✍︎ চট্টগ্রাম প্রতিনিধি ✍︎
দীর্ঘ প্রায় ছয় মাস বন্ধ থাকার পর আবার উৎপাদনে ফিরেছে রাষ্ট্রায়ত্ত চট্টগ্রাম ইউরিয়া ফার্টিলাইজার লিমিটেড (সিইউএফএল)। মঙ্গলবার (১৫ সেপ্টেম্বর) সকালে কারখানাটিতে ইউরিয়া সার উৎপাদন শুরু হয়েছে।
গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক হওয়ার পর কারখানাটি চালুর উদ্যোগ নেওয়া হলেও যন্ত্রপাতিতে দেখা দেওয়া কারিগরি ত্রুটির কারণে উৎপাদনে ফিরতে কিছুটা সময় লাগে।
সিইউএফএল সূত্র জানায়, মঙ্গলবার সকালে কারখানার ইউরিয়া উৎপাদন ইউনিট চালুর প্রক্রিয়া শুরু হয়। এর আগে গ্যাস সরবরাহ পাওয়ার পর ধাপে ধাপে অ্যামোনিয়া প্ল্যান্ট চালু করা হয়। এরপর ইউরিয়া প্ল্যান্টের বিভিন্ন যন্ত্রপাতি সচল করে উৎপাদনে ফেরার কার্যক্রম এগিয়ে নেওয়া হয়। চালুর প্রাথমিক পর্যায়ে কয়েকটি যান্ত্রিক জটিলতা দেখা দেয়। কারখানার প্রকৌশলী ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারীরা কাজ করে এসব ত্রুটি কাটিয়ে ওঠেন।
মঙ্গলবার দুপুরে বিষয়টি নিশ্চিত করে সিইউএফএলের উৎপাদন বিভাগের ডেপুটি জেনারেল ম্যানেজার (ডিজিএম) উত্তম চৌধুরী বলেন, ‘মঙ্গলবার সকালে আমাদের উৎপাদন প্রাথমিকভাবে শুরু হয়েছে। গত মাসের শেষের দিকে আমরা গ্যাস পেলেও কারিগরি ত্রুটির কারণে তাৎক্ষণিকভাবে উৎপাদনে ফিরতে পারিনি। এরপর একে একে সব যন্ত্রপাতি সচল করার চেষ্টা করা হয়েছে। আশা করি, আগামীকালের মধ্যে কারখানাটি পুরোপুরি ত্রুটিমুক্ত ও স্বাভাবিক অবস্থায় আসবে।’
সিইউএফএলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মিজানুর রহমান বলেন, দীর্ঘ প্রায় ছয় মাস পর তাঁরা উৎপাদনে ফিরেছেন। দীর্ঘ সময় উৎপাদন বন্ধ থাকায় যে ক্ষতি হয়েছে, নিয়মিত উৎপাদনের মাধ্যমে তা অল্প সময়ের মধ্যেই পুষিয়ে নেওয়া সম্ভব হবে বলে তাঁরা আশাবাদী।
সিইউএফএল পূর্ণমাত্রায় চালাতে দৈনিক প্রায় ৪৮ থেকে ৫২ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস প্রয়োজন হয়। পর্যাপ্ত গ্যাস সরবরাহ না থাকলে কারখানার উৎপাদন স্বাভাবিক রাখা সম্ভব হয় না। গ্যাসের চাপ কমে গেলে বা সরবরাহ বন্ধ হলে উৎপাদনও বন্ধ হয়ে যায়।
একসময় কারখানাটিতে দৈনিক প্রায় ১ হাজার ৭০০ মেট্রিক টন ইউরিয়া সার উৎপাদনের সক্ষমতা ছিল। তবে পুরোনো যন্ত্রপাতি, দীর্ঘদিনের ব্যবহারে বিভিন্ন ইউনিটের সক্ষমতা কমে যাওয়া এবং গ্যাস–সংকটসহ নানা কারণে বর্তমানে কারখানাটির কার্যকর উৎপাদনক্ষমতা আগের তুলনায় কমেছে।
সর্বশেষ গত ৪ মার্চ গ্যাস-সংকটের কারণে সিইউএফএলের উৎপাদন পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়। এরপর দীর্ঘ সময় কারখানাটি বন্ধ ছিল। গত মাসের শেষ দিকে গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক হওয়ার পর কারখানা চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়। কিন্তু দীর্ঘদিন বন্ধ থাকার কারণে বিভিন্ন যন্ত্রপাতি পরীক্ষা করে সচল করতে সময় লাগে। একপর্যায়ে কারিগরি ত্রুটিও দেখা দেয়। ফলে গ্যাস পাওয়ার পরও সঙ্গে সঙ্গে উৎপাদনে ফেরা সম্ভব হয়নি।
উল্লেখ্য, সিইউএফএলের গত কয়েক বছরের উৎপাদনের চিত্রও খুব একটা স্বস্তিদায়ক নয়। গ্যাস–সংকট ও যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে কখনো কয়েক দিন, আবার কখনো কয়েক মাস কারখানাটি বন্ধ রাখতে হয়েছে। কারখানার তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩–২৪ অর্থবছরে সিইউএফএল মাত্র পাঁচ দিন উৎপাদনে ছিল। এরপর ২০২৪ সালের ৭ ফেব্রুয়ারি বন্ধ হয়ে যায় কারখানাটি। দীর্ঘ সময় বন্ধ থাকার পর একই বছরের অক্টোবরে আবার উৎপাদন শুরু হয়।
এরপরও উৎপাদন দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। ২০২৫ সালের বিভিন্ন সময়ে গ্যাস–সংকট ও যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে কারখানাটি একাধিকবার বন্ধ ও চালুর মধ্য দিয়ে যায়। প্রতিবার উৎপাদন শুরুর পর কিছুদিন চলার মধ্যেই নতুন করে সংকট দেখা দেয়। এতে কারখানার উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা যেমন ব্যাহত হয়েছে, তেমনি বেড়েছে রক্ষণাবেক্ষণ ও পুনরায় চালুর ব্যয়।
সর্বশেষ ৪ মার্চ গ্যাস–সংকটের কারণে পুরোপুরি উৎপাদন বন্ধ হওয়ার পর ১৫ সেপ্টেম্বর আবার চালু হলো সিইউএফএল। অর্থাৎ প্রায় ছয় মাসের বেশি সময় পর কারখানাটিতে ইউরিয়া উৎপাদন শুরু হয়েছে।
এদিকে, দীর্ঘ সময় বন্ধ থাকার পর সিইউএফএল চালু হওয়াকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন কারখানার কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। তাঁদের আশা, এবার গ্যাস সরবরাহ অব্যাহত থাকলে এবং বড় ধরনের কারিগরি ত্রুটি দেখা না দিলে কারখানাটির উৎপাদন স্বাভাবিক রাখা সম্ভব হবে।
এদিকে দেশের কৃষি খাতে ইউরিয়া সারের চাহিদা পূরণে রাষ্ট্রায়ত্ত সার কারখানাগুলোর উৎপাদন গুরুত্বপূর্ণ। তাই সিইউএফএলের মতো বড় একটি কারখানা দীর্ঘদিন বন্ধ থাকলে আমদানি ও সরবরাহ ব্যবস্থার ওপরও বাড়তি চাপ তৈরি হয়। এ কারণে কারখানাটি এবার দীর্ঘস্থায়ীভাবে সচল রাখা যায় কি না, সেটিই এখন সংশ্লিষ্টদের কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
