✍︎ নাগরিক প্রতিবেদন ✍︎
সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান হত্যা মামলার আসামি মেজর (অব.) মোজাফফর হোসেনকে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় গ্রেফতার দেখানোর নির্দেশ দিয়েছেন ট্রাইব্যুনাল। সেই সঙ্গে তাঁকে সেনা হেফাজতে রাখতে বলা হয়েছে।
বৃহস্পতিবার (২৩ জুলাই) দুপুরে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ এর চেয়ারম্যান বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের বিচারিক প্যানেল এ আদেশ দেন। প্যানেলের অপর সদস্যরা হলেন বিচারক মো. মঞ্জুরুল বাছিদ ও বিচারক নূর মোহাম্মদ শাহরিয়ার কবীর।
ট্রাইব্যুনাল এই মামলায় মোজাফফরের বিরুদ্ধে তদন্ত প্রতিবেদন দিতে দুই মাস সময় দিয়েছেন। সেই সঙ্গে পরবর্তী শুনানির জন্য আগামী ২৩ সেপ্টেম্বর দিন ধার্য করা হয়েছে। ওই দিন তাঁকে ট্রাইব্যুনালে হাজির করতে হবে। এ ছাড়া তদন্তকারী কর্মকর্তাকে দুই দিন জিজ্ঞাসাবাদের অনুমতি দিয়েছেন ট্রাইব্যুনাল।
এর আগে গত মঙ্গলবার প্রসিকিউশনের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে আজ হাজির করার জন্য নির্দেশ দিয়েছিলেন ট্রাইব্যুনাল। সে অনুযায়ী আজ তাঁকে হাজির করা হয়।
মঙ্গলবার (২১ জুলাই) চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম সাংবাদিকদের বলেন, মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় গ্রেফতার থাকা সাবেক সেনা কর্মকর্তা মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীর সঙ্গে মোজাফফর হোসেনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা ছিল। সে ভারতে আসা-যাওয়া করত। সে মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীর সঙ্গে মানবতাবিরোধী অপরাধের সঙ্গেও জড়িত। তাঁর বিরুদ্ধে তদন্ত চলছে।
এদিন সকালে মোজাফফর হোসেনকে ট্রাইব্যুনালে হাজির করা হয়। বর্তমানে তিনি ঢাকার সেনানিবাসের কারাগারে থাকবেন।
এদিকে, আজ সকালে এ মামলার অপর আসামি লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীকেও ট্রাইব্যুনালে হাজির করা হয়।
প্রসিকিউশন জানায়, আওয়ামী লীগ সরকারের দীর্ঘ শাসনামলে বিভিন্ন মানবতাবিরোধী অপরাধে মোজাফফরের সংশ্লিষ্টতা উঠে এসেছে। এর মধ্যে জুলাই গণঅভ্যুত্থানে ফেনীতে সংঘটিত হত্যাযজ্ঞের সময় মাসুদ উদ্দিনের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখেন তিনি। এজন্য তাকে এ মামলায় গ্রেফতার দেখানোর আবেদন করা হয়।
এর আগে, ২১ জুলাই জিয়াউর রহমান হত্যা মামলার অন্যতম এই আসামির বিরুদ্ধে প্রোডাকশন ওয়ারেন্ট চেয়ে আবেদন করে প্রসিকিউশন। প্রায় ৪৫ বছর পলাতক থাকার পর গত ১৫ জুলাই রাতে রাজধানীর বনানীর একটি বাসা থেকে মোজাফফরকে গ্রেফতার করে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। পরদিন তাকে ঢাকা সেনানিবাসের মিলিটারি পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হয়।
জানা গেছে, অবসরপ্রাপ্ত মেজর মোজাফফর হোসেন দীর্ঘদিন প্রতিবেশী ভারতে আত্মগোপনে ছিলেন। ১৯৯৭ থেকে ১৯৯৮ সাল পর্যন্ত তিনি সেখানে অবস্থান করেন। পরবর্তী সময়ে ছদ্মনাম ব্যবহার করে তিনি সীমান্ত অতিক্রম করে বিভিন্ন স্থানে যাতায়াত করতেন।
১৯৮১ সালের ৩০ মে ভোরে চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসে একদল বিপথগামী সেনাসদস্যদের হাতে নিহত হন তৎকালীন রাষ্ট্রপতি ও বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমান। ঘটনার আগের দিন দুই দিনের সফরে চট্টগ্রামে যান জিয়াউর রহমান। সফরের উদ্দেশ্য ছিল বিএনপির স্থানীয় নেতাদের মধ্যে বিরোধ মীমাংসা করা। সারা দিন বৈঠক শেষে রাতে তিনি সার্কিট হাউসে অবস্থান নেন। ভোরে একদল সেনা কর্মকর্তা সেখানে হামলা চালালে তিনি নিহত হন। পরে রাষ্ট্রীয় বেতারে তাঁর মৃত্যুর খবর প্রচার করা হয়।
সরকারের পক্ষ থেকে তখন জানানো হয়, ‘বিপ্লবী পরিষদ’ পরিচয়ে একদল সেনাসদস্য এ হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে। এরপর উপ-রাষ্ট্রপতি বিচারপতি আবদুস সাত্তার ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণ করেন। হত্যাকাণ্ডের পর জিয়ার মরদেহ গোপনে চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়া উপজেলার একটি পাহাড়ি এলাকায় দাফন করা হয়। পরে সরকারি উদ্যোগে মরদেহ উদ্ধার করে ঢাকায় এনে সে বছর ২ জুন জাতীয় সংসদ ভবনের পাশে দাফন করা হয়।
হত্যাকাণ্ডের পর ওই সেনাসদস্যরা চট্টগ্রামের গুরুত্বপূর্ণ সড়ক ও স্থাপনা নিয়ন্ত্রণে নেওয়ায় পুরো শহর কার্যত বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছিল। তাঁরা রাষ্ট্রপতির মরদেহ সরকারের কাছে হস্তান্তর করতে অস্বীকৃতি জানায়। এ পরিস্থিতিতে তৎকালীন সেনাপ্রধান হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদ ৩১ মে দুপুর ১২টার মধ্যে চট্টগ্রাম সেনানিবাসের জিওসি মেজর জেনারেল আবুল মনজুরসহ হত্যাকাণ্ডে অংশ নেওয়া সেনা কর্মকর্তাদের আত্মসমর্পণের নির্দেশ দেন। কিন্তু আত্মসমর্পণের পরিবর্তে মেজর জেনারেল মনজুরসহ কয়েকজন কর্মকর্তা সেনানিবাস ত্যাগ করে পালিয়ে যান।
পরদিন ১ জুন হত্যাকাণ্ডে অভিযুক্ত লেফটেন্যান্ট কর্নেল মতিউর রহমান ও লেফটেন্যান্ট কর্নেল মেহবুব চট্টগ্রাম থেকে পালানোর সময় সরকারি বাহিনীর গুলিতে নিহত হন বলে জানানো হয়। একই সময়ে মেজর জেনারেল মনজুরকে ধরিয়ে দিতে পাঁচ লাখ টাকা পুরস্কার ঘোষণা করা হয়। ২ জুন ফটিকছড়ির একটি চা-বাগান থেকে মনজুরকে আটক করা হয়। পরে তাঁকে চট্টগ্রাম সেনানিবাসে নেওয়ার পথে একদল উচ্ছৃঙ্খল সৈন্যের হাতে তিনি নিহত হয়েছেন বলে সে সময় সরকারিভাবে জানানো হয়।
এই অভ্যুত্থানের ঘটনায় ১৮ জন সেনা কর্মকর্তার সামরিক আদালতে বিচার হয়। তাঁদের মধ্যে ১৩ জনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয় এবং অন্যদের বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড দেওয়া হয়। তবে দুই সেনা কর্মকর্তা মেজর খালেদ ও মেজর মোজাফফর পালিয়ে যান। তাঁদের দুজনকেই ধরিয়ে দিতে সে সময় পুরস্কার ঘোষণা করা হয়েছিল। দীর্ঘ ৪৫ বছর পর তাঁদের একজন, মেজর মোজাফফর হোসেন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে গ্রেফতার হলেন।
