায় কার্যকর হওয়া নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেছেন আবু সাঈদের বড় ভাই। দাবি উঠেছে, আবু সাঈদের আত্মত্যাগের ইতিহাস যেন দলীয়করণে ম্লান না করা হয়। অতীতের মতো যেন না হয় রাজনীতি, সঠিক ইতিহাসে যেন ঠাঁই পান আবু সাঈদ।

২০২৪ সালের ১৬ জুলাই কোটা সংস্কারের দাবিতে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা জড়ো হন বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয় সংলগ্ন রংপুর-কুড়িগ্রাম-ঢাকা মহাসড়কের পার্ক মোড়ে। সেখানে আগে থেকেই তৎকালীন সরকারদলীয় সংগঠন ছাত্রলীগ ও যুবলীগের নেতাকর্মীরাসহ মারমুখী মনোভাবে অবস্থান নেওয়া পুলিশের উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো।

এর আগের দিন ১৫ জুলাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে আন্দোলনকারীদের ওপর ছাত্রলীগের হামলার প্রতিবাদে ১৬ জুলাই দেশব্যাপী বিক্ষোভ কর্মসূচি পালন করে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন। এদিন আবারও রংপুরসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে বিক্ষোভকারীদের ওপর হামলা চালানো হয়।

১৬ জুলাই, দুপুর ২টা ১৩ মিনিট। পার্কের মোড়ে শিক্ষার্থীদের স্লোগান, পুলিশের টিয়ারশেল, লাঠিচার্জ তার মধ্যে সাহসিকতার প্রতীক হয়ে বুক চিতিয়ে দুই হাত প্রসারিত করে দাঁড়িয়ে পড়ে কালো টি-শার্ট পড়া এক যুবক। তিনি হলেন আবু সাঈদ। কিছু বুঝে উঠার আগেই পুলিশের গুলিতে সড়কে লুটিয়ে পড়েন। আবু সাঈদকে লক্ষ্য করে পুলিশের ছোড়া গুলি করার দৃশ্য মুহূর্তের মধ্যে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। হাসপাতালে পৌঁছানোর আগেই নিভে যায় আবু সাঈদের প্রাণ প্রদ্বীপ। সেইদিন ছাত্রলীগ ও পুলিশের হামলায় রংপুরে আবু সাঈদসহ সারাদেশে অন্তত ছয়জন নিহত হন।

এসব হত্যাকাণ্ড দেশজুড়ে ছাত্র-জনতার মধ্যে ব্যাপক ক্ষোভের জন্ম দেয়। কোটা সংস্কার আন্দোলন থেকে গড়ে ওঠা বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে নতুনমাত্রা যোগ হয়। আবু সাঈদের প্রসারিত দুই হাত সারাদেশের ছাত্র-জনতাকে জাগ্রত করে তোলে। দেশজুড়ে ক্ষোভের বিস্ফোরণ ঘটে। রংপুরসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে তীব্র আন্দোলন গড়ে ওঠে।

আবু সাঈদকে বাঁচাতে সর্বপ্রথম এগিয়ে আসেন আয়ান

কোটা সংস্কার আন্দোলনে ১৬ জুলাই আবু সাঈদ পুলিশের গুলিতে আহত হওয়ার পরপরই সর্বপ্রথম এগিয়ে আসেন সিয়াম আহসান আয়ান। আবু সাঈদ হত্যার ঘটনায় মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২-এ সেদিনের ঘটনার সাক্ষ্য দিয়েছেন এই শিক্ষার্থী। গুলিবিদ্ধ হওয়ার পর তিনিই আবু সাঈদকে বাঁচাতে হাসপাতালে নিয়ে যান।

সেদিনের ঘটনার বর্ণনা তুলে ধরে কারমাইকেল কলেজে অনার্সে অধ্যয়নরত এই শিক্ষার্থী বলেন, পুলিশের আক্রমণে সবাই সরে যাওয়ার সময় আবু সাঈদ ভাই পুলিশের বন্দুকের নলের সামনে এসে দাঁড়ান। বুক টান করে হাতটা দুই দিকে ছড়িয়ে দেন। সে সময় পুলিশ ভাইকে লক্ষ্য করে গুলি করতে থাকে। আমি তার থেকে ২০ হাত দূরে ছিলাম। আমি খেয়াল করলাম আবু সাঈদ ভাইকে রেখে সবাই চলে যাচ্ছে। তখনো আমি আবু সাঈদ ভাইকে চিনতাম না, শুধু মাইকে তার নাম শুনেছি। আমার মনে হলো, ভাই কারও সন্তান, কারও ভাই। তার জায়গায় যদি আমি থাকতাম, তখন যদি আমাকে কেউ একা ফেলে যেত। এরপর আমি যত দ্রুত সম্ভব ভাইকে বাঁচাতে তার দিকে ছুটে যাই। যদি আর কিছুক্ষণ আগে আসতাম, হয়তো তাকে বাঁচাতে পারতাম।

সিয়াম আহসান আয়ান আরও বলেন, গুলিবিদ্ধ হওয়ার পর আবু সাঈদ ভাই রোড ডিভাইডারটা ক্রস করে মাটিতে বসে পড়েন, আমি তাকে টেনে তোলার চেষ্টা করি। ওই সময়টাতে বিশ্ববিদ্যালয়ের এক নম্বর গেটের সামনে থেকে হেলমেট পরিহিত একজন পুলিশ অফিসার সাঈদ ভাইয়ের দিকে পিস্তল তাক করেছিলেন। আমি সে সময় শেষ চেষ্টাটা করলাম। আবু সাঈদ ভাইকে গুলি থেকে বাঁচাতে আমি তাকে বাম পাশে নিলাম, আর সঙ্গে সঙ্গে গুলিটা এসে লাগল আমার হাতের ডান পাশে। তখন সাঈদ ভাই একেবারে পড়ে যান। আমার হাতটা শক্ত করে ধরে তিনি বললেন, ‘আমাকে বাঁচাও।’ এরই মধ্যে অন্যরাও এগিয়ে এসে ভাইকে রিকশায় করে মেডিকেলে নিয়ে যান। আমি সে সময় স্পটেই অবস্থান করছিলাম।

দুবার গুলিবিদ্ধ হন আবু সাঈদ

দুই হাত প্রসারিত করে বিশ্ববিদ্যালয়ের এক নম্বর গেটের সামনে দাঁড়িয়ে ছিলেন আবু সাঈদ। কিছুক্ষণের মধ্যেই গুলিবিদ্ধ হয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়েন তিনি। সামান্য পিছু হঠলে আবারও গুলিবিদ্ধ হন। গুরুতর অবস্থায় হাসপাতালে নিলে তাকে মৃত ঘোষণা করেন চিকিৎসক। গত বছরের ১১ নভেম্বর আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে দেওয়া সাক্ষ্যে এমনটিই উল্লেখ করেন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের রংপুর জেলার দায়িত্বপ্রাপ্ত অন্যতম নেতা ইমরান আহমেদ।

তিনি বলেন, ঠিক তখনই বিশ্ববিদ্যালয়ের এক নম্বর গেটের সামনে দুই হাত প্রসারিত করে দাঁড়িয়ে যান আবু সাঈদ। ওই সময় খুব কাছ থেকে তাকে গুলি করে পুলিশ। প্রথম গুলি খাওয়ার পর সামান্য একটু পিছিয়ে পড়েন তিনি। কিন্তু আবারও গুলিবিদ্ধ হন। তখন সড়কের বিভাজক (ডিভাইডার) পার হয়ে একটু পেছনে আসেন। আরেকটু পেছনে থাকা আয়ান এগিয়ে এসে আবু সাঈদকে ধরেন। এরপর একটু সরে যাওয়ার পর সাজু রায়সহ আরও কয়েকজন মিলে তাকে হাসপাতালে নিয়ে যান। এক ঘণ্টা পর তার মৃত্যুর খবর পাই আমরা।

প্রাণঘাতী ধাতব গুলিতে আবু সাঈদের মৃত্যু

জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনার (ওএইচসিএইচআর) ‘বাংলাদেশে ২০২৪ সালের জুলাই ও আগস্টের বিক্ষোভের সঙ্গে সম্পর্কিত মানবাধিকার লঙ্ঘন ও নির্যাতন’ শীর্ষক একটি তথ্য অনুসন্ধান প্রতিবেদন প্রকাশ করে।

প্রতিবেদনে বলা হয়, বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র আবু সাঈদ ২০২৪ সালের ১৬ জুলাই বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সময় প্রাণঘাতী ধাতব গুলিতে শহীদ হন এবং ইচ্ছাকৃত বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছেন বলে উল্লেখ করা হয়।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়- সঠিক ময়নাতদন্ত না হওয়া সত্ত্বেও নথিপত্র অনুযায়ী ক্ষত ও সম্পর্কিত ভিডিও ফুটেজ এই সিদ্ধান্তকে সমর্থন করে যে আবু সাঈদকে কমপক্ষে দুটি প্রাণঘাতী ধাতব গুলি করে হত্যা করা হয়েছে।

প্রাপ্ত তথ্য ও বিশ্লেষণের ভিত্তিতে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে- আবু সাঈদ পুলিশের ইচ্ছাকৃত বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছেন বলে বিশ্বাস করার যুক্তিসঙ্গত কারণ রয়েছে।

অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের তথ্য অনুযায়ী, পুলিশের ধাওয়ায় শিক্ষার্থীরা ছত্রভঙ্গ হয়ে পড়লে আবু সাঈদ দুই হাত মেলে বুক পেতে রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকেন। ঠিক সেই মুহূর্তে রাস্তার বিপরীত পাশের মাত্র ১৪ থেকে ১৫ মিটার দূর থেকে অন্তত দুই পুলিশ সদস্য শটগান থেকে সরাসরি তার ওপর গুলি চালান।

আবু সাঈদ হত্যা মামলার আসামিদের সাজা

শহীদ আবু সাঈদ হত্যা মামলার পূর্ণাঙ্গ রায় এ বছরের ৯ এপ্রিল প্রকাশ করা হয়। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ এই মামলায় সাবেক দুই পুলিশ সদস্যকে মৃত্যুদণ্ড এবং তিনজনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দিয়েছেন। বাকি ২৫ আসামিকে বিভিন্ন মেয়াদে সাজা দেওয়া হয়েছে।

মৃত্যুদণ্ড পাওয়া দুই আসামি হলেন- পুলিশের সাবেক এএসআই আমির হোসেন এবং কনস্টেবল সুজন চন্দ্র রায়। এ ছাড়া সাবেক সহকারী পুলিশ কমিশনার আরিফুজ্জামান জীবন, তাজহাট থানার তৎকালীন পুলিশ পরিদর্শক রবিউল ইসলাম নয়ন এবং এসআই বিভূতি ভূষণ রায় মাধবকরকে যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।

মামলার আসামি বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন উপাচার্য হাসিবুর রশীদ, গণিত বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক মশিউর রহমান, লোকপ্রশাসন বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক আসাদুজ্জামান মণ্ডল, রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের তৎকালীন কমিশনার মনিরুজ্জামান এবং বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের সভাপতি পোমেল বড়ুয়াকে ১০ বছর করে কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া বাকি আসামিদের দোষী সাব্যস্তক্রমে তিন বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।

বেঁচে থাকতেই রায় কার্যকর দেখতে চান আবু সাঈদের অসুস্থ বাবা

শহীদ আবু সাঈদের বাবা মকবুল হোসেন বলেন, ১৬ জুলাই আমার ছেলে সকালে ভাতও খায়নি। বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের নিয়ে মিছিলে যায়। পুলিশের সামনে দুই হাত প্রসারিত করে বুক পেতে দেয়। কিছু নির্দিষ্ট পুলিশ সদস্য আমার ছেলেকে গুলি করে হত্যা করে। আমরা সেই ভিডিও পরে টেলিভিশনে দেখেছি। এর আগে মানুষের মুখে মুখে শুনেছি আবু সাঈদ মারা গেছে। এটা শোনার পর আমার দুনিয়া ওলটপালট হয়ে যায়। আমরা লাশ আনতে রংপুর গিয়ে শুনতে পাই, পুলিশ লাশ গুম করেছে। হাসপাতালের মর্গে আমার ছেলেকে একবারের জন্যও দেখতে দেয়নি। ছাত্ররা মেডিকেল থেকে লাশ নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে যাওয়ার চেষ্টা করলে পুলিশ তাদের কাছ থেকে লাশ কেড়ে নিয়ে মারধর করে।

তিনি আরও বলেন, গভীর রাতে ১৬-১৭টা গাড়িসহ পুলিশি নিরাপত্তা দিয়ে গ্রামে লাশ আনে প্রশাসন। তারা আমাকে ওই রাতেই লাশ দাফন করার জন্য চাপ দিতে থাকে, কিন্তু আমি তাতে রাজি হইনি। পরে আমরা সকাল ৯টার দিকে লাশটা দাফন করি। দেরি হওয়ায় পুলিশ আমাদের বিভিন্নভাবে জিজ্ঞাসাবাদ করে, ভয় দেখায়। আমি বিচার দেখতে চাই। হত্যা মামলায় যে রায় হয়েছে, তা আমি বেঁচে থাকতে দেখে যেতে চাই। সরকার যেন সেই ব্যবস্থা করে।

অসুস্থ শরীরে কাঁপা কণ্ঠে মকবুল হোসেন আরও বলেন, শেখ হাসিনা টিভিতে বলেছিলেন- মুক্তিযোদ্ধার নাতি-নাতনিদের চাকরি দেবেন না তো রাজাকারের ছেলেদের চাকরি দেবেন? তার ভাষায়, মুক্তিযোদ্ধা যদি এক কোটি হন, তাহলে বাকি ১৫ কোটি মানুষ সবাই রাজাকার—এই বক্তব্যে মানুষ ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে।

কবরের দিকে তাকালে ছেলের মুখটা চোখের সামনে ভাসে

শহীদ আবু সাঈদের মা মনোয়ারা বেগম বলেন, আমার ছেলে বাড়িতে এলে সবার খোঁজখবর নিত। বোনদের শ্বশুরবাড়িতে যেত, তাদের পছন্দের ফলমূল-খাবার কিনে আনত। বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাড়িতে এলে সবার আগে আমাকে ডাকত, জড়িয়ে ধরত, কথা বলে খোঁজ নিত। রংপুরে থাকলে ফোন দিয়ে কথা বলত। ওর সঙ্গে বাড়ির সবার ভালো সম্পর্ক ছিল। সবার আদরের ছেলে ছিল আবু সাঈদ। সেই ছেলে আমার নেই। এখন আর কেউ ফোন করে বলে না, মা কেমন আছো। আমার ছেলে নেই, কত কষ্ট যে বুকে চাপা দিয়ে আছি, আল্লাহ ছাড়া কেউ জানে না।

তিনি আরও বলেন, আমার মতো অনেক মা সন্তান হারিয়েছেন। আমার কষ্ট তাদের কষ্ট একই। আমি বেঁচে থাকতে সেই কষ্ট কমাতে চাই। আমার ছেলের হত্যাকারী পুলিশদের ফাঁসি দেখতে চাই। শুধু আমার আবু সাঈদের হত্যাকারীদের বিচার করলে হবে না, সরকারকে সকল শহীদের মায়ের কষ্ট বুঝতে হবে, সকল হত্যার বিচার করতে হবে। আমি যখন ছেলের কাপড়গুলো দেখি, বই-খাতা দেখি, তখন বুকটা ফেটে যায়। হাউমাউ করে কাঁদতে থাকি। ছেলের ব্যবহারের সবকিছু আছে, শুধু আমার কলিজার টুকরা আবু সাঈদ নেই। কবরের দিকে তাকালে ছেলের মুখটা চোখের সামনে ভাসে।

শহীদ জুলাই দিবসে আবু সাঈদের কবরে মানুষের ঢল

রংপুরের পীরগঞ্জ উপজেলার বাবনপুর গ্রামে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের প্রথম শহীদ আবু সাঈদের দ্বিতীয় শাহাদাতবার্ষিকী উপলক্ষে বৃহস্পতিবার দিনব্যাপী শ্রদ্ধা, স্মরণ ও দোয়ার আয়োজন অনুষ্ঠিত হয়েছে। সকাল থেকেই তাঁর কবর জিয়ারত ও শ্রদ্ধা নিবেদনে ভিড় করেন বিভিন্ন রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং নানা শ্রেণি-পেশার মানুষ।

শহীদ জুলাই দিবস উপলক্ষে আবু সাঈদের কবর জিয়ারত করে তাঁর আত্মার মাগফিরাত কামনা করেন পীরগঞ্জ উপজেলা জামায়াতে ইসলামীর নেতাকর্মীরা। পরে বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও কর্মকর্তারা তাঁর কবরে ফুলেল শ্রদ্ধা নিবেদন করেন।

এছাড়া বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, ছাত্রসংগঠন, সামাজিক সংগঠন, স্থানীয় প্রশাসনের প্রতিনিধি এবং দূর-দূরান্ত থেকে আগত সাধারণ মানুষ শহীদের স্মৃতির প্রতি সম্মান জানাতে উপস্থিত হন।

শ্রদ্ধা নিবেদন শেষে অনেকেই বলেন, আবু সাঈদের আত্মত্যাগ কেবল একটি আন্দোলনের অংশ ছিল না, বরং বৈষম্যহীন সমাজ ও মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রামের প্রতীক। তাঁরা জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের চেতনাকে সমুন্নত রাখার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন।

২০২৪ সালের ১৬ জুলাই বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সময় বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের শিক্ষার্থী আবু সাঈদ পুলিশের গুলিতে নিহত হন। তাঁর মৃত্যু দেশব্যাপী আন্দোলনে নতুন গতি সঞ্চার করে এবং পরবর্তীতে গণ-অভ্যুত্থানের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অনুপ্রেরণায় পরিণত হয়। সেই স্মৃতিকে ধারণ করে প্রতি বছর ১৬ জুলাই ‘শহীদ জুলাই দিবস’ পালিত হচ্ছে।

এদিকে আবু সাঈদের আত্মত্যাগের মূল লক্ষ্য ছিল সমাজ থেকে বৈষম্য দূর করা এবং মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠা করা। তবে সেই লক্ষ্য এখনো পুরোপুরি অর্জিত হয়নি বলে মনে করেন তাঁর বাবা মকবুল হোসেন। তিনি বলেন, ন্যায়বিচার ও সমঅধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য তাঁর ছেলের আত্মত্যাগকে যথাযথ মর্যাদা দিতে হবে।

অন্যদিকে শহীদ জুলাই দিবস উপলক্ষে বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে অবস্থিত আবু সাঈদের স্মৃতিস্তম্ভে পুষ্পস্তবক অর্পণ করেন সরকারের বিভিন্ন পর্যায়ের প্রতিনিধিরা। এ সময় পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেন আজাদ বলেন, “শহীদ আবু সাঈদ শত বাধা, নির্যাতন, টিয়ারশেল ও লাঠিচার্জের মুখেও পিছিয়ে যাননি। মৃত্যুর ঝুঁকি উপেক্ষা করে তিনি গণতন্ত্র ও মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার পক্ষে অবস্থান নিয়েছিলেন। তাঁর আত্মত্যাগ জাতির ইতিহাসে চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে।”

পরে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী আহমেদ আযম খান স্মৃতিস্তম্ভে শ্রদ্ধা নিবেদন শেষে বলেন, “জুলাই আন্দোলনে যারা নির্মমভাবে গুলি চালিয়ে অসংখ্য মায়ের বুক খালি করেছে, তাদের কোনোভাবেই ছাড় দেওয়া হবে না। প্রকৃত অপরাধীদের আইনের আওতায় এনে ন্যায়ভিত্তিক বিচার নিশ্চিত করা হবে। আমরা প্রহসনের বিচার চাই না, সত্যিকারের দায়ীদের বিচার চাই। বিচার করতে সময় লাগলেও তা হবে ন্যায়সঙ্গত ও দৃষ্টান্তমূলক।”

পরে তিনি বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণে আয়োজিত আলোচনা সভায় অংশ নেন। অনুষ্ঠানে আবু সাঈদের বাবা মকবুল হোসেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. শওকত আলী, রংপুর বিভাগের ও জেলার ঊর্ধ্বতন প্রশাসনিক কর্মকর্তারা, স্থানীয় রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ, শিক্ষক-শিক্ষার্থী এবং বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ উপস্থিত ছিলেন।

দিনব্যাপী কর্মসূচিতে অংশ নেওয়া মানুষের কণ্ঠে ছিল একটাই প্রত্যাশা—শহীদ আবু সাঈদের আত্মত্যাগ যেন বৃথা না যায় এবং তাঁর স্বপ্নের বৈষম্যহীন, ন্যায়ভিত্তিক বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠিত হয়।

শেয়ার করতে

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *