বুধ গ্রহের গর্তের নামকরণ শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিনের নামে

✍︎ নাগরিক প্রতিবেদন ✍︎

বাংলাদেশের আধুনিক শিল্পের জনক শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন। সৌরজগতের ক্ষুদ্রতম গ্রহ বুধের বুকে অবস্থিত ১১৬ কিলোমিটার বিস্তৃত এক বিশাল ক্রেটার বা গর্তের নাম রাখা হয়েছে ‘আবেদিন’।

মার্কিন মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসার মহাকাশযান ‘মেসেঞ্জার’-এর পাঠানো ছবির ওপর ভিত্তি করে ২০০৯ সালে আন্তর্জাতিক জ্যোতির্বিজ্ঞান ইউনিয়ন (আইএইউ) আনুষ্ঠানিকভাবে এই নামকরণের অনুমোদন দেয়।

২০০৪ সালে চালু হওয়া নাসার মহাকাশযান ‘মেসেঞ্জার’ ২০০৮ সালের অক্টোবরে বুধ গ্রহের কাছ দিয়ে যাওয়ার সময় গ্রহটির উপরিভাগের বেশ কিছু বিরল ও নিখুঁত ছবি তোলে। মেসেঞ্জার সায়েন্স টিমের প্রস্তাবের ভিত্তিতে ২০০৯ সালের জুলাইয়ে নাসা ও আন্তর্জাতিক জ্যোতির্বিজ্ঞান ইউনিয়ন বুধ গ্রহের নতুন আবিষ্কৃত ১৬টি ক্রেটারের নাম বিশ্বের কালজয়ী শিল্পী, লেখক ও গুণীজনদের নামে রাখার সিদ্ধান্ত নেয়।

সেই তালিকায় স্থান পান বাংলাদেশের শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন।

নাসার ‘মেসেঞ্জার’ মিশনের প্রধান বিজ্ঞানী ওয়াশিংটন কার্নেগি ইনস্টিটিউশনের শন সলোমন সেই সময় মার্কিন গণমাধ্যমকে বলেন, ‘বুধ গ্রহের নতুন ভূতাত্ত্বিক রূপ আবিষ্কারের এই বিশেষ অনুভূতি পৃথিবীর প্রতিটি মানুষের সঙ্গে ভাগ করে নেওয়া উচিত। বিশ্বের বিভিন্ন সংস্কৃতির গুণী ব্যক্তিরা মানবজাতির অগ্রগতিতে যে অবদান রেখেছেন, মহাকাশের এসব স্থানে তাদের নাম স্মরণের মাধ্যমে স্বীকৃতি দেওয়া অত্যন্ত যৌক্তিক।’

মহাকাশ বিজ্ঞানীদের মতে, বুধ গ্রহের উচ্চ উত্তর অক্ষাংশে অবস্থিত এই ‘আবেদিন’ ক্রেটারটির স্থানাঙ্ক হলো কেন্দ্র অক্ষাংশ ৬১.৭ ডিগ্রি (উত্তর) এবং কেন্দ্র দ্রাঘিমাংশ ৩৪৯.৩ ডিগ্রি (পূর্ব)। ক্রেটারটির গঠন বেশ জটিল এবং দৃষ্টিনন্দন।

এই ক্রেটারের কয়েকটি বিশেষ বৈজ্ঞানিক বৈশিষ্ট্য

কেন্দ্রীয় পর্বতমালা ও মসৃণ তলদেশ: বিপুল বেগে কোনো গ্রহাণু বা মহাজাগতিক বস্তুর আঘাতে সৃষ্ট এই গর্তটির তলদেশ মসৃণ এবং এর কেন্দ্রে উঁচু পর্বতমালা রূপ নিয়েছে।

আগ্নেয়গিরির সক্রিয়তার প্রমাণ: কেন্দ্রীয় পর্বতের কাছে একটি অনিয়মিত নিচু খাঁজ রয়েছে, যা অতীত বিস্ফোরক অগ্ন্যুৎপাতের সংকেত দেয়। ছবি বিশ্লেষণে দেখা যায়, এই গহ্বরটি একটি লালচে উপাদানে ঘেরা, যা বুধ গ্রহের আগ্নেয়গিরির উপাদানের সঙ্গে মিলে যায়।

গাঢ় শিলাস্তর: ক্রেটারটির উত্তর-পশ্চিম অংশের উপাদানে আলো প্রতিফলনের মাত্রা কম। এর থেকে বিজ্ঞানীরা ধারণা করেন, আঘাতের সময় গ্রহের ভেতরের গভীর থেকে গাঢ় রঙের শিলাস্তর ওপরে উঠে এসে চারপাশে ছড়িয়ে পড়েছিল।

বাংলাদেশের জন্য গর্ব

শিল্পাচার্যের নামে মহাকাশের এই নামকরণ সম্পর্কে সাধারণ মানুষ ও তরুণ প্রজন্মের মাঝে সচেতনতা তৈরি করা প্রয়োজন বলে মনে করেন তাঁর পরিবার।

শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিনের কনিষ্ঠ পুত্র ময়নুল আবেদিন ২০২১ সালের গণমাধ্যমকে বলেন, ‘২০১৫ সালে আমি প্রথম এই মহাজাগতিক নামকরণের কথা জানতে পারি। এরপর তথ্য সংগ্রহ করে ২০১৭ সালে দেশের বিভিন্ন জেলা ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে এই ঐতিহাসিক ঘটনাটি প্রচারের উদ্দেশ্যে ব্যানার তৈরি করে ছড়িয়ে দিই।’

তিনি আরও যোগ করেন, ‘আমাদের তরুণ প্রজন্ম হয়তো এই “আবেদিন ক্রেটার” সম্পর্কে পর্যাপ্ত জানে না। কিন্তু এটি জানা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। শুধু আমাদের পরিবারের জন্যই নয়, পুরো বাংলাদেশের জন্য এটি অত্যন্ত গর্বের যে বুধ গ্রহের একটি বিশাল ক্রেটার শিল্পাচার্যের জীবন ও কর্মকে স্মরণ করে তার নাম বহন করে চলেছে।’

২০১১ থেকে ২০১৫ সালের মধ্যে মহাকাশযান মেসেঞ্জার বুধ গ্রহের কক্ষপথে থেকে রাসায়নিক গঠন, ভূতত্ত্ব এবং চৌম্বক ক্ষেত্র নিয়ে বিস্তৃত গবেষণা চালায়। মেসেঞ্জারে ব্যবহৃত সংকীর্ণ কোণের ক্যামেরা থেকে তোলা এসব ছবি ও তথ্য বিশ্বের বিজ্ঞানপ্রেমীদের কাছে বুধ গ্রহের পাশাপাশি শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিনের নামকেও এক অনন্য উচ্চতায় পৌঁছে দিয়েছে।

শেয়ার করতে

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *