✍︎ নাগরিক প্রতিবেদক ✍︎
পাকিস্তানের আকাশসীমা ব্যবহারের অনুমতি না পাওয়ায় রাশিয়া থেকে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের জ্বালানি ইউরেনিয়ামের একটি চালান দেশে আসতে পারেনি। ২৪ সেপ্টেম্বর চালানটি আসার কথা ছিল।
নতুন সূচি অনুযায়ী অক্টোবরের প্রথম সপ্তাহ থেকে ইউরেনিয়াম আনা শুরু হতে পারে।
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিমন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম সাংবাদিকদের বলেন, পাকিস্তানের ছাড়পত্র না পাওয়ায় নির্ধারিত ফ্লাইটটি আসতে পারেনি। রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় পারমাণবিক সংস্থা রোসাটম নতুন করে অক্টোবরের প্রথম সপ্তাহে চালানটি আনার সময়সূচি দিয়েছে। ইউরেনিয়াম নির্ধারিত সময়ে পৌঁছে দেওয়া রাশিয়ার দায়িত্ব। কিছুটা সময় এদিক-সেদিক হতে পারে বলেও জানান তিনি।
প্রকল্পসংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, প্রথম ইউনিটে এক বছর পর রিফুয়েলিংয়ের জন্য ৪৮টি ফুয়েল অ্যাসেম্বলি দুইটি ফ্লাইটে আনার পরিকল্পনা রয়েছে। এর একটি ২৪ সেপ্টেম্বর এবং অন্যটি ১ অক্টোবর আসার কথা ছিল। প্রথম ফ্লাইটটি স্থগিত হওয়ায় এখন ১ অক্টোবর থেকে চালান আসার নতুন সূচি দেওয়া হয়েছে।
একই সূত্র জানায়, দ্বিতীয় ইউনিটের প্রথমবারের জ্বালানি আনার জন্য ৮ অক্টোবর থেকে প্রতি সপ্তাহে একটি করে সাতটি ফ্লাইট পরিচালনার সূচি রয়েছে। প্রথম ইউনিটের জ্বালানি ২০২৩ সালে যেভাবে কয়েকটি চালানে আনা হয়েছিল, দ্বিতীয় ইউনিটের ক্ষেত্রেও একইভাবে পুরো জ্বালানি আনা হবে।
প্রকল্পসংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, রাশিয়া থেকে ইউরেনিয়াম পরিবহনের নির্ধারিত রুটে কাজাখস্তান, তুর্কমেনিস্তান, আফগানিস্তান, পাকিস্তান ও ভারতের আকাশসীমা পড়ে। চালান গ্রহণ ও রূপপুরে নেওয়ার জন্য বাংলাদেশে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতিও নেওয়া হয়েছিল। তবে ২৩ সেপ্টেম্বর রাতে রসাটম থেকে জানানো হয়, রুটের প্রয়োজনীয় অনুমোদন পাওয়া যায়নি।
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব শেখ মোহাম্মদ তৌহিদুল ইসলাম এএনআইকে বলেন, ইউরেনিয়ামবাহী বিমান আসার কথা থাকায় বিমানবন্দরে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি সম্পন্ন করা হয়েছিল। কর্মকর্তারাও বিমানটির জন্য অপেক্ষায় ছিলেন।
পরে রূপপুর প্রকল্পে রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় পারমাণবিক শক্তি করপোরেশন রোসাটমের লিয়াজোঁ কর্মকর্তা বাংলাদেশকে জানান, বিমানটির চলাচলের জন্য আকাশসীমা নিয়ে সমস্যা দেখা দিয়েছে। এ কারণে নির্ধারিত পরিকল্পনা অনুযায়ী বিমানটি পাঠানো হয়নি।
তবে ঠিক কোন দেশ বা কর্তৃপক্ষ আকাশসীমা ব্যবহারে বাধা দিয়েছে, সে বিষয়ে বিস্তারিত জানানো হয়নি। এ বিষয়ে রোসাটমের বক্তব্য জানতে এএনআই যোগাযোগ করলেও প্রতিবেদন প্রকাশের সময় পর্যন্ত কোনো জবাব পাওয়া যায়নি।
এদিকে পাকিস্তানের হাইকমিশনার ইমরান হায়দারের সঙ্গে সোমবার সৌজন্য সাক্ষাৎ করেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির। এ সময় রূপপুরের ইউরেনিয়াম পরিবহনে পাকিস্তানের আকাশসীমা ব্যবহারের অনুমতি না পাওয়ার বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হয়েছে কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, এ বিষয়ে কোনো আলোচনা হয়নি। এটি ছিল হাইকমিশনারের সঙ্গে তাঁর প্রথম সৌজন্য সাক্ষাৎ।
আকাশসীমা ব্যবহারের অনুমতি নিয়ে চিন্তিত হওয়ার কিছু নেই বলেও জানান হুমায়ুন কবির।
ইউরেনিয়ামের চালান আসতে না পারার ঘটনা বর্ণনা করে রূপপুর বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ প্রকল্পের পরিচালক কবির হোসেন বলেন, “আমার যে ফুয়েল আসার কথা… ইউনিট ওয়ানের ফুয়েল আমি লোড করেছি। এক বছর পরে ইউনিট ওয়ানের ফুয়েল পরিবর্তন করতে হবে।
“অর্থাৎ এক বছর পরে যে রিলোড, সেটা। এক বছর পরে যে রিলোড সেটা হইছে, আমার দুইটা ফ্লাইটে আসবে ৪৮টা অ্যাসেম্বলড। এইটা আসার কথা ছিল ২৪ তারিখে একটা ফ্লাইটে। অক্টোবরের ১ তারিখে একটা ফ্লাইট। এই দুই ফ্লাইটে আসার কথা।”
একইভাবে পরের সাতটি ফ্লাইটে রূপপুরের দ্বিতীয় ইউনিটের ইউরেনিয়াম আসার সূচি থাকার তথ্য দিয়ে তিনি বলেন, “৮ অক্টোবর থেকে প্রতি সপ্তাহে একটি করে সাতটি ফ্লাইটে আসার কথা ছিল ইউনিট-২ এর ফার্স্ট লোড। ইউনিট-২ এর ফার্স্ট লোড অর্থাৎ ইউনিট-২ এর ফ্লাইট মানে ফুয়েল।
“আমরা ইউনিট ওয়ানের ফুয়েল যে রকমে ২০২৩ সালে আনছিলাম, ওরকমের দ্বিতীয় ইউনিটের ফুল ফুয়েল আরকি। পুরো ফুয়েলটা যেখানে আগের মতই সাতটা ফ্লাইটে আসার কথা।”
সাধারণত কাজাখস্তান, তুর্কমেনিস্তান, আফগানিস্তান, পাকিস্তান এবং ভারতের আকাশসীমা দিয়ে এ ইউরেনিয়াম আসার তথ্য দেন প্রকল্প পরিচালক।
ইউরেনিয়াম গ্রহণ ও রূপপুরে নিয়ে যাওয়ার জন্য প্রস্তুতি তুলে ধরে কবির হোসেন বলেন, “হঠাৎ করে ২৩ তারিখ ৯টার দিকে জানাল (রসাটম), ফ্লাইটটা স্থগিত। বলছে, আমাদের একটু এয়ার স্পেসে সমস্যা হচ্ছে। সকলের পারমিশন পাওয়া যায়নি, যেসব দেশ থেকে আসবে। আমরা চেষ্টা করছি কূটনৈতিক পথে যাতে অনুমোদন পাওয়া যায়।
“২৪ তারিখ সকালবেলা আবার ফোন দিলাম। তোমরা বলো, আমাদের তো প্রস্তুতি নিতে হবে। তখনও বলল, আমরা এখনও কূটনৈতিক মাধ্যমে চেষ্টা চালাচ্ছি। সবশেষ, ২৪ তারিখ রাতে জানানো হল, রুটের অনুমোদন পায় নাই; এই ফ্লাইট স্থগিত। আমরা তোমাদেরকে পরবর্তীতে শিডিউল জানাব।’
এরপর নতুন করে শিডিউল দেওয়ার কথা তুলে ধরে ধরে কবীর হোসেন বলেন, ১ অক্টোবর থেকে ফ্লাইট শুরু হবে। অর্থাৎ এক সপ্তাহ পেছাল।
পাবনার ঈশ্বরদী উপজেলার পাকশী ইউনিয়নের রূপপুর গ্রামে পদ্মা নদীর তীরে দেশের প্রথম পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রটি নির্মাণ করা হচ্ছে। রাশিয়ার রোসাটমের কারিগরি সহায়তায় বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশন প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করছে।
প্রকল্পে তৃতীয় প্রজন্মের ভিভিইআর-১২০০ প্রযুক্তির দুটি চুল্লি নির্মাণ করা হচ্ছে। দুই ইউনিটে মোট ২ হাজার ৪০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্য রয়েছে।
প্রথম ইউনিটের জন্য কম সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম জ্বালানির প্রথম চালান ২০২৩ সালের অক্টোবরে বাংলাদেশে পৌঁছায়। এতে ১৬৪টি নতুন জ্বালানি সমাবেশ ছিল।
রাশিয়ার নভোসিবির্স্ক কেমিক্যাল কনসেনট্রেটস প্ল্যান্টে উৎপাদিত ওই জ্বালানি বিশেষ নিরাপত্তাব্যবস্থায় কার্গো বিমানে ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে আনা হয়। পরে তেজস্ক্রিয়তা প্রতিরোধী বিশেষ কনটেইনারে করে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নিরাপত্তায় ঈশ্বরদীর রূপপুর প্রকল্প এলাকায় নেওয়া হয়।
এ জন্য ঢাকা থেকে ঈশ্বরদী পর্যন্ত বিশেষ ‘গ্রিন করিডর’ও তৈরি করা হয়েছিল।
