✍︎ নাগরিক প্রতিবেদন ✍︎
কওমি মাদ্রাসাভিত্তিক সাতটি নিবন্ধিত রাজনৈতিক দলগুলোকে নিয়ে নতুন রাজনৈতিক জোট গড়ার উদ্যোগ নিয়েছে হেফাজতে ইসলাম। এর মধ্যে তিনটি দল জামায়াতে ইসলামীর জোটে এবং একটি বিএনপির সঙ্গে রয়েছে।
বৃহস্পতিবার চট্টগ্রামের ফটিকছড়ির জামেয়া আজিজুল উলুম বাবুনগর মাদ্রাসায় হেফাজতের আমিরের সভাপতিত্বে মতবিনিময় এসব আলোচনা হয়েছে। তবে এখনও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। দলগুলোকে বলা হয়েছে, নিজ নিজ দলীয় ফোরামে আলোচনার পর ঐক্যের রূপরেখা দিতে। আগস্টের বৈঠকে তা উত্থাপন করা হবে।
বৃহস্পতিবার সকাল ১০টা থেকে বেলা ৩টা পর্যন্ত চলা বৈঠকে চরমোনাই পীরের নেতৃত্বাধীন ইসলামী আন্দোলনও ছিল। বিএনপির জোটে থাকা জমিয়তে উলামায়ে ইসলামও ছিল। ছিল জামায়াতের জোটে থাকা বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস, বাংলাদেশ নেজামে ইসলাম পার্টি এবং খেলাফত মজলিস। জামায়াতের জোট থেকে সম্প্রতি বেরিয়ে যাওয়া খেলাফত আন্দোলন এবং ইসলামী ঐক্যজোট প্রতিনিধিরাও ছিলেন।
চরমোনাইয়ের পীরের ইসলামী আন্দোলন বাদে বাকি ছয়টি দল আগে থেকেই হেফাজতের সঙ্গে যুক্ত। এই দলগুলোর নেতারা হেফাজতের পদধারী নেতা। ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে বিএনপিকে সমর্থন করেন অরাজনৈতিক সংগঠন হেফাজতের নেতারা। সংগঠনটির শীর্ষ নেতারা জামায়াতকে ঝোট দেওয়া হারাম বলেও ফতোয়া জারি করেন। তবে এতে জোট ছাড়েনি জামায়াতের সঙ্গে থাকা দেওবন্দি উসুলে পরিচালিত দলগুলো।
তবে সভা শেষে হেফাজতের মহাসচিব আল্লামা সাজিদুর রহমান বলেন, ৭টি দল ঐক্যবদ্ধভাবে পথচলার বিষয়ে ঐকমত্যে পৌঁছেছে। অল্প দিনের মধ্যেই সেই ঐক্যের প্রক্রিয়া নির্ধারিত হবে।
দেওবন্দের অনুসারী কওমি মাদ্রাসাভিত্তিক এই ৭ দল জামায়াতের অনুসরণ করা মওদুদীবাদের বিরুদ্ধে। জামায়াতের প্রতিষ্ঠাতা সাইয়্যেদ আবুল আলা মওদুদী তার ‘রাজতন্ত্র এবং খিলাফত’ বইয়ে হযরত মুয়াবিয়ার (রা.) কঠোর সমালোচনা করেন। দেওবন্দ ধারার দলগুলো মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) এর সাহাবিদের সত্যের মাপকাঠী তথা সমালোচনার ঊর্ধ্বে বলে মনে করেন। তাই প্রায় আট দশক ধরে জামায়াত এবং অন্যান্য ইসলামী দলের বিরোধ চলছে।
বৃহস্পতিবারের বৈঠকে হেফাজতের শীর্ষ নেতারা দলগুলো সতর্ক করে বলেন, জামায়াতের আকিদা ঢুকে যাচ্ছে মাদ্রাসায়। এরপর নিয়ন্ত্রণও চলে যাবে। তাই আকিদা ও মাদ্রাসা রক্ষায় কওমি ধারার দলগুলোকে এক সঙ্গে থাকতে হবে।
১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের আগে খেলাফত মজলিসের দুই অংশ, নেজামে ইসলাম এবং খেলাফত আন্দোলন জোট করে জামায়াতের সঙ্গে। প্রথম তিনটি দলকে জামায়াত আসন ছাড়লেও খেলাফতকে ছাড়েনি। এককভাবে ভোট করা এই দলটি নির্বাচনের পর জোট ছেড়েছে। দলটিকে জামায়াত উচ্চকক্ষে আসন দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। উচ্চকক্ষ অনিশ্চিত হওয়ায়, তারা একাই পথ চলতে চায়।
বাংলাদেশ খেলাফত দুটি এবং খেলাফত মজলিস একটি আসনে জয়ী হয়েছে। কোনো আসনে জিততে পারেন নেজামে ইসলাম। খেলাফত মজলিস সম্প্রতি সিদ্ধান্ত নিয়েছে আনুষ্ঠানিকভাবে জোট না ছাড়লেও, তারা ১১ দলীয় ঐক্যের কর্মসূচিতে যাবে না। ফলে দলটি আর নেই জামায়াতের সঙ্গে।
আসন ভাগাভাগির বিরোধের পর জামায়াত জোট ছেড়ে এককভাবে ২৫৪ আসনে নির্বাচন করে ইসলামী আন্দোলন। শেখ হাসিনার শাসনামলের শেষের বছরগুলোতে আওয়ামী লীগের পক্ষ নেওয়া ইসলামী ঐক্যজোটও এককভাবে নির্বাচন করে।
হেফাজতের একাধিক নির্ভরযোগ্য সূত্র জানিয়েছে, বৈঠকের মূল লক্ষ্য ছিল জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোটে থাকা কওমি দলগুলোকে সেখান থেকে বের করে আনা। তবে এখনও যারা ১১ দলীয় জোটে আছেন, তারা জোট ছেড়ে এখনই হেফাজত আমিরের ডাকে সাড়া দেবেন কি না, এ বিষয়ে বৈঠকে কোনো আলাপ-আলোচনা হয়নি। সংশ্লিষ্টদের ধারণা, আগামী দিনগুলোয় সাতটি ইসলামি দল ঐক্যবদ্ধ হলে জামায়াত জোট ভাঙতে পারে।
সাতটি দল ঐক্যবদ্ধ হলে বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস জামায়াত নেতৃত্বাধীন জোট ছাড়বে কি না জানতে চাইলে দলটির মহাসচিব মাওলানা জালালুদ্দিন আহমদ বলেন, ‘রাজনৈতিকভাবে আমরা একটা প্ল্যাটফর্মে আছি। জোট ছেড়ে দিয়ে সাত দল মিলে একটি জোট হবে, এ রকম আলোচনা ওই বৈঠকে হয়নি। আমরা জামায়াত জোট ছাড়ব কি না, সেটা পরামর্শ করে জানাব। জামায়াত জোটে থেকেও সাত দলের সঙ্গে নীতিগতভাবে বিভিন্ন কর্মসূচিতে অংশ নেওয়ার সুযোগ আছে।’
হেফাজতের আমির আল্লামা মুহিব্বুল্লাহ বাবুনগরীর নেতৃত্বে ইসলামি দলের জোট হলেও জোটের নেতৃত্বে তিনি থাকছেন না বলে জানিয়েছেন হেফাজতের যুগ্ম মহাসচিব মাওলানা আজিজুল হক ইসলামাবাদী। তিনি বলেন, ‘প্রতিটি দলেরই নিজস্ব মতামত আছে। তারা কিছুটা ছাড় দিয়ে হলেও ঐক্যের চেষ্টা করবেন। সাতটি দলের নেতৃত্বে কারা থাকবেন, এখনই বলা যাচ্ছে না। এটা আলোচনার মাধ্যমে সিদ্ধান্ত হবে। তবে হেফাজতের আমির রাজনৈতিক দলগুলোর নেতৃত্বে থাকবেন না। রাজনৈতিক দলের নেতারাই সেখানে নেতৃত্বে দেবেন। তিনি তাদের দিকনির্দেশনা ও পরামর্শ দেবেন।’
