সালমান শাহর মৃত্যুর ৩০ বছরেও রহস্যের জট খোলেনি

✍︎ নাগরিক প্রতিবেদন ✍︎

​৩০ বছর আগে এই দিনে ঢাকার ইস্কাটনের ফ্ল্যাট থেকে উদ্ধার হয় চিত্রনায়ক চৌধুরী মোহাম্মদ শাহরিয়ার ইমন সালমান শাহর মরদেহ। আত্মহত্যা নাকি পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড, তিন দশক পেরিয়ে গেলেও সেই মৃত্যুর রহস্য আজও অমীমাংসিত।

ইতোপূর্বে সিআইডি, বিচার বিভাগীয় তদন্ত ও পিবিআই-তিনটি সংস্থার তদন্তেই একে ‘আত্মহত্যা’ বললেও পরিবারের একের পর এক নারাজি ও দীর্ঘ আইনি লড়াইয়ের পর আদালতের নির্দেশে নতুন করে গতি পেয়েছে মামলাটি।

এদিকে গত ৯ আগস্ট হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে খলনায়ক আশরাফুল হক ডনকে গ্রেফতার করে ইমিগ্রেশন পুলিশ। এরপর তাকে সিআইডির কাছে হস্তান্তর করা হয়। ওইদিনই তাকে কারাগারে পাঠানো হয়। ২০ আগস্ট ৭ দিনের রিমান্ড আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ২৭ আগস্ট তার পাঁচ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর হয়। তবে রিমান্ডের অনুমতি মিললেও ডনকে এখনো জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়নি বলে জানিয়েছেন তদন্ত কর্মকর্তা সিআইডির পরিদর্শক (ইন্সপেক্টর) মজিবুর রহমান। 

এদিকে গত ৩০ আগস্ট মামলার তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়ার কথা থাকলেও তদন্ত সংস্থা সিআইডি তা দাখিল করতে পারেনি। ফলে ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট জুয়েল রানা প্রতিবেদন জমা দেওয়ার পরবর্তী তারিখ ২৯ সেপ্টেম্বর ধার্য করেছেন বলে জানান প্রসিকিউশন বিভাগের উপ-পরিদর্শক (এসআই) শাহ আলম।

বিচারের অপেক্ষায় পরিবার

​লন্ডন থেকে সালমান শাহর মা নীলা চৌধুরী বলেন, আশায় আছি, এবার তদন্ত শেষ হবে এবং ন্যায়বিচার পাব। তবে অন্যান্য আসামিরা গ্রেফতার হওয়া নিয়ে প্রশ্ন তুলে তিনি বলেন, আসামিরা দেশে আছে, তাদের দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞাও রয়েছে। তারপরও কেন গ্রেপ্তার হচ্ছে না? আসামিদের গ্রেফতার করে রিমান্ডে নিলেই সব রহস্য বেরিয়ে আসবে।

​মামলার বাদী ও সালমান শাহর মামা আলমগীর কুমকুম বলেন, হত্যার সময় বাসায় সামীরা, ডলি, মনোয়ার ও কাজের লোক আবুল ছিল। সামীরাকে পুলিশ না পেলে তার শেষ স্বামীকে জিজ্ঞাসাবাদ করলেই তার খোঁজ মিলবে। তিনি আরও যোগ করেন, ডন আমাদের মূল আসামি ছিল না, রিজভী নামের এক আসামির জবানবন্দিতে তার নাম এসেছে। আমাদের মূল আসামি সামীরা ও তার মা-বাবা। আমরা চাই সব আসামি গ্রেফতার হোক এবং দ্রুত বিচার শেষ হোক।

মামলার তদন্ত কর্মকর্তা সিআইডির ঢাকা মহানগর দক্ষিণের পরিদর্শক মজিবুর রহমান জানান, মামলার তদন্ত চলছে এবং বাকি আসামিদের গ্রেফতার অভিযান অব্যাহত রয়েছে। এর বাইরে অতিরিক্ত তথ্য জানাতে অপারগতা প্রকাশ করেন তিনি।

​বাদীপক্ষের আইনজীবী ফারুক আহমেদ বলেন, সুদীর্ঘ একটা সময় পার হয়ে নতুন মামলা হয়েছে। এক আসামি গ্রেফতার হয়েছে। বাকি আসামিদের গ্রেপ্তার করে জিজ্ঞাসাবাদ করলে অনেক তথ্য উঠে আসতে পারে। তদন্ত দ্রুত শেষ করে আসামিদের সাজা যাতে নিশ্চিত করা হয়, এমন প্রত্যাশার কথা জানান এই আইনজীবী। অন্যদিকে, কারাগারে থাকা আসামি ডনের আইনজীবী এম ফরিদুল ইসলাম এ বিষয়ে মোবাইল ফোনে কিছু বলতে চাননি।

​প্রসঙ্গত, ১৯৯৬ সালের ৬ সেপ্টেম্বর মারা যান চিত্রনায়ক চৌধুরী মোহাম্মদ শাহরিয়ার ইমন সালমান শাহ। সে সময় এ বিষয়ে অপমৃত্যুর মামলা দায়ের করেছিলেন তার বাবা প্রয়াত কমরউদ্দিন আহমদ চৌধুরী। পরে ১৯৯৭ সালের ২৪ জুলাই ছেলেকে হত্যা করা হয়েছে অভিযোগ করে মামলাটিকে হত্যা মামলায় রূপান্তরের আবেদন জানান তিনি। অপমৃত্যু মামলার সঙ্গে হত্যাকাণ্ডের অভিযোগের বিষয়টি একসঙ্গে তদন্ত করতে সিআইডিকে নির্দেশ দেন আদালত। ১৯৯৭ সালের ৩ নভেম্বর আদালতে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দেয় সিআইডি। প্রতিবেদনে সালমান শাহ’র মৃত্যুকে আত্মহত্যা বলে উল্লেখ করা হয়। ওই বছরের ২৫ নভেম্বর ঢাকার সিএমএম আদালতে চূড়ান্ত প্রতিবেদন গৃহীত হয়। সে সময় সিআইডির প্রতিবেদন প্রত্যাখ্যান করে তার বাবা কমরউদ্দিন আহমদ চৌধুরী রিভিশন মামলা দায়ের করেন। পরে ২০০৩ সালের ১৯ মে মামলাটি বিচার বিভাগীয় তদন্তে পাঠানোর আদেশ দেন আদালত। দীর্ঘ ১১ বছর পর ২০১৪ সালের ৩ আগস্ট সেই প্রতিবেদন দাখিল করেন মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট ইমদাদুল হক। সেখানেও হত্যার বিষয়টি নাকচ করা হয়। সালমান শাহের বাবার মৃত্যুর পর তার মা নীলা চৌধুরী মামলাটি চালিয়ে যান। ২০১৫ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি নীলা চৌধুরী বিচার বিভাগীয় তদন্ত প্রতিবেদনে ‘নারাজি’ দেন। তিনি ১১ জনের নাম উল্লেখ করে দাবি করেন, তার ছেলেকে হত্যার সঙ্গে এরা জড়িত থাকতে পারে।

এরপর মামলাটির তদন্তভার যায় র‌্যাবের কাছে। তখন রাষ্ট্রপক্ষ আপত্তি তুললে ২০১৬ সালের ২১ আগস্ট ঢাকার বিশেষ জজ ৬-এর বিচারক ইমরুল কায়েশ র‌্যাবকে মামলাটি আর তদন্ত না করার আদেশ দেন। তখন তদন্তের দায়িত্বে আসে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। চার বছর তদন্তের পর ২০২০ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি তারাও সালমান শাহকে ‘হত্যার অভিযোগের কোনো প্রমাণ মেলেনি’ মর্মে আদালতে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দাখিল করে।

পিবিআই তাদের তদন্ত প্রতিবেদনে বলে, চিত্রনায়িকা শাবনূরের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার কারণে পারিবারিক কলহ আর স্ত্রী সামিরা হকের কারণে মা নিলুফা চৌধুরী ওরফে নীলা চৌধুরীকে ছেড়ে থাকার মানসিক যন্ত্রণাতে ভুগেই সালমান শাহ আত্মহত্যার পথ বেছে নিয়েছিলেন। ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট মামুনুর রশীদ ২০২১ সালের ৩১ অক্টোবর পিবিআইয়ের প্রতিবেদন আমলে নিয়ে আসামিদের অব্যাহতির আদেশ দেন।

এরপর আবার সালমান শাহর পরিবারের পক্ষ থেকে কয়েকটি বিষয় নিয়ে মহানগর দায়রা জজ আদালতে রিভিশন দায়েরের আবেদন করা হয়। সবশেষ গত বছরের ২০ অক্টোবর ঢাকার ষষ্ঠ অতিরিক্ত মহানগর দায়রা জজ মো. জান্নাতুল ফেরদৌস ইবনে হক বাদীপক্ষের করা রিভিশন মঞ্জুর করে মামলাটি হত্যা মামলা হিসেবে গ্রহণের নির্দেশ দেন। 

এর পরিপ্রেক্ষিতে ২১ অক্টোবর রাজধানীর রমনা থানায় মামলাটি দায়ের করেন সালমান শাহর মামা মোহাম্মদ আলমগীর। মামলায় সালমান শাহর স্ত্রী সামীরা হকসহ ১১ জনকে আসামি করা হয়। আসামিদের বিরুদ্ধে দণ্ডবিধির ৩০২/৩৪ ধারায় অভিযোগ আনা হয়েছে।

সামীরা ছাড়া মামলার অপর আসামিরা হলেন– শিল্পপতি ও সাবেক চলচ্চিত্র প্রযোজক আজিজ মোহাম্মদ ভাই, লতিফা হক লুছি, খলনায়ক ডন, ডেবিট, জাভেদ, ফারুক, মে-ফেয়ার বিউটি সেন্টারের রুবি, আব্দুস ছাত্তার, সাজু এবং রেজভি আহমেদ ফরহাদ। এছাড়া মামলায় অজ্ঞাতপরিচয় আরো অনেককে আসামি করা হয়েছে।

মামলার অভিযোগে মোহাম্মদ আলমগীর উল্লেখ করেন, ১৯৯৬ সালের ৬ সেপ্টেম্বর তার বোন নিলুফার জামান চৌধুরী (নীলা চৌধুরী), বোনের স্বামী কমর উদ্দীন আহমদ চৌধুরী এবং তাদের ছোট ছেলে শাহরান শাহ নিউ ইস্কাটনের বাসায় সালমান শাহের সঙ্গে দেখা করতে যান। সেখানে গিয়ে তারা জানতে পারেন, সালমান ঘুমাচ্ছেন।

কিছুক্ষণ পর প্রডাকশন ম্যানেজার সেলিম ফোন করে জানান, সালমানের কিছু হয়েছে। দ্রুত তারা বাসায় ফিরে দেখেন, সালমান শয়নকক্ষে নিথর হয়ে পড়ে আছেন এবং কয়েকজন বহিরাগত নারী তার হাত-পায়ে তেল মালিশ করছেন। পাশের কক্ষে সামীরার আত্মীয় রুবি বসে ছিলেন।

সালমানের মা চিৎকার করে তাকে হাসপাতালে নেওয়ার অনুরোধ করেন। পথে তারা সালমানের গলায় দড়ির দাগ এবং মুখমণ্ডল ও পায়ে নীলচে দাগ দেখতে পান। পরে তাকে হলি ফ্যামিলি হাসপাতাল হয়ে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হলে কর্তব্যরত চিকিৎসক জানান, সালমান শাহ অনেক আগেই মারা গেছেন।

রেজভীর ভূমিকা ও পিবিআইয়ের তদন্ত
সালমান শাহ হত্যায় গ্রেফতার ফরহাদ আহমেদ রেজভী খুনের দায় স্বীকার করে আদালতে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দেন বলে জানিয়েছিল পুলিশ। সেই জবানবন্দির ভিত্তিতে চাঞ্চল্যকর এ মামলার তদন্তে নতুন মোড় আসে। তবে পরে সিআইডি ও পিবিআইয়ের তদন্তে বলা হয়, জবানবন্দি ছিল সাজানো।

প্রবাসী রেজভী দাবি করেন, নীলা চৌধুরী তাঁকে মিথ্যা জবানবন্দি দিতে বলেন। এতে সালমান হত্যার বিচার পাওয়া সহজ হবে বলে তাঁকে বোঝানো হয়। তিনি রাজি হলে তাঁকে থানা ও আদালত চত্বরে নেওয়া হয়। শেষপর্যন্ত তাঁর কোনো জবানবন্দি নেওয়া হয়নি। অথচ পরে বলা হয়, তিনি জবানবন্দি দিয়েছেন। হত্যায় জড়িত হিসেবে তাঁকে কারাগারে পাঠানো হয়।  

শেয়ার করতে

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *