✍︎ নাগরিক প্রতিবেদন ✍︎
বাংলাদেশের পরবর্তী রাষ্ট্রপতি কে হচ্ছেন–এ নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনা এখন তুঙ্গে। রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন পদত্যাগ করায় সেই আলোচনা আরও জোরালো হয়েছে।
রাজনৈতিক ও দলীয় সূত্রগুলো বলছে, সম্ভাব্য রাষ্ট্রপতি হিসেবে বিএনপির কয়েকজন জ্যেষ্ঠ নেতার নাম আলোচনায় রয়েছে। তাদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি উচ্চারিত হচ্ছে বিএনপির মহাসচিব এবং স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, দলের স্থায়ী কমিটির জ্যেষ্ঠ সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন, ড. আব্দুল মঈন খান এবং নজরুল ইসলাম খানের নাম। এ ছাড়া চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ পাওয়া এম নাসিমুল গণির নাম রয়েছে সেই তালিকায়।
মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর
সম্ভাব্য প্রার্থীদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের নাম। দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে পরিচ্ছন্ন ভাবমূর্তি, মার্জিত আচরণ, সাংগঠনিক দক্ষতা এবং জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে রাজনৈতিক গ্রহণযোগ্যতার কারণে রাষ্ট্রপতি পদে তার নাম বিবেচনায় আসছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। দীর্ঘ এক দশকের বেশি সময় ধরে বিএনপির মহাসচিবের দায়িত্ব পালন করছেন মির্জা ফখরুল ইসলাম। একই সঙ্গে বিএনপির অভ্যন্তরে বিভিন্ন মত ও অবস্থানকে সমন্বয় করে দলকে ঐক্যবদ্ধ রাখার ক্ষেত্রেও তার ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হয়।
বিশেষ করে সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার দীর্ঘ অসুস্থতা এবং বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান দীর্ঘদিন দেশের বাইরে অবস্থান করার সময় দলের সাংগঠনিক ও রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনায় মির্জা ফখরুল গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।
ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন
রাষ্ট্রপতি পদের সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে বিএনপির স্থায়ী কমিটির জ্যেষ্ঠ সদস্য ও সাবেক মন্ত্রী ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেনের নামও বেশ জোরালোভাবে আলোচনায় রয়েছে। দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে বিএনপির বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেছেন তিনি। দলের নানা রাজনৈতিক সংকট, আন্দোলন ও দুঃসময়ে বিএনপির সঙ্গে সক্রিয়ভাবে ছিলেন। শহিদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের আমলে ছাত্রবিষয়ক সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করা খন্দকার মোশাররফ পরবর্তী সময়ে দলের নীতিনির্ধারণী পর্যায়েও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। দলের ভেতরে দীর্ঘ রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা ও নেতৃত্বের প্রতি আনুগত্যের কারণে তিনি বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্বের আস্থাভাজন হিসেবে পরিচিত। কুমিল্লা-১ আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়া এই নেতাকে ঘিরে এর আগেও বিএনপি ক্ষমতায় এলে রাষ্ট্রপতি করা হতে পারে–এমন আলোচনা রাজনৈতিক অঙ্গনে ছিল। ২০২৩ সালে বগুড়ায় বিএনপির একটি বিভাগীয় সমাবেশেও দলটির এক জ্যেষ্ঠ নেতা প্রকাশ্যে খন্দকার মোশাররফকে রাষ্ট্রপতি করার সম্ভাবনার কথা বলেছিলেন। ফলে এবার রাষ্ট্রপতি পদ শূন্য হওয়ার পর তার নামও নতুন করে আলোচনায় এসেছে।
ড. আব্দুল মঈন খান
রাষ্ট্রপতি হিসেবে সম্ভাব্য তালিকায় বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. আব্দুল মঈন খানের নামও রয়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষক ড. মঈন খান বিএনপির রাজনীতিতে দীর্ঘদিন ধরে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন। শহিদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার ঘনিষ্ঠজন হিসেবে তিনি পরিচিত। দলের ভেতরে ও বাইরে তার যথেষ্ট গ্রহণযোগ্যতা রয়েছে। অভিজ্ঞ রাজনীতিবিদ হিসেবে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও তার পরিচিতি রয়েছে।
নজরুল ইসলাম খান
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খানের নামও সম্ভাব্য রাষ্ট্রপতির তালিকায় রয়েছে। দীর্ঘ রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা, সাংগঠনিক দক্ষতা এবং দলের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে সক্রিয় ভূমিকার কারণে তিনি বিএনপির গুরুত্বপূর্ণ নেতাদের একজন। দলীয় রাজনীতিতে তার দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা এবং বিভিন্ন পর্যায়ে দায়িত্ব পালনের বিষয়টি রাষ্ট্রপতি পদে বিবেচনার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে বলে মনে করছেন অনেকে।
এম নাসিমুল গণি
রাষ্ট্রপতি হিসেবে রাজনৈতিক পরিচয়ের বাইরে হঠাৎ আলোচনায় বর্তমান মন্ত্রিপরিষদ সচিব এম নাসিমুল গণি। এর আগে অনেকের নাম এলেও সম্প্রতি আলোচনায় এসেছে তার নাম।
নাসিমুল গণি বাংলাদেশের একজন উচ্চপদস্থ সরকারি কর্মকর্তা। ২০২৪ সালে অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকার তাকে সচিব হিসেবে নিয়োগ দেয়। এর পরই তাকে সিনিয়র সচিবের মর্যাদা দেওয়া হয় হয়। ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে তিনি বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিসের উচ্চতম পদ বাংলাদেশের ২৬তম মন্ত্রিপরিষদ সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। তিনি বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিসের ১৯৮২ ব্যাচের একজন সদস্য হিসেবে সরকারি চাকরি শুরু করেন।
ইতোপূর্বে তিনি বাংলাদেশের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব ও রাষ্ট্রপতির কার্যালয়ের গণবিভাগের সচিব হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন। বিএনপির সূত্র জানায়, একজন দক্ষ আমলা হিসেবে তাকেও রাষ্ট্রপতি হিসেবে পেতে চায় সরকার।
৯০ দশকের আগে সরাসরি ভোটে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হওয়ার বিধান ছিল। তবে ১৯৯১ সালে সংসদীয়-ব্যবস্থা চালুর পর আগের পদ্ধতি বাতিল হয়ে যায়। তখন থেকে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হচ্ছেন এমপিদের পরোক্ষ ভোটে। তিনি রাষ্ট্রপ্রধান হলেও নির্বাহী ক্ষমতা ন্যস্ত হয়ে পড়ে প্রধানমন্ত্রীর ওপর। সংবিধানের ৫০ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী দায়িত্ব গ্রহণের দিন থেকে রাষ্ট্রপতির মেয়াদ পাঁচ বছর। এ ক্ষেত্রে কেউ দুইবারের বেশি এ পদে থাকতে পারবেন না।
মেয়াদ শেষ, পদত্যাগ বা অভিসংশনের মাধ্যমে রাষ্ট্রপতি পদ শূন্য হয়। নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের আয়োজন করে নির্বাচন কমিশন। এ ক্ষেত্রে অবশ্যই তাকে ৩৫ বছরের বেশি ও সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার মতো যোগ্য হতে হবে।
রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের আগে স্পিকারের সঙ্গে আলোচনা করে তফসিল ঘোষণা করেন নির্বাচন কমিশন। সংবিধানের ১২৩ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, রাষ্ট্রপতি পদের মেয়াদ অবসানের কারণে পদ শূন্য হলে মেয়াদ-সমাপ্তির তারিখের পূর্ববর্তী ৯০ থেকে ৬০ দিনের মধ্যে নির্বাচন করতে হবে। আর বিপক্ষে প্রার্থী না থাকলে তিনি বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হবেন। তফসিল ঘোষণার পর সংসদ অধিবেশন চলাকালীন এই নির্বাচনের ভোট অনুষ্ঠিত হয়। তবে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের প্রয়োজনীয় সময়ে যদি অধিবেশন না থাকে, তাহলে নির্বাচন কমিশন স্পিকারের সঙ্গে আলোচনা করে প্রজ্ঞাপন জারি করে ভোটগ্রহণের কমপক্ষে সাত দিন আগে অধিবেশন আহ্বান করবেন।
