✍︎ নাগরিক নিউজ ডেস্ক ✍︎
কলম্বিয়ায় ভয়াবহ ভূমিকম্পে মৃতের সংখ্যা বেড়ে ২২৪ জনে দাঁড়িয়েছে। ভূমিকম্পে ধসে পড়া কয়েক হাজার ভবনের নিচে অসংখ্য মানুষ আটকে থাকায় এ সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
মার্কিন ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা (ইউএসজিএস) জানিয়েছে, ভূমিকম্পটির কেন্দ্রস্থল ছিল রাজধানী বোগোটা থেকে প্রায় ৪০০ কিলোমিটার পশ্চিমে চোকো অঞ্চলের সান হোসে দেল পালমারে। ভূমিকম্পটি ভূপৃষ্ঠের ১০৭ কিলোমিটার গভীরে আঘাত হানে। ভূমিকম্পের কয়েক ঘণ্টার মধ্যে অন্তত ২১টি আফটারশক অনুভূত হয়েছে।
মঙ্গলবার সকালে কলম্বিয়ার অ্যাসোসিয়েশন অব ক্যাপিটাল সিটিস ১৬৫ জনের মৃত্যুর তথ্য জানায়। এরপর ক্যালিতে আরও ১০ জনের মরদেহ পাওয়া যায়। পরবর্তীতে বার্তাসংস্থা রয়টার্স জানায় মৃতের সংখ্যা ২২৪ জনে পৌঁছেছে।
গতকাল সোমবার ৭ দশমিক ৪ মাত্রার ভূমিকম্পটি আঘাত হানে। এটিকে ‘ওয়ান্স ইন এ ডিকেড’ ভূমিকম্প হিসেবে অভিহিত করা হচ্ছে। এটি সবচেয়ে বেশি আঘাত হেনেছে চোকো নামের একটি পাহাড়ি প্রদেশে। ভূমিকম্পটির কম্পন অনুভূত হয়েছে রাজধানী বোগোতা এবং অন্যান্য জনবহুল শহরগুলোতে।
আলজাজিরা জানিয়েছে, ভূমিকম্পের পর এখন পর্যন্ত ২ হাজার ৭০০ মানুষ নিখোঁজ রয়েছেন। আশঙ্কা করা হচ্ছে তার ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকা পড়েছেন।
কলম্বিয়ার প্রেসিডেন্ট আবেলারদো দে লা এসপ্রিল্লা মাত্র গত শুক্রবার শপথ গ্রহণ করেন। এরমধ্যেই দেশটিতে আঘাত হানল এত শক্তিশালী ভূমিকম্প। এরপর দ্রুত সময়ের মধ্যে তিনি দেশজুড়ে জাতীয় বিপর্যয় ঘোষণা করেন।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশ কলম্বিয়ায় সহায়তা করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।
ভূমিকম্পে পশ্চিম কলম্বিয়ার ক্যালি, পেরেইরা, কুইবদো ও মানিজালেসসহ বিভিন্ন শহরে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। এটি প্রতিবেশী দেশ ইকুয়েডর ও পানামাতেও অনুভূত হয়েছে।
কালি শহরে হাসপাতালেও ধস
প্রায় ২২ লাখ মানুষের শহর কালি, ভূমিকম্পে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলোর একটি। সেখানে অন্তত ৯৫ জন নিহত হয়েছেন।
শহরের অনেক ভবন পুরোপুরি ধসে পড়েছে। কিছু ভবন আবার মারাত্মকভাবে হেলে গেছে। যেকোনো সময় সেগুলো ধসে পড়ার আশঙ্কায় অনেক মানুষকে নিরাপদ আশ্রয়ের জন্য রাস্তায় অবস্থান নিতে হয়েছে।
কালির একটি হাসপাতালের ওপরের কয়েকটি তলা ধসে পড়েছে। এর মধ্যে শিশুদের চিকিৎসার কয়েকটি ওয়ার্ডও ছিল। হাসপাতালটির পরিচালক ইর্নে তোরেস কাস্ত্রো জানান, কয়েকজন রোগী ধ্বংসস্তূপের মধ্যে আটকা পড়েছেন।
হাসপাতালের প্রায় ৬০০ রোগী ও অন্যদের হাসপাতালের বাইরে রাস্তায় চিকিৎসা ও পরিচর্যা দিতে হচ্ছে। ধ্বংসস্তূপে ভরে গেছে হাসপাতালের আশপাশের এলাকাও।
এখনো আটকে চারজন ও একটি কুকুর
কালির বাসিন্দা ৪৩ বছর বয়সী কারমেন ইয়াসমিন গার্সিয়া উদ্ধার অভিযানে স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে কাজ করছেন। তিনি জানান, একটি ধসে পড়া ভবন থেকে তার দল সাতজনকে জীবিত উদ্ধার করেছে।
তবে তখনও চারজন মানুষ ও একটি কুকুর ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকে ছিল।
গার্সিয়া জানান, কিছুক্ষণ আগে ধ্বংসস্তূপের নিচ থেকে আঁচড়ানোর শব্দ শোনা গেলেও পরে আর কোনো শব্দ পাওয়া যায়নি। তারপরও তারা আশা করছেন, কুকুরটি জীবিত আছে এবং আটকে পড়া মানুষদেরও উদ্ধার করতে পারবে।
দ্রুত উদ্ধারকাজ চালাতে আরও মানুষ, লাঠি ও কোদালের প্রয়োজন বলেও জানান তিনি।
পেরেইরায় ব্যাপক ধ্বংস
ভূমিকম্পে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত শহরগুলোর একটি পেরেইরা। শহরের অনেক আবাসিক এলাকা ধসে গিয়ে কংক্রিট ও পেঁচানো লোহার স্তূপে পরিণত হয়েছে।
কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, পেরেইরায় ৭২ জন নিহত হয়েছেন।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত এবং রয়টার্সের যাচাই করা ভিডিওতে দেখা গেছে, ভূমিকম্পের সময় পেরেইরা বিমানবন্দর প্রচণ্ডভাবে কাঁপছিল। এ সময় বিমানবন্দরের ছাদের বড় অংশ ধসে পড়ে। আতঙ্কিত মানুষ তখন নিরাপদ জায়গায় আশ্রয় নেওয়ার চেষ্টা করছিলেন।
এ ছাড়া কালি শহরসহ ভাল দেল কাউকা অঞ্চলে ৩৮ জনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। ভূমিকম্পের উৎপত্তিস্থলের কাছের গ্রামীণ চোকো প্রদেশে আরও ১৩ জন নিহত হয়েছেন।
কালিতে নিরাপত্তা জোরদার
ভূমিকম্পের পর কালি শহরে লুটপাটের খবর পাওয়া গেছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সেখানে নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে।
কলম্বিয়ার সদ্য দায়িত্ব নেওয়া প্রেসিডেন্ট আবেলার্দো দে লা এসপ্রিয়েলা জানিয়েছেন, ভোরের মধ্যে কালিতে ১ হাজার নিরাপত্তাকর্মী মোতায়েন করা হবে।
কালি ও পেরেইরা— দুই শহরেই সোমবার রাতে কারফিউ জারি করা হয়।
প্রেসিডেন্ট দে লা এসপ্রিয়েলা বলেন, এই দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের পাশে দাঁড়াতে সরকার প্রয়োজনীয় সব ধরনের সহযোগিতা করবে। সংকটের এই সময়ে রাজনৈতিক মতপার্থক্যের কোনো জায়গা নেই বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
কলম্বিয়ার এবারের ভূমিকম্প দেশটির ১৯৯৯ সালের ভয়াবহ ভূমিকম্পের কথা মনে করিয়ে দিয়েছে। ওই ভূমিকম্পেও একই কফি উৎপাদনকারী অঞ্চল ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। সে সময় ১ হাজারের বেশি মানুষ নিহত হন।
এদিকে, প্রতিবেশী ভেনেজুয়েলায় জুনে আঘাত হানা ভয়াবহ ভূমিকম্পে ৬ হাজার তিনশর বেশি মানুষ নিহত হওয়ার কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
কলম্বিয়ায় এবারের ভূমিকম্পের পরও উদ্ধার অভিযান চলছে। ধ্বংসস্তূপের নিচে আরও মানুষ জীবিত থাকতে পারেন, এই আশায় উদ্ধারকারীরা দিন-রাত কাজ করে যাচ্ছেন।
