সীতাকুণ্ডে শিপইয়ার্ডে বিষাক্ত গ্যাসে ৯ জনের মৃত্যু

✍︎ চট্টগ্রাম প্রতিনিধি ✍︎

চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে ফেরদৌস স্টিল নামের জাহাজভাঙা কারখানায় শুক্রবার সকালে স্ক্র্যাপ জাহাজ কাটার সময় বিস্ফোরণ ও গ্যাসের বিষক্রিয়ায় ৯ শ্রমিক নিহত ও ২ শ্রমিক গুরুতর আহত হয়েছেন।

নিহতরা হলেন-মো. রানা (২৫), খোকন (২৬), মো. ইদ্রিস (৩০), মো. সুজন (৩৮), পলাশ জলদাস (৩০), সানি জলদাস (২২) এবং দুই সহোদর মনসুর আলী (৪০) ও নাসির উদ্দিন (৩৮)। হাবিবুর রহমান (৫০) নামের একজন নিহতের তালিকায় থাকলেও তাঁর মরদেহ ও পরিচয় পাওয়া যায়নি।

নিহতদের স্বজনেরা জানিয়েছেন, দুর্ঘটনার পর আহত শ্রমিকদের উদ্ধার করে জাহাজভাঙা কারখানার ভেতরে এক ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে ফেলে রাখা হয়। আহতদের আর্তচিৎকার শুনে তাঁরা ছুটে গেলেও জাহাজভাঙা কারখানা কর্তৃপক্ষ গেটে তালা ঝুলিয়ে রাখে। বড় ধরনের কোনো দুর্ঘটনা ঘটেনি জানিয়ে তারা স্থানীয় বাসিন্দাদের চলে যেতে বলে। এতে স্থানীয় বাসিন্দারা বিক্ষুব্ধ হয়ে কারখানার গেট ভেঙে ভেতরে প্রবেশ করে এবং আহতদের উদ্ধার করে হাসপাতালে পাঠান। জাহাজভাঙা কারখানা কর্তৃপক্ষ ঘটনা ধামাচাপা দিতে আহতদের যথাযথ চিকিৎসা না দেওয়ায় তাঁরা মৃত্যুবরণ করেছে বলে অভিযোগ স্বজনদের।

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. ফখরুল ইসলাম জানান, বিস্ফোরণের খবর পাওয়ার পর ওসিকে অবহিত করে জাহাজভাঙা কারখানায় পুলিশ পাঠানো হয়েছে। তিনি নিজেও ঘটনাস্থলে রয়েছেন।

ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী শ্রমিক শুভ জলদাস বলেন, জাহাজটির এলএনজি ট্যাংক কাটার কাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে ছিল। জাহাজের তলায় থাকা একটি ট্যাংক কাটার কাজ চলছিল। শুক্রবার সকালেও শ্রমিকেরা সেখানে কাজ করছিলেন।

শুভ বলেন, সকাল সাড়ে আটটার দিকে ফোরম্যান সাত-আটজন শ্রমিক ও কাটারম্যান নিয়ে একটি ট্যাংকের চারপাশ গোল করে কাটেন। এরপর সেখান থেকে সরে যান। প্রায় ১০ মিনিট পর গর্তটি পুরোপুরি খোলার জন্য সেখানে গেলে প্রথমে দুজন শ্রমিক জ্ঞান হারিয়ে পড়ে যান। তাঁদের উদ্ধার করতে গিয়ে আরও দুজন শ্রমিক গ্যাসে আক্রান্ত হন। এরপর কাটিং ফোরম্যান তাঁদের উদ্ধারে এগিয়ে গিয়ে জ্ঞান হারিয়ে পড়ে যান। কী ঘটেছে, তা দেখতে একজন নিরাপত্তা কর্মকর্তা মুখে মাস্ক পরে সেখানে যান। তিনিও জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন।

একের পর এক শ্রমিককে আক্রান্ত হতে দেখে তিনিও এগিয়ে গিয়েছিলেন বলে জানান শুভ। তিনি বলেন, দূর থেকে একটি হুক লাগিয়ে একজনকে টেনে তোলার চেষ্টা করেন তিনি। এ সময় তিনিও গ্যাসে আক্রান্ত হয়ে জাহাজের বাইরে কাদামাটিতে বেহুঁশ হয়ে যান। কিছুক্ষণ অচেতন থাকার পর ক্রেন অপারেটর তাঁকে টেনে তোলেন।

চট্টগ্রাম ফায়ার সার্ভিসের সহকারী পরিচালক তৌফিকুল ইসলাম হতাহতের সত্যতা নিশ্চিত করেছেন। তিনি জানান, নিহতদের মধ্যে ২ জনের মরদেহ জাহাজভাঙা কারখানায় রয়েছে। অন্য ৭ জনের মরদেহ চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে রয়েছে। নিহতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেন তিনি।

তৌফিকুল ইসলাম আরও জানান, ‘হতাহতের ঘটনা ঘটে যে স্ক্র্যাপ জাহাজে, সেটি ছিল এলএনজি বহনকারী জাহাজ। এই ধরনের জাহাজে কাটিং কাজ শুরুর আগে গ্যাসমুক্ত করতে হয়। কিন্তু কারখানা কর্তৃপক্ষ তা না করে কাটিং কাজ করায় এই বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটেছে। সাগরে জোয়ারের কারণে উদ্ধারকাজ সাময়িক বন্ধ রাখা হয়েছে। জোয়ারের পানি নেমে ভাটা এলে আবার উদ্ধারকাজ শুরু হবে।’

চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ নুরুল আলম আশেক জানান, হাসপাতালে আহত ৬ শ্রমিককে নিয়ে আসা হয়। তাঁদের মধ্যে ৫ শ্রমিকের মৃত্যু হয়েছে। আহত একজন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। নিহত ৫ জনের মরদেহ চমেক হাসপাতালের মর্গে রয়েছে।

স্থানীয় জেলেরা জানান, ভাটিয়ারি স্টেশন রোড-সংলগ্ন সাগর উপকূলে মো. লোকমানের মালিকানাধীন জাহাজভাঙা কারখানার ওই স্ক্র্যাপ জাহাজ থেকে লিকেজ হওয়া গ্যাসের তীব্রতা ব্যাপক ছিল। গ্যাসের গন্ধের কারণে তাঁরা কারখানাসংলগ্ন খালে মাছ ধরার নৌকা ভেড়াতে পারেননি। খাল থেকে আধা কিলোমিটার দূরে নৌকা ভেড়াতে হয়েছে।

স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, সকালে জাহাজভাঙা কারখানায় শ্রমিকদের চিৎকার শুনে তাঁরা ছুটে যান। এ সময় হতাহত শ্রমিকদের হাসপাতালে নিয়ে যেতে দেখে কয়েকজন স্থানীয় বাসিন্দা উত্তেজিত হয়ে পড়েন। একপর্যায়ে তাঁরা জাহাজভাঙা কারখানায় ভাঙচুর চালান। পরে পুলিশ এসে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে।

সীতাকুণ্ড থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. মহিনুল ইসলাম বলেন, হতাহতের ঘটনার পর বিক্ষুব্ধ স্থানীয় বাসিন্দারা ওই জাহাজভাঙা কারখানায় ভাঙচুর চালায়। পুলিশ গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। এ ব্যাপারে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

ফেরদৌস স্টিল শিপ ব্রেকিংয়ের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) ফেরদৌস ওয়াহিদ বলেন, স্ক্র্যাপ জাহাজের কাটিং কাজের সময় এ বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটেছে। অসাবধানতাবশত গ্যাস লিকেজের কারণে এ দুর্ঘটনা ঘটেছে।

চট্টগ্রাম শিল্প পুলিশ সুপার (এসপি) মাহমুদা বেগম জানান, নিহত ব্যক্তিদের মরদেহ চমেক হাসপাতালের মর্গে রয়েছে। আর কোনো শ্রমিক হতাহত হয়েছেন কি না, তা ভাটার পর ফায়ার সার্ভিসের সদস্যদের মাধ্যমে আবার তল্লাশি চালিয়ে দেখা হবে। এ ব্যাপারে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে বলেও জানান তিনি।

নিহত প্রত্যেকের পরিবার পাবে ১০ লাখ টাকা, তদন্তে কমিটি

দুর্ঘটনার কারণ অনুসন্ধানে পাঁচ সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছে বাংলাদেশ শিপব্রেকার্স অ্যান্ড রিসাইক্লার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিএসবিআরএ)। কমিটির প্রধান করা হয়েছে ক্যাপ্টেন মো. এনামকে। এক সপ্তাহের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে।

বিএসবিআরএর সভাপতি মোহাম্মদ মহসিন বলেন, জাহাজে নেভিগেশনসহ বিভিন্ন বিষয় থাকায় সেনাবাহিনীর একটি দলও ঘটনাটি পর্যবেক্ষণ করবে। দুর্ঘটনায় নিহত প্রত্যেকের পরিবারকে ১০ লাখ টাকা করে দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে।

ইয়ার্ডের মালিক ফেরদৌস ওয়াহিদ বলেন, আহত ব্যক্তিদের উন্নত চিকিৎসার ব্যবস্থা করা হবে। নিহত ব্যক্তিদের পরিবারকে সরকারি বিধি অনুযায়ী ক্ষতিপূরণ দেওয়ার পাশাপাশি তাদের পক্ষ থেকে আর্থিক সহযোগিতাও করা হবে।

আট বছরে ১৪৬ শ্রমিকের মৃত্যু
জাহাজভাঙা শিল্পে দুর্ঘটনা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ইপসা। সংস্থাটির কর্মকর্তা মোহাম্মদ শাহীন বলেন, গত দুই বছরে জাহাজভাঙা ইয়ার্ডে দুর্ঘটনায় ১১ জন শ্রমিকের মৃত্যু হয়েছে। আর গত আট বছরে দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছেন ১৪৬ জন।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, জাহাজ কাটার আগে ট্যাংক ও অন্যান্য ঝুঁকিপূর্ণ স্থানে থাকা গ্যাস ও বিপজ্জনক পদার্থ পরীক্ষা করে নিরাপদ ঘোষণা করা গুরুত্বপূর্ণ। জাহাজে অ্যাসবেস্টস, পিসিবি, তেল, ভারী ধাতু ও ওজোন-ক্ষয়কারী গ্যাসসহ বিপজ্জনক উপাদান কোথায় রয়েছে, তার তালিকা পর্যালোচনা করে সেগুলো অপসারণের কথা।

অনুমোদিত মেরিন সার্ভেয়ার বা বিশেষজ্ঞের পরীক্ষায় ট্যাংকে দাহ্য গ্যাস নেই- এমন নিশ্চয়তা পাওয়ার পরই ঝুঁকিপূর্ণ স্থানে কাটিং করার নিয়ম। এ ছাড়া জাহাজে থাকা ফুয়েল, লুব অয়েল, স্লাজ ও বিলজ ওয়াটারের মতো দূষণকারী পদার্থও অপসারণ করার কথা।

পরিবেশ অধিদপ্তর সরাসরি এসব পদার্থ পরিষ্কারের কাজ করে না। তবে ইয়ার্ডের পরিবেশগত ছাড়পত্র, বিপজ্জনক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং পরিবেশ আইন মেনে চলা হচ্ছে কি না, তা তদারক করার দায়িত্ব সংস্থাটির।

দুর্ঘটনার পর প্রশ্ন উঠেছে, প্রয়োজনীয় ছাড়পত্র ও নিরাপত্তা যাচাইয়ের পরও কীভাবে এলএনজি জাহাজের ট্যাংকে গ্যাস জমে ছিল। এ বিষয়ে জানতে চট্টগ্রাম পরিবেশ অধিদপ্তরের পরিচালক ও সংশ্লিষ্ট পরিদর্শকের মোবাইল ফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

শেয়ার করতে

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *