একরামুল হত্যায় হাসিনাসহ ১১ জনের বিরুদ্ধে প্রতিবেদন

✍︎ নাগরিক প্রতিবেদক ✍︎

২০১৮ সালে কক্সবাজারের টেকনাফে মাদকবিরোধী অভিযানের নামে কাউন্সিলর ও টেকনাফ যুবলীগের সাবেক সভাপতি একরামুল হক হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করা হয়েছে। পলাতক সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ ১১ জনের বিরুদ্ধে এই প্রতিবেদন দাখিল করা হয়েছে।

এদিন সকালে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের রেজিস্ট্রারের কাছে এ অভিযোগ দাখিল করা হয়। 

বাকি আসামিরা হলেন- সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল, সাবেক সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের, সাবেক আইজিপি বেনজীর আহমেদ, ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. মাহাবুব আলম, ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মিফতাহ উদ্দিন (সেনাবাহিনীতে কর্মরত), কর্নেল আনোয়ার লতিফ খান (অবসর প্রস্তুতিমূলক ছুটিতে), মেজর রুহুল আমিন, সেনা কর্মকর্তা নাজমুস সাকিব, সাবেক এমপি আবদুর রহমান বদি ও সেনা কর্মকর্তা আশিকুর রহমান। এর মধ্যে অন্য মামলায় গ্রেফতার রয়েছেন আবদুর রহমান বদি, আনোয়ার লতিফ ও মাহাবুব আলম। 

রোববার (২৬ জুলাই) সকালে বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ এ আলোচিত এ মামলার প্রতিবেদন দাখিল করে প্রসিকিউশন।

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের (আইসিটি) চিফ প্রসিকিউটর আমিনুল ইসলাম বলেছেন, কক্সবাজারের টেকনাফে কাউন্সিলর একরামুল হক হত্যাকাণ্ডে দুজন সরাসরি গুলি করেছিলেন। তারা হলেন- মেজর (অব.) রুহুল আমিন ওরফে রাজন ও লেফটেন্যান্ট কমান্ডার মো. আশিকুর রহমান ওরফে সৈকত। আর তৎকালীন র‍্যাব কর্মকর্তাদের উপস্থিতি, পরিকল্পনা ও তত্ত্বাবধানেই হত্যাকাণ্ডটি সংঘটিত হয়।

রোববার (২৬ জুলাই) আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২-এ একরামুল হক হত্যা মামলায় আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দাখিলের পর সাংবাদিকদের এসব কথা বলেন চিফ প্রসিকিউটর।

আমিনুল ইসলাম বলেন, মেজর (অব.) রুহুল আমিন ওরফে রাজন এবং লেফটেন্যান্ট কমান্ডার আশিকুর রহমান ওরফে সৈকত সরাসরি গুলি করেছেন। মিফতাহ উদ্দিনসহ অন্যান্য র‍্যাব কর্মকর্তারা তখন ওই স্থানে উপস্থিত ছিলেন। তাদের তত্ত্বাবধানে ও পরিকল্পনাতেই হত্যাকাণ্ডটি সংঘটিত হয়।

তিনি বলেন, একরামুল হক হত্যার পর ঘটনাটি ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছিল। তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল এবং শেখ হাসিনা চেয়েছিলেন, ঘটনাটি নিয়ে যেন আর বাড়াবাড়ি না হয়। এ কারণে একরামের স্ত্রীকে শেখ হাসিনা ডেকে নিয়ে তাকে ক্ষতিপূরণ দেওয়ার কথা বলেছিলেন।

চিফ প্রসিকিউটর আরও বলেন, ওবায়দুল কাদের নিজে এই দায়িত্ব নিয়েছিলেন। একরামের স্ত্রীকে তিনি শেখ হাসিনার সঙ্গে সাক্ষাৎ করিয়ে দিয়েছিলেন। ঘটনাটি ধামাচাপা দেওয়ার জন্য তাকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল বলে সাক্ষ্যে উঠে এসেছে।

তিনি বলেন, একরামের স্ত্রীসহ মামলার সাক্ষীদের বক্তব্যে এসব ঘটনার বিস্তারিত বিবরণ পাওয়া গেছে। সাক্ষীদের বক্তব্য ও তদন্তের অন্যান্য তথ্য পর্যালোচনা করে যাদের বিরুদ্ধে প্রাথমিকভাবে মামলা করার মতো তথ্য-প্রমাণ পাওয়া গেছে, তাদের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দাখিল করা হয়েছে।

আমিনুল ইসলাম বলেন, ২০১৮ সালের ২৬ মে রাতে একরামের মোবাইল ফোনটি হত্যাকাণ্ডের সময় চালু ছিল। সেই ফোন চালু থাকা অবস্থায় তার মেয়েরা ও স্ত্রী গুলির শব্দ, কথোপকথনসহ হত্যাকাণ্ডের বিভিন্ন ঘটনা শুনতে পেয়েছিলেন। এসব বিষয় আমরা মামলায় আলামত হিসেবে নিয়েছি।

চিফ প্রসিকিউটর বলেন, প্রত্যক্ষদর্শীর সাক্ষ্যসহ বিভিন্ন পারিপার্শ্বিক সাক্ষ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে এবং সুপিরিয়র রেসপনসিবিলিটির আওতায় শেখ হাসিনা, আসাদুজ্জামান খান কামাল ও ওবায়দুল কাদেরকে এ মামলায় আসামি করা হয়েছে।

সাবেক সংসদ সদস্য আবদুর রহমান বদির বিষয়ে আমিনুল ইসলাম বলেন, একরাম তার রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ ছিলেন। পরবর্তীকালে আপনারা সাক্ষ্য-প্রমাণে দেখতে পাবেন, একরামকে হত্যার পর তার সম্পত্তি বিভিন্ন কৌশলে আত্মসাৎ করা হয়েছিল। এই ঘটনার নেপথ্যের নায়ক ছিলেন আবদুর রহমান বদি।

উল্লেখ্য, ২০১৮ সালের ২৬ মে রাতে কক্সবাজারের টেকনাফে বন্দুকযুদ্ধে নিহত হন একরামুল হক। তিনি টেকনাফ পৌরসভার ৩ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর ও উপজেলা যুবলীগের সভাপতি ছিলেন। এ ঘটনায় ‘আব্বু তুমি কান্না করতেছ যে…’ একরামুলের মেয়ের একটি অডিও রেকর্ড তখন দেশজুড়ে আলোচিত ছিল। 

ওই বছরের ৩১ মে কক্সবাজারে এক সংবাদ সম্মেলনে একরামুলের স্ত্রী হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় বিচার বিভাগীয় তদন্তের দাবি জানান। সেই সঙ্গে কথিত বন্দুকযুদ্ধের সময় সেলফোনে রেকর্ডকৃত কথোপকথনের কিছু রক্ত হিম করা অডিও ক্লিপ গণমাধ্যমকর্মীদের দিয়েছিলেন তিনি।

শেয়ার করতে

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *