আশুলিয়ায় দম্পতি-নবজাতক হত্যায় জড়িত সাবেক প্রেমিক

✍︎ নাগরিক প্রতিবেদন ✍︎ 

আশুলিয়ার জামগড়া এলাকায় তালাবদ্ধ একটি কক্ষ থেকে দম্পতি ও নবজাতকের অর্ধগলিত মরদেহ উদ্ধারের ঘটনায় মনিরুজ্জামান হৃদয় (৪৪) নামে এক ব্যক্তিকে গ্রেফতার করা হয়েছে। 

তিন দিনের মধ্যে হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদঘাটনের দাবি করেছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। 

পিবিআই বলছে, নিহত নারী নাজমা খাতুনের সঙ্গে হৃদয়ের পূর্বপরিচয় ও প্রেমের সম্পর্ক ছিল। সেই সম্পর্কের জেরে বিরোধের একপর্যায়ে এ চাঞ্চল্যকর হত্যাকাণ্ড ঘটে।

গ্রেফতারের পর হৃদয়ের কাছ থেকে নিহত নাজমার ব্যবহৃত মোবাইল ফোন, সিম, অফিসের পরিচয়পত্র ও হ্যান্ডব্যাগ উদ্ধার করা হয়েছে। পরে আদালতে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন তিনি বলে জানিয়েছে পিবিআই।

বুধবার (৯ সেপ্টেম্বর) রাজধানীর উত্তরা এলাকায় পিবিআই ঢাকা জেলা কার্যালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানান পিবিআই ঢাকা জেলার পুলিশ সুপার এম এন মোর্শেদ।

পিবিআই জানায়, গত ৫ সেপ্টেম্বর আশুলিয়া থানার জামগড়া এলাকায় হযরত আলীর বাড়ির দ্বিতীয় তলার ৫৬ নম্বর কক্ষ থেকে পচা দুর্গন্ধ বের হলে স্থানীয়রা পুলিশকে খবর দেন। পরে আশুলিয়া থানা পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে তালাবদ্ধ কক্ষের দরজা খুলে শয়নকক্ষের ভেতর থেকে অর্ধগলিত এক পুরুষ, এক নারী ও একটি নবজাতকের মরদেহ উদ্ধার করে।

নিহতরা হলেন, আলমগীর কবির (৪৫), নাজমা খাতুন (৩৯) এবং সদ্য ভূমিষ্ঠ একটি নবজাতক। আলমগীরের বাবার নাম অচুমদ্দিন। তার বাড়ি দিনাজপুরের নবাবগঞ্জ থানার নিশা কাজলদীঘি এলাকায়। নাজমার স্বামী ছিলেন আলমগীর। তার বাড়িও দিনাজপুরের নবাবগঞ্জ থানার বড় মাগুরা এলাকায়।

মরদেহ উদ্ধারের পর সুরতহাল প্রতিবেদন তৈরি করে ময়নাতদন্তের জন্য হাসপাতালে পাঠায় পুলিশ। এ ঘটনায় নিহত নাজমার বড় বোন শাপলা বেগম বাদী হয়ে অজ্ঞাতনামা আসামিদের বিরুদ্ধে আশুলিয়া থানায় মামলা করেন। গত ৬ সেপ্টেম্বর করা ওই মামলায় দণ্ডবিধির ৩০২, ২০১ ও ৩৪ ধারায় অভিযোগ আনা হয়।

মামলাটি হওয়ার পর থেকেই পিবিআই ঢাকা জেলা ছায়া তদন্ত শুরু করে। পরে পিবিআইয়ের তফসিলভুক্ত মামলা হওয়ায় ৮ সেপ্টেম্বর স্বউদ্যোগে মামলার তদন্তভার গ্রহণ করে সংস্থাটি। মামলাটির তদন্ত করছেন পিবিআই ঢাকা জেলার উপপরিদর্শক আনিসুর রহমান।

পিবিআই ঢাকা জেলার পুলিশ সুপার এম এন মোর্শেদ বলেন, গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে ৮ সেপ্টেম্বর আশুলিয়ার নরসিংহপুর এলাকা থেকে মনিরুজ্জামান ওরফে হৃদয়কে গ্রেফতার করা হয়। জিজ্ঞাসাবাদে তিনি হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করেন বলে দাবি করেছে পিবিআই। পরে তার দেওয়া তথ্য ও দেখানো মতে ভাড়া বাসা থেকে নাজমার ব্যবহৃত অ্যান্ড্রয়েড মোবাইল ফোন, সিম, অফিসের পরিচয়পত্র ও হ্যান্ডব্যাগ উদ্ধার করা হয়। এরপর হৃদয়কে আদালতে হাজির করা হলে তিনি ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন।

পিবিআইয়ের তদন্ত ও আদালতে দেওয়া স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দির বরাত দিয়ে পুলিশ সুপার এম এন মোর্শেদ জানান, মনিরুজ্জামান ওরফে হৃদয়ের সঙ্গে নিহত আলমগীরের পূর্বপরিচয় ছিল। আলমগীর বেকার ছিলেন এবং হৃদয় তরকারির ব্যবসা করতেন। তাদের বাসার দূরত্ব ছিল প্রায় ১০ মিনিটের হাঁটার পথ। বিয়ের আগে থেকেই নাজমার সঙ্গে হৃদয়ের প্রেম ও শারীরিক সম্পর্ক ছিল। বিষয়টি জানতে পেরে আলমগীরের সঙ্গে হৃদয়ের বিরোধ তৈরি হয়।

ঘটনার দিন নাজমা ও আলমগীর হৃদয়ের বাসায় গিয়ে তাকে নিজেদের বাসায় নিয়ে আসেন। সেখানে আগের সম্পর্কের বিষয় নিয়ে তাদের মধ্যে কথা কাটাকাটি শুরু হয়। একপর্যায়ে আলমগীর হৃদয়ের সঙ্গে ধাক্কাধাক্কি করেন এবং তাকে মারধর করতে থাকেন। এ সময় নাজমাও হৃদয়কে ঝাঁটা দিয়ে আঘাত করেন বলে পিবিআই জানিয়েছে।

পুলিশের দাবি, তখন হৃদয়ও ধাক্কাধাক্কি ও ঘুষি দিয়ে প্রতিরোধের চেষ্টা করেন। একপর্যায়ে তিনি নাজমার পেটে লাথি মারলে তিনি মাটিতে পড়ে যান। এতে নাজমার পেটে আঘাত লাগে এবং তিনি ও তার গর্ভের সন্তান মারা যান বলে হৃদয়ের স্বীকারোক্তির বরাতে জানিয়েছে পিবিআই।

এরপর আলমগীর খুন্তি ও পাইপ দিয়ে হৃদয়কে আঘাত করেন। তাদের মধ্যে ধস্তাধস্তির একপর্যায়ে হৃদয় আলমগীরের গলায় গামছা পেঁচিয়ে শ্বাসরোধে হত্যা করেন বলে পিবিআই জানিয়েছে।

হত্যাকাণ্ডের পর হৃদয় মরদেহগুলো খাটের ওপর শুইয়ে রেখে ঘটনাস্থল থেকে পালিয়ে যান। যাওয়ার সময় তিনি নাজমার মোবাইল ফোন, সিম, অফিসের পরিচয়পত্র ও হ্যান্ডব্যাগ নিয়ে যান বলে তদন্তে উঠে এসেছে।

শেয়ার করতে

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *